কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ না দেওয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে এসেছে ঢাকা। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামু্দ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের ১৪টি দেশের একটি বাংলাদেশ।
যদিও খবরটি জানা গেছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো অংশ থেকেই এই জোটে যোগদানের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল। বিকল্প পথ লোহিত সাগরেও প্রায়ই হামলা করছে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা।
এই বাস্তবতায় মাথায় রেখে বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই জোট গঠন করেছে সৌদি আরব।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেছেন, উন্মুক্ত সমুদ্রপথে নিরাপদ ও বাণিজ্যিক সরবরাহ নিশ্চিত রাখার দৃষ্টিকোন থেকেই এই জোটে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। তবে তিনি নাম জানাতে চাননি।
এই জোট নিয়ে জানেন এমন একজন কর্মকর্তা বলছেন, এক মাস ধরে এই জোটে থাকা নিয়ে ঢাকার সাথে আলোচনা করেছে রিয়াদ।
“বুঝেশুনে আলোচনা করে জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই এই জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে”, বলেন ওই কর্মকর্তা।
কেন এই প্রতিরক্ষা জোট
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানা গেছে, যৌথ সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার কাঠামো হিসেবে এই বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট (এমএমডিএ) তৈরি করা হয়েছে।
সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্য বলছে, সৌদি আরবসহ মোট ১৪টি দেশ জোটে করেছে। দেশগুলো হলো: বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও নাইজেরিয়া।
সম্প্রতি সৌদি আরবের রিয়াদে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ৪৩টি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিরা বৈঠক করেন। কেউ কেউ ভার্চুয়ালি যোগ দেন।
৫১ টি দেশ ও সংস্থার আলোচনার পর ১৪টি দেশ যৌথ ঘোষণায় সই করে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানো, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ ও জ্বালানি সরবরাহ সুরক্ষিত করা এবং অভিন্ন সামুদ্রিক স্বার্থরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই জোটটিকে একটি প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে একমত হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলো।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ছাড়া আর কোথাও কোনো যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা কর্মকোণ্ডে জড়ায় না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জোটে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা জোটে যোগ না দেওয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে দাড়ালো।
সৌদি আরবের সাথে সামরিক সহযোগিতার ইতিহাস যদিও নতুন নয় বাংলাদেশের জন্য।
১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। ১৯৯০ সালেও উপসাগরীয় যুদ্ধে সৌদি আরবের সুরক্ষায় ‘অপারেশন মরুপ্রান্ত’-এ তিন হাজার সেনা পাঠিয়েছিলো বাংলাদেশ। ওই যুদ্ধ শেষে কুয়েত পুনর্গঠনেও সেবামূলক কাজ করেছিলো বাংলাদেশের সেনারা।
সৌদি আরবের নেতৃত্বে এই বহুজাতিক সামুদ্রিক সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার কোনো সুযোগ বাংলাদেশের ছিলো না বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত কমডোর জে ইউ ভূঁইয়া।
“আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নই। সৌদি আরবের ওপর আমাদের কর্মসংস্থান নির্ভরতা আছে। সৌদি আরব যদি বলে শ্রমিক ফেরত পাঠিয়ে দেবে, তাহলে কী করবেন?”, বলেন এই সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান।
একই মত অবসরপ্রাপ্ত মেজর নাসির উদ্দিন আহমেদের। তিনি বলেন, “সৌদি আরবে ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। তাই এই কৌশলগত প্রস্তাবে সাড়া না দিলে তার পরিণতি সুখকর হতো না।”
এছাড়া বহুজাতিক জোটে অংশ নিলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীও নানা উপায়ে সমৃদ্ধ হতে পারে।
১৪ দেশের যৌথ ঘোষণায় বলা আছে- অনুযায়ী সামুদ্রিক নিরাপত্তা, তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ, ও যৌথ সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুল হক অবশ্য এই জোটে যোগ দেওয়ার খবরকে ‘সারপ্রাইজিং’ বলছেন। তবে তিনি মনে করেন এটি হঠাৎ করেই হয়নি, আলোচনার মাধ্যমে বুঝেশুনেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, “কিছুদিন আগে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছিলেন। বলা হয়েছিলো সৌদি যুবরাজ ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। সম্ভবতও ওই সময় থেকেই আলোচনা চলছিলো।”
যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে প্রতিরক্ষামূলক জোট। এটি কোনো রাষ্ট্র, জোট বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করে তৈরি নয়। এর কার্যক্রম চলবে আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সঙ্গতি রেখে।
ওবায়দুল হক মনে করেন, জোটের কর্মপরিধি কী হবে আর বাংলাদেশে অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া বা কলেবর বুঝতে আরেকটু সময় লাগবে।
“আমরা কি যুদ্ধ জাহাজ পাঠাবো? নিঃসন্দেহে আমরা যুদ্ধজাহাজ পাঠাবো না ওখানে। কিভাবে পাহারা দেবো? হয়তোবা মোরাল সাপোর্ট দিব। মোরাল সাপোর্ট দিতে পারাটা আমার মনে হয় এই মুহূর্তে খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে”, যোগ করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই শিক্ষক।
তবু নীরব কেন ঢাকা
নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসে, এই জোটে যোগ দেওয়ার কোনো বিকল্প ছিলো না বা সুযোগ ছিলো না বলে একমত বিশ্লেষকরা। তবে কেন সরকারের তরফ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হলো না তারও অনেক কারণ থাকতে পারে।
একজন বিশ্লেষক বলছিলেন সরকার হয়তো এই জোটে যোগ দেওয়ার কথা এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে চাইছে বা সাহস পাচ্ছে না। কারণ ইরান ও তার সমর্থক দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক আছে। তাই সরকার আরেকটু সময় নিতে চাইবে।
মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ মনে করেন এই ঘটনা অবশ্যই ইরান ভালোভাবে নেবে না।
“ইরানের পেছনে চীন এবং রাশিয়া আছে। তাদের সাথে আমাদের কথাবার্তা হয়েছে কি-না বা হয়ে থাকলে সেটার ব্যাপ্তি কতটুকু, এগুরো যাচাই বাছাই করা প্রয়োজন”, বলেন এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
“মনে রাখতে হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ চীন। সাথে আরো কয়েকটি দেশ আছে। তাদের সাথে আলোচনা করে হয়তো এটি ঘোষণা দেওয়া হতে পারে”, যোগ করেন ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ।
কমডোর (অব.) জে ইউ ভূঁইয়া মনে করেন, এই জোটে যোগ দেওয়ায় ইরানের বিরাগভাজন হতেই হবে।
তিনি বলেন, “কিছুতো করার নেই। আপনি যেহেতু শক্তিশালী না, আপনার নির্ভরশীলতা আছে। সৌদি আরবের ওপর আপনার বিশার নির্ভরতা, অন্তত প্রবাসী শ্রম বিবেচনায়। তাই কোনো উপায় আছে তাদের প্রস্তাবে রাজি না হয়ে?”
“ইরান হয়তো জিতে গেলো, পাঁচ বছর পর অনেক শক্তিশালী হলো, তখন হয়তো জটিলতা বাড়বে, কিন্তু এই মুহূর্তে কোনো উপায় নেই”, যোগ করেন সাবেক সহাকারী নৌবাহিনী প্রধান।
তবে স্বস্তির দিক আছে বলে মনে করেন ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ হয়তো হিসাব করেছে লাভ-ক্ষতি বা এখানে কমিটমেন্ট কতটুকু। খবরে জানা গেছে যে জোটের বৈঠক করেছে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিনিধিরা। তার মাতে সামরিক নেতৃত্বও ওয়াকিবহাল। এটা স্বস্তির বিষয়। তারা না বুঝে কিছু করবেন না।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এই জোট নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানোর সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই জোটের যৌথ ঘোষণায় লেখা আছে, “এই ঘোষণায় অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমূহ তাদের নিজ নিজ সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো অনুসারে মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সের সনদে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নেবে।”
একই সাথে বলা হয়েছে, “যৌথ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং নিজ নিজ জাতীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে।”