“আমার বাবা-মা জানেও না আমি বাইচা আছি কি-না। তারা হয়তো মনে করসে আমি মইরা গেসি। বাইচা আছি জানলে তারা শান্তি পাবে।”
উক্রেইনের বন্দিশিবিরে বসে ধীরলয়ে বলছিলেন রিমেল মিয়া। বয়স ২৭ বছর। বাড়ি বাংলাদেশের গাইবান্ধা। ভালো জীবনের আশায়, চাকরি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলে রাশিয়ায়।
কিন্তু ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। যোগ দিয়েছিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে। তাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিলো ফ্রন্টলাইনে।
উক্রেইন সেনার হাতে ধরা পড়ে বাংলাদেশি রিমেল মিয়া এখন ‘যুদ্ধবন্দি’। আটক আছেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে।
পরিবারের সাথে শেষ কথা বলেছিলেন গত বছরের সেপ্টেম্বর নাগাদ। এরপর আর যোগাযোগ নেই।
উক্রেইনের একটি জেলে রিমেল মিয়াসহ মোট তিনজন বাংলাদেশি বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। এই তিনজনেরই সাক্ষাৎকার নিয়েছে আলাপ।
বৃহস্পতিবার বন্দিশিবির থেকে প্রথমবারের মতো কোনো সাক্ষাৎকার দিতে ভিডিও কলে যুক্ত হয়েছিলেন রিমেল মিয়া, শাহরিয়ার সুমন ও কামরুল হাসান।
যেখানে তারা খোলামনে বলেছেন তাদের রাশিয়া যাওয়ার গল্প। কীভাবে তারা যোগ দিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে। ধরাই-বা পড়লেন কীভাবে।
ইচ্ছায় অনিচ্ছায় যুদ্ধের ফাঁদে
যে তিনজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে আলাপ, তাদের দুইজন দাবি করেছেন যে তারা স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে।
সামনে ছিলো দুই লাখ টাকা বেতন আর এককালীন ২ মিলিয়ন রুবল বা প্রায় ৩১ লাখ টাকার হাতছানি।
রিমেল মিয়ার অবশ্য বলেছেন যে তিনি প্রতারিত হয়ে বাধ্য হয়েছিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে। তবে ২ মিলিয়ন রুবল পাওয়ার ইচ্ছা খানিকটা প্রভাবিত করেছে তাকেও।
রাশিয়া যেতে রিমেল মিয়া ধার-কর্য করে ছয় লাখ টাকা দিয়েছিলেন ঢাকার একটি ট্রেনিং সেন্টারকে। ট্রেনিংয়ের পর নয় মাসের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গিয়েছিলেন রাশিয়ার তায়মন সিটিতে। চাকরি পেয়েছিলেন একটি গ্যাস কোম্পানিতে।
রিমেল মিয়া বলছিলেন, “ছয় মাস না যাইতেই আমাদের চলে যাইতে বলা হয়। তারপর এক বন্ধুর সহায়তায় মস্কো আসি।”
শহরের দেওয়ালে সাঁটানো পোস্টার আর ইন্টারনেটজুড়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে রিমেল মিয়ার।
সিকিউরিটি গার্ডের কাজ। দুই লাখ টাকা বেতন আর এককালীন ২ মিলিয়ন রুবলের লোভ। যোগাযোগ করে চলে যান উফা।
সেখানে গিয়ে রাশিয়ান ভাষায় করা চুক্তিপত্রে সই করে যোগ দেন বাহিনীতে। নিয়ে নেওয়া হয় পাসপোর্ট।
সেখান থেকে তিন দিনের বাসযাত্রার পর ঠাঁই হয় এক জঙ্গলে। অজানা সেই স্থানে তিন দিনের ট্রেনিং। তারপরই তাকে ঠেলে দেওয়া হয় ফ্রন্টলাইনে।
“একটা বাংকারে আমি একাই। একটা ওয়াকি টকি দিসিলো। আর একটা রাইফেল ছিলো সাথে”, বলছিলেন রিমেল মিয়া।
অমন ঘনজঙ্গলে এক মাস কাটাতে হয় রিমেল মিয়াকে। বাংকারের পাশেই খাবার আসতো ড্রোনে। এক সন্ধ্যায় হঠাৎই উক্রেইন বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান রিমেল মিয়া।
তারপর থেকে তার ঠিকানা ওই বন্দিশিবির। একই বন্দিশালায় আছেন আরো দুই বাংলাদেশি শাহরিয়ার সুমন ও কামরুল হাসান।
এই দুইজন উক্রেইন বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন গত মে মাসে। দুজনে রাশিয়া গিয়েছিলেন আলাদা। কিন্তু রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন একই দিন। এ বছরের ২০এ মার্চ।
সুমন ও কামরুলও কাজ করতে একটি গ্যাস কোম্পানিতে। চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই চাকরি হারিয়েছিলেন তারা।
পারে তারাও যোগ দেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে। দুই জনের গল্পে যদিও ভিন্নতা আছে।
সুমন বলছিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন স্বেচ্ছ্বায়। আর কামরুল জানিয়েছেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি।
তবে যোগ দিয়েছিলেন একসাথে। রাশিয়ার তুলা শহরে একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। সেখানে ৩৫ দিনের ট্রেনিং নেন।
এই সময়ে এক মাসের বেতন বাবদ প্রায় দুই লাখ আর জয়েনিং বোনাস হিসাবে আরো প্রায় দুই লাখ টাকা বেতন-ভাতাও পান।
ট্রেনিং শেষে দুইজনকেই নামতে হয় যুদ্ধে ময়দানে। প্রথমে ‘ধুনেস’। তারপরের জায়গার নাম জানেন না।
“চারিদিকে খালি ডেডবডি। অসংখ্য ডেডবডি। গুনে শেষ করতে পারিনাই”, বলছিলেন শাহরিয়ার সুমন। কামরুলও একইরকম তথ্য দিয়েছেন।
সুমন ও কামরুল ওই জঙ্গলেই ছিলেন পাঁচদিন পাঁচ রাত। খাবার আসতো ড্রোনে। কামরুল কিছুটা ইংরেজি জানায় ওয়াকি টকিতে একজন কমান্ডারের সাথে কথা বলতে তিনিই।
এক সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিলো। গাছের নিচে বসেছিলেন দুইজন। ওই মুহূর্তেই উক্রেইনের পাঁচ সেনা ঘিরে ফেলে তাদের।
ধরা পড়ে যান। জায়গা হয় ওই বন্দিশিবিরে যেখানে প্রায় সাত মাস ধরে আছেন রিমেল মিয়া। যিনি একা গভীর জঙ্গলের বাংকারে কাটিয়েছিলেন এক মাস।
তিনি কী করেছিলেন ওই বাংকারে? তা বিস্তারিত বলেছেন সাক্ষাৎকারে। সুমন ও কামরুলও বলেছেন কীভাবে কাকে টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন রাশিয়া।
এই তিন বাংলাদেশির দিন কাটছে এখন উক্রেইনের যুদ্ধবন্দিশিবিরে। আলাপকে জানিয়েছেন তাদের দিনপঞ্জি।
উক্রেইনের মানবাধিকার সংস্থা ট্রুথ হাউন্ডের সহযোগিতায়, এই তিন বাংলাদেশির যুদ্ধবন্দির সাক্ষাৎকারের আয়োজন করেছে ‘উক্রেইন’স কোঅর্ডিনেশন হেডকোয়ার্টার্স ফর দি ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনারস অব ওয়ার’।
ভিডিও কলে যুক্ত হলেও বন্দিদের সম্মতি না থাকায় ভিডিও রেকর্ড করা হয়নি। তবে অডিও ও ছবি প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন তারা।
থার্ড জেনেভা কনভেনশন ও রেডক্রসের গাইডলাইনসহ যুদ্ধবন্দির সাক্ষাৎকার নেওয়ার আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অনুসরণ করেই এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
রিমেল মিয়া, শাহরিয়ার সুমন ও কামরুল হাসান কি বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন? তারা কি বাংলাদেশে ফিরতে চান?
বাংলাদেশ থেকে কী কেউ যোগাযোগ করেছে এখনও তাদের সাথে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে তিন যুদ্ধবন্দির জবানবন্দিতে। শিগগিরই বিস্তারিত আসবে আলাপ-এর ওয়েবসাইটে। থাকবে অডিও পডকাস্ট।