প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর: পররাষ্ট্রনীতির লিটমাস টেস্ট

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে তারেক রহমান প্রথম কোন দেশ সফর করবেন, তা নিয়ে গুঞ্জন কম হয়নি। ভারত না চীন, চীন না ভারত- এই নিয়ে নীরবে সরগরম ছিলো কূটনৈতিক পাড়া।

শেষমেষ প্রথম দেশের তালিকায় জায়গা পেলো মালয়েশিয়া। একই সফরে দ্বিতীয় দেশ চীন।

সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় দুই দেশে ছয়দিনের দ্বিপাক্ষিক সফর। ২১ ও ২২এ জুন মালয়েশিয়ায় কাটিয়ে ২৩এ জুন তিনি পৌঁছাবেন চীনে। সেখানে তারেক রহমান অংশ নেবেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিখ্যাত ‘সামার ডাভোস’ সম্মেলনে।

চেনা ছক এড়িয়ে প্রথম সফরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন বলেই মনে করছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা। আর দ্বিতীয় দেশ হিসাবে চীন সফর ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’র গুরুত্বের বহিপ্রকাশ।

সব মিলিয়ে এই সফর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাড়ানো, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান স্পষ্ট করার বার্তা আছে।

নির্বাচনে জয়ের পর গত ফেব্রুয়ারিতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। একই সময়ে আমন্ত্রণ আসে বেইজিং থেকেও। তবে দুই প্রতিবেশীর টানাপোড়েনের সমীকরণে ঢাকা শুরুতেই কোনো সুনির্দিষ্ট ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়ার বার্তা দিতে চায়নি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম মনে করেন, তিন সুপার পাওয়ারের একটা চাপ আছে। এই চাপ বাড়বে, কমবে না। তাই যতোটুকু সম্ভব সবার সাথে মিলেই কাজ করতে হবে।

“তিনি প্রথমে ভারত গেলে চীন একভাবে দেখবে, আবার চীন গেলে ভারত একভাবে দেখবে। আমার মনে হয় প্রথম সফরে মালয়েশিয়া বেছে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঠিক কাজটাই করেছেন। আর কোথায় সফর হবে তা বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।”

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরও এমন মন্তব্যের সঙ্গে একমত।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী কোথায় যাবেন, এটাতো বাংলাদেশের প্রয়োজনের নিরিখেই নির্ধারিত হবে। আমাদের এখনকার বাস্তবতায় আমাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগসহ ইত্যাদি যাদের সাথে কাজ করলে সমাধান পাওয়া যাবে, তাদের সাথেইতো কাজ করতে হবে।”

তারিক এ করিম বলছেন, “আমাদের ফিউচার হলো বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগরে বিমসটেক আছে, কিন্তু বিমসটেকই বঙ্গোপসাগর নয়। এখানে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া নেই। সেজন্য এখানে মালয়েশিয়া সফরটা গুরুত্বপূর্ণ। সেখান থেকে চীন কাছে। সেক্ষেত্রে ‘টাইমিং সিকোয়েন্স’ খুবই যৌক্তিক।”

শ্রমবাজার ও আসিয়ান

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি জনশক্তি। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন, যা দেশটির মোট বিদেশি শ্রমশক্তির এক-তৃতীয়াংশ।

গত এক দশকেরও বেশি সময়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বারবার সংকট তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের জন্য। ২০১৬ সাল থেকে বারবার এই বাজার বন্ধ ও চালু হয়েছে 'সিন্ডিকেট' ও ‘মানবপাচার’-এর কারণে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোর কারণও ছিলো অন্যতম ক্ষত। ২০২২ সালে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পর আবার ‘২৫ এজেন্সির সিন্ডিকেট’ থেকে ‘১০০ এজেন্সির সিন্ডিকেট’-এর অভিযোগ ওঠে।

১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সরকারি খরচ বাড়িয়ে শ্রমিকপ্রতি ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। হাজার হাজার কর্মী সেখানে গিয়ে কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বারবার।

বর্তমান সরকারের চার মাসের মাথায় এই সফরের মূল লক্ষ্য তাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সংকট কাটানো। দেশটির প্রশাসনও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান জানান দিয়েছে বারবার।

শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে ‘জিটুজি’ বা সরকারি পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা। রিক্রুটিং এজেন্সির দৌরাত্ম্য কমিয়ে দুই দেশের সরকারি তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ করা গেলে অভিবাসন ব্যয়ও নামিয়ে আনা যাবে এক লাখ টাকার কাছাকাছি।

ভুয়া কোম্পানির নামে কর্মী নিয়ে প্রতারণার পথ বন্ধ করতে ‘ওপেন ভিসা’র বদলে সুনির্দিষ্ট এবং যাচাই করা চাহিদার বিপরীতে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগও নিতে চায় দুই দেশ।

আসিয়ান বা অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনসের সাথেও শক্ত যোগাযোগ চায় ঢাকা। তাই কুয়ালালামপুরের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে এই জোটে বাংলাদেশের 'সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার' হওয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো পুত্রাজায়া।

রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম বলেন, “বাংলাদেশের স্বার্থে আসিয়ানের দেশগুলোর সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক প্রয়োজন। এটা নানা কারণেই আমরা ‘নেগলেক্ট’ করেছি। আসিয়ানের সাথে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের স্বার্থ আছে। সেজন্যই মালয়েশিয়ার সাথেও সম্পর্ক জোরদার করা দরকার।”

“আমরাতো আর আসিয়ানের সদস্য হতে পারবো না। কিন্তু বিভিন্ন রকম পার্টনারতো হতেই পারি। একইসাথে মালয়েশিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক ইস্যু আছে। শ্রমবাজার একটা বড় ইস্যু। এই সফরে নিশ্চয়ই সেসব নিয়ে কথা হবে। প্রযুক্তি নিয়েও যৌথভাবে কাজ হতে পারে”, বলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির।

অর্থনীতির প্রয়োজনে বেইজিং

মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন পৌঁছাবেন ২১এ জুন। পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, এই সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

আলোচসূচিতে থাকবে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের জন্য অবকাঠামো প্রকল্প। তিস্তা মহাপরিকল্পনাও থাকছে আলোচনায়।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় প্রায় ২৪ বিলিয়ন (২,৪০০ কোটি) ডলারের ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু গত এক দশকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রকল্প যাচাইয়ের ধীরগতির কারণে সেই ঋণের বড় একটি অংশই ছাড় করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীনে রপ্তানি করে। অন্যদিকে, দেশটি থেকে আমদানি করে ২৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে এখন পর্যন্ত ১১ বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণ চুক্তি চূড়ান্ত বা মঞ্জুর হয়েছে।

তাই বাকি টাকা ছাড় করাসহ, ঋণ পরিশোধ সহজ করা নিয়েও আলোচনা হবে এবারের সফরে। তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে দীর্ঘদিন। এই সফরে এটিও থাকছে আলোচনায়।

রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলছেন, “আমাদের বিনিয়োগ দরকার। এখানে চীনতো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে চীন সফরের অনেকটা অংশ জুড়েই থাকবে। তবে তিস্তা নিয়ে খুব একটা বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে আমার মনে হয় না।”

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট র‍্যাপিড-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক মনে করেন, এই সফর বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য বড় সুযোগ। তবে ভূরাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতরও। তাই যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, “বিশেষ করে পোর্ট বা মেজর ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরিতে চীনের সঙ্গে চুক্তি কনসার্ন হতে পারে। এখানে অবশ্য জয়েন্ট ভেঞ্চার পলিসি নেওয়া যেতে পারে। যেমন চীনের সঙ্গে জাপান বা অন্য দেশ নিয়ে এ ধরনের প্রকল্প জয়েন্ট ভেঞ্চারে হতে পারে।”

“বিনিয়োগ আনার জন্য তিনটি কারনে এই সফরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাংলাদেশকে সহায়তা করার মতো পুঁজি তাদের রয়েছে। দ্বিতীয়ত, যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা চীনের আছে, তা বাংলাদেশের জন্য বড় বিনিয়োগ হতে পারে। আর তৃতীয়ত সময়। চীনের মতো দ্রুত প্রকল্প বাস্তয়ন খুব কম দেশেই করতে পারে,”  যোগ করেন র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ছয় দিনের সফরটি বাংলাদেশের বাস্তবমুখী কূটনীতির নতুন অধ্যায় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যেখানে দেশের অর্থনৈতিক লাভ, রেমিট্যান্সের নিরাপত্তা, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, ঋণের শর্ত সহজ করা এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আবার একই সাথে প্রথমে মালয়েশিয়া বেছে নেওয়াতে কোনো আঞ্চলিক শক্তির দিকে ঝুঁকে যাওয়া এড়ানো গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান সফরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "সামগ্রিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্তটা বেশ ভালো। ভারত ও চীনের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আর বিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্য রেখে এগিয়ে চলাটা জরুরি।"

রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম বলছেন, যখন সময় হবে, প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রও যাবেন। আবার ভারতের সাথেও সুসম্পর্ক রাখতে হবে।

“ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আর পশ্চিমবঙ্গের সরকার এখন এই দলের। এই ‘অ্যালাইনমেন্ট’ না থাকলে অনেক সমস্যা হয় তা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে পানিবণ্টন। এখন সেই সমস্যাগুলো উতরাতে হবে।”

এম হুমায়ুন কবির বলছেন, “এখানে বটম লাইন হচ্ছে বাংলাদেশের স্বার্থ। অন্য দেশের স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে, তবে সেটা সেকেন্ডারি। প্রাইমারি হলো, বাংলাদেশ ফার্স্ট।”

প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগের দুয়েকদিনের মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, ইউকে, জাপানের রাষ্ট্রদূত। 

তারিক করিম মনে বলেন, “তাদের হয়তো ‘কনসার্ন’ আছে। এটাও মাথায় রাখতে হবে। সুপারপাওয়ারদের মধ্যেই আমাদের ‘নেভিগেট’ করতে হবে।”

তবে এখানে ব্যালান্স করার কোনো বিষয় নেই বলে মনে করেন রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। 

“আমাদের যেটুকু লাভ সেই বিবেচনায় আমরা যুক্ত হই। এখানে কোনো ব্যালান্স করার ক্ষমতা আমাদের নেই। জাতীয় স্বার্থ দেখেই আমাদের কাজ করতে হবে,” যোগ করেন তিনি।