চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার পলিটিক্যাল ব্যুরোর সদস্য ওয়াং ই’র আমন্ত্রণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীন সফরে। দেশটির ‘পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের’ চেয়ারম্যান ওয়াং হুনিংয়ের সাথেও বৈঠক হয়েছে তার।
সফরে যাওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বেইজিং সফরে ‘অবশ্যই’ আলোচনা হবে।
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা হয়ে আসছে ভারতের সাথে। কিন্তু বাধা ছিলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার, স্পষ্ট করে বললে মমতা বন্দোপাধ্যায়।
এবার পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি। কেন্দ্র আর রাজ্য সরকার একই দলের হওয়ার ভারতের সাথে কি তিস্তা চুক্তির আলোচনা এগোবে?
চীন যাওয়ার আগে এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের ভাবনা স্পষ্ট করে বলেছেন, “প্রত্যাশা থাকবে যাতে করে এই চুক্তিটা যেটা হয়েছিল তখন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আমরা ‘কনসিডার’ করতে পারি কি না। কিন্তু সেজন্যতো বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদেরকে করতে হবে।”
তিস্তা একটি নদীর নাম
তিস্তা নদীর জন্ম ভারতের সিকিম রাজ্যে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩ হাজার ফুট ওপরে হিমালয়ের পাহুনরি হিমবাহ থেকে। পাহাড়ি ঢল বেয়ে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার হয়ে পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই নীলফামারী জেলার ডিমলা আর লালমনিরহাটের পাটগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে চারশ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদী।
তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরই তিস্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে অন্তর্বর্তী একটা চুক্তিও হয়েছিল। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের ছিল ৩৬ শতাংশ, ভারতের ৩৯ শতাংশ আর ২৫ শতাংশ পানি বরাদ্দ ছিলো নদীর নাব্যতা ঠিক রাখার জন্য।
দুই বছর মেয়াদী চুক্তিটি শেষ হওয়ার পর আরো দুই বছর বাড়ানো হয়। ১৯৮৭ সালের পর আর কোনো চুক্তি হয়নি।
১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানিচুক্তির পর তিস্তা চুক্তি নিয়েও আশান্বিত হয়েছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু তা আর হয়নি। বরং ১৯৯৮ সালে ভারত জলাপাইগুড়ির গজলডোবায় ব্যারেজ তৈরি করে তিস্তা নদীর ওপর।
আবার তিস্তার উজানে জলবিদ্যুতের জন্য অসংখ্য ড্যাম তৈরি করে রেখেছে সিকিম। তাই শুষ্ক মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গেও পানি থাকে না বলে, বহুবার অভিযোগ করেছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়।
জটিল রাজনৈতিক খেলার মারপ্যাঁচে পড়ে তাই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ মানুষের জীবন।
বাংলাদেশের দাবি ন্যায্য পানির হিস্যা, আর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বয়ান, দেওয়ার মতো পানি নেই। দুই পক্ষের এই চাপানউতোরে হারিয়ে যায় মানুষের দুর্ভোগ।
গজলডোবায় বর্ষায় পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে কম। চর পড়ে যায়। এই বাঁধে পানি আটকে রেখে সেই পানি শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
পানি আটকে থাকায় বাংলাদেশের উত্তর অংশে পানির অভাব দেখা দেয় শুষ্ক মৌসুমে।
অভিন্ন নদীর জন্য আন্তর্জাতিক আইন আছে। বাংলাদেশের দাবি সেই আইন অনুযায়ী ন্যায্য পানির হিস্যা।
তিস্তা যখন রাজনীতির ‘কার্ড’
তিস্তা নদী ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪ নদীর একটি। এই নদীর পানি গড়াক আর না গড়াক, দুই দেশের রাজনীতিতে ‘তিস্তা’ গড়িয়েছে অনেক দূর।
কংগ্রেস থেকে বিজেপি, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে যে দলই থাকুক না কেন, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বরাবরই ছিলেন তিস্তা চুক্তির বিরুদ্ধে। তার ভাষায়, ‘পশ্চিবঙ্গের মানুষের স্বার্থবিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে’।
২০২৪ সালের জুনেও মমতা বন্দোপাধ্যায় কড়া ভাষায় বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গকে পাশ কাটিয়ে তিস্তা-গঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলোচনা করা যাবে না।
এর আগেও বহুবার স্পষ্ট ভাষায় তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করেছেন মমতা বন্দোপাধ্যায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিস্তা চুক্তি নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়। ২০১১ সালে হয় হয় করেও শেষ পর্যন্ত চুক্তি সই হয়নি।
ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের আগে দুই দেশের পানি সম্পদমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়ে দুইপক্ষ একমত হয়েছিল। বাংলাদেশকে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পানি দিতে সম্মত হয়েছিল।
ওই সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনি বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বলেছিলেন মনমোহন সিংয়ের সাথে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বাংলাদেশে আসবেন।
মনমোহন সিং এসেছিলেন বটে। কিন্তু মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পা পড়েনি ঢাকায়।
এরপর থেকে ভারতের উচ্চপদস্থ কেউ ঢাকা সফরে এলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি করা হয়, তা হলো, তিস্তা চুক্তি কবে হবে?
জবাবে ওই একটা ইঙ্গিতই স্পষ্ট থাকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে পাশ কাটিয়ে এই চুক্তি সম্ভব নয়।
তিস্তা তুমি কার
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। ১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নিয়ম অনুযায়ী, উজানের দেশ ইচ্ছা করলেই, আন্তর্জাতিক নদীর উপর ভাটির দেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু তৈরি করতে পারে না।
তবে ভারতের সংবিধান আন্তর্জাতিক নদীকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। সংবিধানে নদী বলতে 'আন্তঃরাজ্য নদী'-কেই বুঝিয়েছে।
ভারতের সংবিধানের সপ্তম তফসিলে ক্ষমতা তালিকার ৫৬ নাম্বার এন্ট্রিতে আন্তরাজ্য নদীর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
আবার সংবিধানের রাজ্য সরকারের ক্ষমতা তালিকার ১৭ নাম্বার এন্ট্রিতে পানি সরবরাহ, সেচ, খাল খনন, হ্রদ, নালা ও বাঁধ নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং জলশক্তি ব্যবহারের এখতিয়ার রাজ্য সরকারের।
ভারতের সংবিধানে আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকলেও আন্তর্জাতিক চুক্তির এখতিয়ার নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া আছে।
ভারতের সংবিধানের ৭৩(১)(খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ভারত সরকারের করা কোনো চুক্তি বা সমঝোতা থেকে তৈরি অধিকার, কর্তৃত্ব এবং এখতিয়ারের চর্চা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত।
কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা তালিকার ১০ ও ১৪ নাম্বার এন্ট্রিতে পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত বিষয়ে অন্য দেশের সাথে চুক্তি, সমঝোতার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বেরই অন্তর্ভুক্ত।
আন্তর্জাতিক চুক্তির এখতিয়ার স্পষ্ট করা হয়েছে ভারতের সংবিধানের ২৫৩ নাম্বার অনুচ্ছেদে। বলা হয়েছে ভারতের সমগ্র রাজ্যক্ষেত্র বা কোনো অংশের জন্য, অন্য কোনো দেশের সাথে চুক্তি, সমঝোতার এখতিয়ার সংসদের আছে।
তাই ভারতের আইন অনুযায়ী তিস্তা চুক্তির ভারতের কাছে কার্যত আইনি বাধা কম।
এ নিয়ে ২০১৭ সালে একবার প্রশ্ন করেছিলাম ভারতের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বিজেপি নেতা সুরেন্দ্রজিৎ আহলুওয়ালিয়াকে। তখন তিনি ভারতের যুব মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী।
আহলুওয়ালিয়া বলেছিলেন, সংবিধানতো আছেই। ‘পলিটিকাল নর্ম’ বলেও একটা বিষয় আছে।
বুধবার এস এস আহুলুওয়ালিয়া আলাপ-কে বলেছেন, “রাজ্য সরকার রাজ্যের মানুষের স্বার্থ দেখবে। কেন্দ্রীয় সরকার দেশ এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থ দেখবে। এখন যেহেতু দুই জায়গাতেই বিজেপি সরকারে আছে তিস্তা চুক্তির বিষয়টি নিশ্চয়ই ইতিবাচক আলোচনায় গড়াবে।”
তিনি যোগ করেন, “বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থও যাতে রক্ষা হয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিশ্চয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি’র সাবেক সভাপতি ও বিজেপির বর্তমান জাতীয় সচিব রাহুল সিনহা একাধিকবার বলেছেন তার দল রাজ্য সরকারে এলে তিস্তা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচকভাবে এগোবে।
রাহুল সিনহা বুধবার আলাপ-কে বলেছেন, “মাত্রতো নির্বাচন শেষ হলো। শপথটা হোক। নিশ্চয়ই এটা নিয়ে আলোচনা হবে।”
দৃশ্যপটে চীন
তিস্তা চুক্তি নিয়ে যখন কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না, তখন ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট’ নামের এক প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ সরকার।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে বেইজিং সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছেন বলে ওই সময় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়।
এই প্রকল্পে চীনের সংশ্লিষ্টতার খবরে দিল্লি উদ্বেগ জানায়। এর মধ্যেই বেইজিং প্রায় ১০০ কোটি ডলারের প্রকল্প প্রস্তাবের খবর জানা যায়। যদিও তা কোনো দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
এরপর ভারতও তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ জানায়। ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে এসে এ কথা জানান দেশটির তখনকার পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা।
ওই বছরের জুনে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়ও তিস্তা মহাপরিকল্পনায় দেশটি যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখায়।
শেখ হাসিনার পতনের পর কূটনৈতিক টানাপোড়েনে আর ভারতের তরফ থেকে আর তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শোনা যায়নি।
২০২৫ সালের ২৯এ জুলাই চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, তিস্তা নদী পুনর্বাসন ও বহুমুখী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তিনি বলেন, “চীন সব ধরনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারের হাতে।”
এই বাস্তবতাতেই চীন সফরে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ৫ই মে তিনি বলেছিলেন, “আপনি তিস্তার কথা বললেন…অবশ্যই তিস্তার কথা হবে, অবশ্যই। এইটা আমাদের সেই অঞ্চলের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়। তারা ডাক দিয়েছে ‘জাগো বাহে’। সেই ডাকে যদি আমরা সাড়া না দিই, তাহলে পরে আমরা আছি কেন?”
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের শপথ ৯ই মে, শনিবার। মুখ্যমন্ত্রীর নাম এখনো ঘোষণা হয়নি। কিন্তু বিজেপির আগের অবস্থান বিবেচনায় জোর আলাপ উঠছে তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যত নিয়ে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, “দেখুন, পশ্চিমবঙ্গে এখনও সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং তারা কী ভাবছেন, কী করবেন, সেটা তারা যদি না জানান, তাদের ‘মাইন্ড রিড’ করার কাজ আমার না।”