মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত আপাতত থেমে থাকলেও, উত্তেজনা কমেনি। বরং যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আর সমাধানহীন আলোচনার পর নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব।
বন্দুকের বদলে বাজার, মিসাইলের বদলে জ্বালানি আর যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে অর্থনীতি হয়ে উঠছে লড়াইয়ের মঞ্চ।
সোমবার থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর নতুন মাত্রা পেয়েছে সংকট।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাতের ধরন পালটে যাচ্ছে। মুখোমুখি সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগই হয়ে উঠছে প্রধান কৌশল।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর তাই বড় শঙ্কা, সংঘাত কি এখন পূর্ণমাত্রার অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিতে যাচ্ছে?
নতুন ধরনের যুদ্ধের দিকে বিশ্ব
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে কৌশলগত চাপ তৈরি করছে।
ইরান যেখানে জ্বালানি রুট ও আঞ্চলিক প্রভাবকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক জোট এবং অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে পালটা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে।
ফলে যুদ্ধের ধরন বদলে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে এমন এক বাস্তবতায় যেখানে অর্থনীতি নিজেই অস্ত্র।
যদিও যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় স্বস্তি ফিরেছিল বৈশ্বিক বাজারে। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকেনি।
কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা রূপ বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
এক প্রতিবেদনে তারা বলেছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল রয়ে গেছে, কারণ হরমুজ প্রণালি খোলা আছে কি-না, সে বিষয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটন পরস্পরবিরোধী বার্তা দিচ্ছে। ইসরায়েল লেবাননেও হামলা অব্যাহত রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই শান্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনৈতিক ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।
এই অনিশ্চয়তা থেকেই স্পষ্ট হচ্ছে, সামরিক সংঘাত আপাতত কমলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত লড়াই থেমে নেই। যা পুরো বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছে এক ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির দিকে।
হরমুজ ঘিরে সংকট আগের চেয়ে বেড়েছে
সোমবার ইরানের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ও বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে হরমুজে অবরোধ কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অবরোধ কার্যকর হলে ইরানের বন্দরগুলোতে কোনো জাহাজ ভিড়তে পারবে না এবং বর্তমানে যে সব জাহাজ ইরানের বন্দরগুলোতে আছে, সেগুলো বন্দর ত্যাগ করে বাইরে যেতে পারবে না।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি প্রতিনিধিদের ২১ ঘণ্টার সংলাপ আপাত ব্যর্থ হওয়ার পর রবিবার গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জলপথ হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
এর কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর করা বিষয়ক পোস্ট দিয়ে জানায় মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড।
কোনো জাহাজ যদি অবরোধ অমান্য করে, তাহলে সেটি লক্ষ্য করে হামলা চালাবে বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই ধরে রেখেছে ইরান। নিজেদের পছন্দ মতো দেশের জাহাজগুলোকে এই প্রণালি পাড়ি দেওয়ার অনুমতি দিচ্ছে তারা।
সেখানে এবার যুক্তরাষ্ট্রও অবরোধের ঘোষণা দেওয়ায় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সেই জ্বালানি বাজার।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি। যেখান দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়।
ফের উত্তাপ ছড়াচ্ছে জ্বালানি বাজার
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় ভাঙনের পর গালফ অঞ্চলের শেয়ারবাজার ও জ্বালানি খাতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
বিবিসি’র প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হওয়া এবং এরপর ট্রাম্পের ইরানের বন্দর অবরোধের ঘোষণার পর, সোমবার এশিয়ায় জ্বালানি বাজার খোলার পরপরই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে।
বিশ্বব্যাপী বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ১০২ ডলার ৩০ সেন্টে (৭৬ পাউন্ড ৩২ পেন্স) দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ১০৪ ডলার ৯৪ সেন্টে পৌঁছেছে।
ফোর্বস তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। যার পেছনে থাকে ২০০৮ সালের মূল্যবৃদ্ধি, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং এর পরিণতির স্মৃতি।
নতুন করে তেলের দামে যে ঊর্ধ্বগতি যোগ হচ্ছে, তা শুধু স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ অনিশ্চয়তা নয় বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন ভাবনার প্রতিফলন। যা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বলেও সতর্ক করেছে ফোর্বস।
এতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধ এখন সরাসরি ফ্রন্টলাইনে না থাকলেও তেলের দামের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
পণ্য ও শেয়ারে প্রভাব
জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বোঝার ক্ষেত্রে পণ্য এবং শেয়ার আলাদা করে দেখা বেশি কার্যকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কারণ তেলের মতো পণ্যের দাম সরাসরি সরবরাহ চাহিদা ও ঝুঁকি প্রিমিয়ামের ওপর নির্ভর করে।
ঝুঁকি প্রিমিয়াম হচ্ছে, কোনো বিনিয়োগ বা সম্পদে থাকা অতিরিক্ত ঝুঁকির কারণে বিনিয়োগকারীরা যে বাড়তি রিটার্ন বা লাভের আশা করেন। সহজভাবে বললে, ঝুঁকি বেশি মানে লাভের দাবি বেশি। এই ‘বাড়তি লাভের অংশটাই’ ঝুঁকি প্রিমিয়াম।
জ্বালানি কোম্পানির শেয়ারে এই ঝুঁকি প্রিমিয়ামের সঙ্গে অতিরিক্ত বিষয় যুক্ত থাকে, যেমন ঋণের পরিমাণ, ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত, উৎপাদন খরচ এবং বাজার মূল্যায়ন।
যেমন ২০১৫-১৬ সালে তেলের দাম ১০০ ডলার থেকে ৩০ ডলারের নিচে নেমে গেলে অনেক কোম্পানির শেয়ারমূল্য তেলের চেয়েও বেশি হারে কমে যায়।
বিবিসি’র প্রতিবেদন বলছে, সোমবার সকালের লেনদেনে এশিয়ার প্রধান শেয়ার সূচকগুলো নিম্নমুখী ছিল।
জাপানের ‘নিক্কেই ২২৫’ সূচকটি কমেছে ১ শতাংশ। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক হ্রাস পেয়েছে দশমিক ৮ শতাংশ ।
অর্থনৈতিক অভিঘাত বাড়ছে
যুদ্ধের প্রভাব শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা রবিবার সিবিএস নিউজের 'ফেইস দ্য নেশন' অনুষ্ঠানে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই 'স্থায়ী' হয়ে গেছে।
অন্যদিকে দ্য গার্ডিয়ানের আরেক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের আশঙ্কা তুলে ধরে বলা হয়েছে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যে পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি গত মাসে প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মার্কিন শ্রম দপ্তর জানিয়েছে, গেল মার্চে ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে যা ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০২২ সালের পর এটাই সবচেয়ে বড় মাসিক বৃদ্ধি, তখন রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে।
সবমিলে মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুধু তেল-গ্যাস নয় অন্যান্য পণ্যের বাজারেও নতুন জটিলতা তৈরি করছে।
তাই শঙ্কা হলো, এই সংঘাত বাণিজ্য যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে, যা গভীরভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেবে।