ইস্টার্ন রিফাইনারি সংকটে পরিশোধিত তেল আমদানিতে চাপ কতটা

ক্রুড বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পর সেটি পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, ফার্নেস, কেরোসিন ও বিটুমিন উৎপাদন করে আসছিল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার পাঁচ ভাগের এক ভাগের চাহিদাই গত বছর পূরণ করেছে এই রিফাইনারি।

যার মধ্যে দেশের মূল জ্বালানি তেল ডিজেলের সাড়ে ১৫ শতাংশ এবং পেট্রোলের প্রায় ১২ শতাংশই এসেছে এই ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে।

তবে জ্বালানি সংকটে এখন আর পূর্ণ সক্ষমতায় নয়, বরং সীমিত বা ‘লো-ফিডে’ পরিচালিত হচ্ছে এই রিফাইনারি।

এর ফলে স্থানীয়ভাবে জ্বালানি উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ঘাটতি বাড়বে। যা পূরণে বাড়াতে হবে সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ছুটছে রকেটের গতিতে।

এরফলে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

“এখানে আমাদের নিজস্ব রিফাইনারি, নিজস্ব লোকবল, স্বাভাবিকভাবেই খরচ কম হতো। সেটা এখন যদি পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হয় তাহলে খরচ বাড়বে। যার চাপ পড়বে রিজার্ভে,” আলাপ-কে বলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম।

যদিও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী মনে করেন, যেহেতু বাংলাদেশ আগে থেকেই অপরিশোধিত নয় ‘পরিশোধিত তেল আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল’, তাই সমস্যা হবে না।

অধ্যাপক ড. ম. তামিম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ

পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেলে ফারাক কত

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি আমদানির ব্যয়ের সর্বশেষ অর্থবছরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে শোধন করা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১৫ লাখ ১০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।

অন্যদিকে একই সময়ে প্রায় ৪৬ লাখ ৭ হাজার ৪৫ মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল ক্রয়ে খরচ হয়েছে ৩৮ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা।

স্বাভাবিক সময়েও প্রতি মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত তেলে খরচ বেশি হয়েছে ২১ শতাংশ।

এরমধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যয় ৮ থেকে ১৫ শতাংশ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তার মানে প্রতি টন হিসেবে পরিশোধিত জ্বালানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইআরএল কম সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ায় এই সাশ্রয়ের সুযোগ কমে যাচ্ছে, বাড়ছে আমদানি ব্যয়।

ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে সরকারকে রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করতে হবে।

এতে যা সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।

“ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে সরকারকে। এর পরিমাণ ২১ শতাংশ। তাছাড়া এখন বিশ্ববাজারে যেভাবে তেলের দাম বাড়ছে, তাতে এখানে ধারণার চেয়েও ব্যয় বেশি বাড়তে পারে। বিশেষ করে যখন সব কিছু আলাদা আলাদা ক্রয় করতে হবে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম

রাশিয়ার তেল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা

ব্লুমবার্গের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়লেও রাশিয়ার প্রধান ক্রুড তেলের মিশ্রণ এখনো উল্লেখযোগ্য ছাড়ে পাওয়া যাচ্ছে।

যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের অপরিশোধিত তেলের তুলনায় প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ কম।

বিশ্ববাজারে তুলনামূলক কম দামে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল পাওয়া গেলেও, নানা কারণে বাংলাদেশ তা আমদানি করতে পারছে না।

এর মধ্যে একটি কারণ হলো- ইআরএলের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা।

“রাশিয়ার ক্রুড তেলের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় বিদ্যমান রিফাইনারি অবকাঠামো দিয়ে তা শোধন করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন উন্নত ও জটিল পরিশোধন প্রযুক্তি, যা ইআরএলে নেই,” বলেছেন ম. তামিম।

মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর ক্রুড অয়েল আমদানির কথা ভেবেই আইয়ুব খানের সময় ইস্টার্ন রিফাইনারি তৈরি হয়েছিল।

এখন সেখানে বেশি সালফারযুক্ত রাশিয়ায় ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে গেলে ‘আরও একটি ইউনিট’ সংযোজন করতে হবে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের সাবেক এই অধ্যাপক।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা তেলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তা কাজে লাগাতে না পারায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ক্রুড অয়েলের বিকল্প উৎস

একদিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আসছে না, অন্যদিকে রাশিয়ার তেলও আনা সম্ভব হচ্ছে না।

তাই বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে চারটি দেশের তেলকে বাংলাদেশে ‘পরিশোধন যোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইস্টার্ন রিফাইনারি।

দেশগুলো হলো নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে ও আলজেরিয়া।

এসব দেশের ‘বনি ক্রুড’, ‘মালয়েশিয়ান ব্লেন্ড’, ‘আলবেইন ব্লেন্ড’ ও ‘আলজেরি ক্রুড’-এর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলো বাংলাদেশে শোধনযোগ্য।

এ বিষয়ক ইস্টার্ন রিফাইনারির একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে।

এরপরই মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন তেল কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে, যা চলতি মাসেই দেশে আসার কথা।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কিছুটা কমবে এবং সরবরাহ ঝুঁকি আংশিক প্রশমিত হতে পারে।

ইআরএল পূর্ণ সক্ষমতায় না ফেরা পর্যন্ত পরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা কমবে না

স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, ইআরএল পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে না পারা পর্যন্ত পরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরতা কমবে না বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

উপরন্তু আমদানি নির্ভরতা যত বাড়বে, ততই বাড়বে ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু বিকল্প উৎস নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোটাই হলো কার্যকর সমাধান।