পশ্চিমবঙ্গে শেষ পর্যায়ের ভোটগ্রহণ শুরু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। রাজ্যের সাত জেলার মোট ১৪২টি আসনে একযোগে বুধবার সকাল সাতটা থেকে ভোট নেওয়া শুরু হয়েছে। জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলে’র প্রতিবেদন বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নির্বাচন কমিশন জানায়, ভোটগ্রহণ চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। প্রথম দফার পর শেষ পর্বেই নির্ধারিত হবে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ। শেষ দফাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বাড়তি উত্তেজনার কারণে বিশেষ নজরদারির আওতায় আছে এ নির্বাচন।

শেষ দফার নির্বাচনি লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন মোট ১ হাজার ৪৪৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ২২৮ জন এবং নারী ২২০ জন। সংখ্যার বিচারে নারী অংশগ্রহণ এখনও সীমিত হলেও আগের তুলনায় নারীদের উপস্থিতি বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

শেষ পর্যায়ে মোট ভোটার ৩ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ কোটি ৬৪ লাখের বেশি এবং নারী ভোটার ১ কোটি ৫৭ লাখের বেশি। ভোটের ঠিক আগে ট্রাইব্যুনালের রায়ে ভোটার তালিকায় ১ হাজার ৪৬৮ জনের নাম যুক্ত হয়েছে, অন্যদিকে ছয়জন ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এসব কারণে শেষ মুহূর্তেও ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।

ভোটগ্রহণের জন্য মোট ৪১ হাজার ১টি বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮৩৩টি বুথকে ‘অতিস্পর্শকাতর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা, নজরদারি ক্যামেরা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি এবং কুইক রেসপন্স টিম মোতায়েন করা হয়েছে।

শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত দুই দিনে সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে দুই হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই হাজার ৩০০-এর বেশি কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং প্রায় ৩৯ হাজার রাজ্য পুলিশ সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে নিরাপত্তা বাহিনীর এই ব্যাপক উপস্থিতি ভোটের রাজনৈতিক গুরুত্বই তুলে ধরছে।

জেলাভিত্তিক নিরাপত্তা মোতায়েনেও কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বাহিনী রাখা হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনায়, যেখানে ৩৩টি আসনের জন্য ৫১২ কোম্পানি মোতায়েন রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১ আসনের বিপরীতে ৪১৩ কোম্পানি, হুগলিতে ১৮ আসনে ৩২৩ কোম্পানি, নদিয়ায় ১৭ আসনে ২৮৭ কোম্পানি, কলকাতায় ১১ আসনে ২৭৪ কোম্পানি, পূর্ব বর্ধমানে ১৬ আসনে ২৬৩ কোম্পানি এবং হাওড়ায় ১৬ আসনে ২৫৮ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

নির্বাচনি নিরাপত্তায় এবার জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)-কেও যুক্ত করা হয়েছে। কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় তারা গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছে। 

এই দফার নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্র ভবানীপুর। ভোটের লড়াইয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এছাড়াও উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতেও রয়েছে বিশেষ নজর। এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী করা হয়েছে আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া নারী চিকিৎসকের (যিনি অভয়া নামে পরিচিত) মা রত্না দেবনাথকে।

এছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, ব্রাত্য বসু, জাভেদ খান, শশী পাঁজা, অরূপ বিশ্বাস, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও বেচারাম মান্নার মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিজেপির হয়ে লড়ছেন তাপস রায়, স্বপন দাশগুপ্ত, অর্জুন সিং, সজল ঘোষ ও হিরণ চট্টোপাধ্যায়। বামফ্রন্টের হয়ে রয়েছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় ও দীপ্সিতা ধর। আইএসএফের হয়ে লড়ছেন নওশাদ সিদ্দিকী।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রথম দফায় ২৬৪টি আসনের মধ্যে ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে ২৩ এপ্রিল। এবার দ্বিতীয় ও শেষ দফার মাধ্যমে পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে। এখন প্রশ্ন—তৃণমূল কংগ্রেস আবারও ক্ষমতায় ফিরবে, নাকি সরকার পরিবর্তনের বার্তা দেবে ভোটাররা। সেই উত্তর মিলবে আগামী ৪ মে ফল ঘোষণার দিন।