বাংলাদেশ-চীন ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ হলে কী হবে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে কূটনৈতিক হিসাবের যোগ-বিয়োগ হয়েছে ঢের। যৌথ বিবৃতিতেও এসেছে অনেক প্রসঙ্গ।

দুই দেশ একমত হয়েছে যে টু প্লাস টু ডায়লগ মেকানিজম বা সংলাপ প্রক্রিয়া যাচাই করে দেখবে ঢাকা-বেইজিং।

বলা হয়েছে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কৌশলগত সংলাপ বা আলোচনার একটি প্রক্রিয়া তৈরি করা হবে। একই সাথে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে দুই দেশ একমত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হলে তাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি বাড়বে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জটিলতা কমবে।

টু প্লাস টু কী

‘টু প্লাস টু সংলাপ’ হলো দুই দেশের দুইজন করে চারজন নীতিনির্ধারক বা উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার আলোচনা বা বৈঠক।

বাংলাদেশ-চীনের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে যৌথ আলোচনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা হয়েছে।

জাপান অনেকদিন ধরে এই ‘টু প্লাস টু সংলাপ’ কাঠামোটি ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে দেশটির এই যৌথ সংলাপ কাঠামো আছে।

ভারতও জাপানের সাথে এই ‘টু প্লাস টু সংলাপ’ কাঠামো ব্যবহার করে। ২০১০ সাল থেকে দেশ দুটি ‘টু প্লাস টু ডায়লগ মেকানিজম’ বা ব্যবস্থাটি চর্চা করে আসছে, যা মূলত দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে হয়।

দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের মধ্যে হওয়া বৈঠক পরে প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানদের বৈঠকে প্রয়োজনীয় আলোচনা গুছিয়ে নিতে সাহায্য করে।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও একই রকম আলোচনা কাঠামো আছে। ২০২৩ সালের শেষদিকে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো যা, সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পায়।

এ ধরনের বৈঠক তাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আটকে থাকে না, বরং আঞ্চলিক এমনকি বৈশ্বিক বিষয়ও উঠে আসে।

আবার এ ধরনের বৈঠকে হওয়া আলোচনা সব সময় প্রকাশও করা হয় না। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে বাংলাদেশ বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছিলো তা জানা যায়নি।

দিল্লির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, বাংলাদেশ ইস্যুতে যার যার অবস্থান একে অন্যকে জানিয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন কিছু বলেনি। এমনকি যৌথ বিবৃতিতেও তা জায়গা পায়নি।

বাংলাদেশ-চীন ‘টু প্লাস টু’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, “পৃথিবী খুব ‘ভলাটাইল’ অবস্থায় আছে। এখানে পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা যুক্ত হয়ে গেছে। তাই চীনের সাথে টু প্লা টু ‘এক্সপ্লোর’ করে দেখা হবে।”

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, এই এটা যে হবেই তা নয়। তবে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে এর ইতিবাচক দিক কাজে লাগাতে পারে দুই দেশ।

“কূটনৈতিক বোঝাপড়া আর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা একসাথে বসে আলাপ করলে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়। অনেক ধরনের প্রক্রিয়াগত জটিলতা বা সময়ক্ষেপণ এড়ানো সম্ভব হয়”, বলছিলেন রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল কাজী শরীফ উদ্দিন মনে করেন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষায় বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে যৌথ কাঠামো আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “আমাদের কাউকে এভয়েড করার স্কোপ নাই। কিন্তু আবার আমাদের নিজেদের স্বার্থও দেখতে হবে। এজন্য আমাদের প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। এর সাথে আপনি যখন নিরাপত্তা ইস্যু জুড়ে দেবেন তখন তা আরো শক্তিশালী হবে।”

“চীন আমাদের প্রতিরক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ। সুতরাং এই খাতে তাদের সাথে সহযোগিতা বা আলোচনাতো লাগবেই। কূটনৈতিক ভাবনার সাথে এক টেবিলে যখন প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা ইস্যুতেও আলোচনা হবে তখন তা অনেক জটিলতা কমাবে।”

রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদও বলছেন, “সবচেয়ে বড় কথা হলো চীনের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাবিষয়ক সম্পর্ক যে গুরুত্বপূর্ণ এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে তা শক্তভাবে উচ্চারিত হলো।”

“এখানে টু প্লাস টু মানে এই নয় যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রীদেরই বসতে হবে। এই দুই ইস্যুতে আলোচনা করতে পারে এমন যেকোনো পর্যায়েই আলোচনা হতে পারে”, যোগ করেন মুন্সি ফয়েজ।

কর্নেল শরীফ বলেন, “চীনের সাথে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সহযোগিতা বা যেকোনো কিছুই যখন কূটনীতির সাথেই আলাপ চলবে তখন আমলতান্ত্রিক জটিলতাও কাটানো সম্ভব হবে।”

“ভূরাজনীতিতে দেশীয় নিরাপত্তা থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।” তাই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কূটনীতির সাথে নিরাপত্তা আলোচনাও একটা বার্তা বলেও মনে করেন কর্নেল শরীফ।

তিনি বলেন, “দেশের রাজনীতি যেখানে শেষ হয়, ভূরাজনীতি সেখানে শুরু হয়। এটা মাথায় রাখলে চীনের সাথে টু প্লাস টু বাংলাদেশে আঞ্চলিক অবস্থানের গুরুত্ব জানান দেয়।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান অবশ্য বলেছেন যে, বাংলাদেশ চীনের সাথে এই টু প্লাস টু কাঠামো ‘এক্সপ্লোর’ করবে, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা তুরস্কের সাথে টু প্লাস টু করবো। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের অনেক স্বার্থ জড়িত। চীনের সাথেও আমরা তা এক্সপ্লোর করে দেখবো।”