খাদ্যে ধেয়ে আসছে বড় সংকট, চোখ রাঙাচ্ছে দ্রব্যমূল্য

বাংলাদেশে “আগামী দিনে দ্রব্যমূল্য বাড়বে- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই” - রবিবার একথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যে কোন সংকট সহজেই স্বীকার করে না নেওয়ার প্রবণতা যখন ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সব সরকারের মধ্যেই দেখা গেছে, সেখানে নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি নিসঃন্দেহে ভাবিয়ে তোলার মত ব্যাপার।

সরকার নতুন হলেও শেষ ছয় বছরে চারটি বড় ধরনের ঝাঁকুনির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিকে। যার শুরুটা হয়েছিল ২০২০-এ, কোভিড এর মধ্য দিয়ে। এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থান আর সবশেষ ২০২৬-এর শুরুতেই ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের অভিঘাত। 

প্রতি দুই বছর পর পর দেশের ভেতর-বাইরের এমন ধাক্কায় থিতু হতে পারছে না অর্থনীতি।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, জ্বালানির সংকট, উচ্চ মূল্য ও ডলারের ধারাবাহিক বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি নতুন করে সংকট বাড়াবে খাদ্য পণ্যের দামে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বর্তমান তখন নতুন করে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও আমদানি নিয়ে ভাবাচ্ছে এলসি ওপেনিংয়ের নেগেটিভ চিত্র।

অর্থনীতিবিদরা এবারের সমস্যাকে দেখছেন গত অর্ধ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সংকট হিসাবে।

“আমি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতামত দেখছি, তারা বলছেন ১৯৭৪, ১৯৭৯ এবং ২০২২ এর সংকট এই তিনটাকে যোগ করলে বর্তমান সংকটের সমান হবে,” আলাপ-কে বলছিলেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

খাদ্যে বেড়েছে এলসি ও আমদানি নির্ভরতা

সামগ্রিকভাবে গত এক বছরে বাংলাদেশে এলসি খোলার প্রবণতা কমলেও বিপরীত চিত্র দেখা গেছে খাদ্য পণ্য আমদানিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের এপ্রিল থেকে ২০২৬-এর মার্চ পর্যন্ত গত এক বছরে সামগ্রিক এলসি ওপেনিং কমলেও এ সময়ে বাংলাদেশ খাদ্য আমদানিতে নির্ভরতা বেড়েছে।

গত এক বছরে দেশে খাদ্য আমদানিতে এলসি ওপেনিং বেড়েছে ২২ দশমিক ১৯ শতাংশ।

সহজ করে বললে, লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি ওপেনিং হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি পেমেন্ট পদ্ধতি। যেখানে আমদানিকারকের (ক্রেতা) পক্ষ থেকে তার ব্যাংক রপ্তানিকারককে (বিক্রেতা) এই মর্মে নিশ্চয়তা দেয় যে, নির্দিষ্ট শর্তানুযায়ী পণ্য জাহাজীকরণ বা সরবরাহ করা হলে ব্যাংক বিক্রেতাকে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করবে।

এলসি ওপেনিংয়ের এই চাপ যখন বাড়ছে তখন গত অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে খাদ্যপণ্যের আমদানি। 

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু চাল ও গম আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যয় করেছে প্রায় ২৩১ কোটি ডলার।

যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরই ৬০ থেকে ৭০ লাখ টন চাল ও গম আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে।

এর পাশাপাশি তেলের ৯০ শতাংশ এবং ডালের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আমদানি করা হয়। পেঁয়াজ-রসুনের মতো মসলাজাতীয় পণ্যও আমদানি করতে হয়।

মার্চে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে খাদ্যপণ্যের দাম

বিশ্বে বাড়ছে খাদ্য পণ্যের দাম

বাংলাদেশে যখন খাদ্যে এলসি ওপেনিং ও আমদানি নির্ভরতা বাড়াচ্ছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও তখন দিচ্ছে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো তথ্য।

এফএও-এর সাম্প্রতিক ‘ফুড প্রাইস ইনডেক্স’ অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। যা টানা দ্বিতীয় মাসের মতো খাদ্যদামের ঊর্ধ্বগতি।

এফএও’র বিশ্লেষকরা মনে করছেন যা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার ইঙ্গিত। আগামী কয়েক মাস পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তারা। 

আর যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে খাদ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে। আর তা বাংলাদেশের খাদ্য আমদানিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।

“রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় খাদ্য আমদানিতে যে ধরনের চাপ পড়েছিল এবারে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ তার চেয়েও বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াবে,” আলাপ-কে বলেছেন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান।

বৈশ্বিক চাপে বাংলাদেশ

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে ঝুঁকির দিক দিয়ে বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে ‘লাল’ শ্রেণিতে।

গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তার হালনাগাদ পরিস্থিতি তুলে ধরে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ১০ থেকে ১২ মাসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে থাকে।

যেখানে দেখা যায়, সর্বশেষ ১০ মাস ধরেই বাংলাদেশ লাল তালিকায় আছে। এই সময়ে বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও ১৩টি দেশ রয়েছে এই লাল শ্রেণিতে।

দেশগুলো হলো ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, ঘানা, মঙ্গোলিয়া, নাইজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইউক্রেন, জাম্বিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, মলদোভা ও রাশিয়া।

খাদ্য মূল্যস্ফীতি কোন দেশে কত বেশি, তা বোঝাতে বিভিন্ন দেশকে চার শ্রেণিতে ভাগ করেছে বিশ্বব্যাংক।

যে সব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশ বা তার বেশি অর্থাৎ যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, সেসব দেশকে রাখা হয়েছে ‘বেগুনি’ শ্রেণিতে।

গত এক বছরের মধ্যে টানা ৯ মাস বেগুন শ্রেণিতে আছে মালাউয়ি। আট মাস ধরে রয়েছে ইরান ও জাম্বিয়া। আর সাত মাস বেগুনি শ্রেণিতে আছে তুরস্ক ও আর্জেন্টিনা।

এরপর ৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে যে সব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি, তাদের ‘লাল’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও মোটামুটি ঝুঁকিতে আছে।

এ ছাড়া ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে ‘হলুদ’ ও ২ শতাংশের কম মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে ‘সবুজ’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ১৭২টি দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে সংস্থাটির প্রতিবেদনে।

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশের ঝুঁকি কতটা?

এর মানে হলো, বিশ্বজুড়েই বাড়ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। তাই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিও কমছে না।

বিশেষ করে যখন দেশের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের বড় অংশই আমদানি নির্ভর।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, পাটের বীজ ৭০ শতাংশের ওপর, ভুট্টা প্রায় ৯০ শতাংশ, সবজি ৬০ শতাংশ, হাইব্রিড ধান ২০ শতাংশ, তেলবীজ ও মসলার বীজের ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে।

এছাড়া এগুলো উৎপাদনের জন্য যে ইউরিয়া সারের চাহিদা রয়েছে তার মাত্র ২০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়। 

বাকি সব সার আমদানি করতে হয়। যার প্রায় পুরোটাই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।

“গ্যাস সংকটের কারণে গত বছর থেকেই সারের আমদানি নির্ভরতা বেড়েছে। এই বছরের প্রথম ৭ মাসে ২.৮ বিলিয়ন ডলারের মতো সার আমদানিতে ব্যয় করেছি। যেটা ২০২৪-২৫ এর পুরো অর্থ বছরের চেয়ে বেশি,” বলেছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

এদিকে কৃষির জন্য সেচের প্রয়োজন কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটে যেভাবে বাংলাদেশে বাড়ছে জ্বালানি সংকট তাতে সমস্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাহিদ হোসেনের ভাষায়, “বোরো আমাদের সবচেয়ে বড় রাইস ক্রপ। এটাতে যদি কোনোরকম ধাক্কা আসে, এই ফার্টিলাইজার ও ডিজেলের অভাবে, তাহলে খাদ্য নিরাপত্তা রাইস সিকিউরিটি ইউল বি অ্যাড্রেস। যেটা দেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।”

সার নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকারও। এ নিয়ে সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সংসদে বলেছেন, “বাংলাদেশ মূলত এ দুই দেশ থেকে ইউরিয়া সার আমদানি করে ও আলোচনাগুলো ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এরই মধ্যে একজন প্রতিনিধি (উপদেষ্টা) কাতারে পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করছি সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে বড় কোনো সমস্যা হবে না।”

এখন বোরো মৌসুম। এ সময় সবচেয়ে বেশি সার প্রয়োজন হয়। আবার সেচের চাহিদাও প্রচুর। যেখানে ডিজেল ও বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে। 

“গরম শুরু হয়ে গেছে। মধ্য এপ্রিল থেকে সেচের জন্য জ্বালানি চাহিদাও বাড়বে। তার মানে সংকট তীব্র হতে যাচ্ছে,” আলাপ-কে বলেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।

বীজ ও সার ছাড়া কীটনাশকেরও ৯০ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে।

সবমিলে এপ্রিলের ইরি ও বোরো ধান চাষে প্রয়োজনীয় সেচের জন্য জ্বালানি, এরপর অন্যান্য খাদ্য শস্যের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও সার আমদানি করা না গেলে সংকট বাড়বে।

এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা কিছু করণীয় পরামর্শ দিয়েছেন- খাদ্য মজুত বাড়ানো, বিকল্প সরবরাহ উৎস খোঁজা, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো।

এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে সংকটের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।

মূল্যস্ফীতি বাড়বেই

বিশ্বে যখন বাড়ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি তখন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান বলছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদিও মার্চে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হওয়ার মানে হলো, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আপনার খাবার কিনতে যদি ১০০ টাকা খরচ হয়, পরের এক বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খাবার কিনতে লাগল ১০৯ টাকা ৩০ পয়সা। প্রতি ১০০ টাকায় খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ৩০ পয়সা। এর মানে, বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষের খাবার খরচ প্রায় এক-দশমাংশ বেড়েছে।

এর আগে গত বছরের জানুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ ছিল। এরপর খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে। একপর্যায়ে সাত অঙ্কের ঘরে নামে। পাঁচ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশ বেশি। এতে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ এত দীর্ঘ সময় ধরে ভোগান্তিতে পড়েননি আগে।

যা শিগগিরই কমছে না বরং বাড়বে বলেই জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

রবিবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, শুধু জ্বালানি সংকটতো না, সমস্ত কমোডিটি খাদ্যপণ্য সবকিছুতে প্রভাব পড়বে। টোটাল সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং আগামী দিনে দ্রব্যমূল্য বাড়বে- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।”

খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা সরাসরি খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে।

কারণ খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে কৃষিকাজে জ্বালানি ব্যবহার, সেচ ব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন সবকিছুতেই জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে।

এর সঙ্গে এই প্রতিটি জিনিসেই বাংলাদেশের রয়েছে আমদানি নির্ভরতা যার জন্য প্রয়োজন ডলার।

দেশের বাজারে এটা খুব বেশি না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বমুখী মার্কিন ডলারের দর

দেশে-বিদেশে বাড়ছে ডলারের দাম

জ্বালানির সঙ্গে বাংলাদেশে যখন খাদ্যপণ্য ও কৃষি সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানির চাহিদা বাড়ছে তখন চোখ রাঙাচ্ছে ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ৬ই এপ্রিল বাংলাদেশে ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা।

যুদ্ধের আগে ২৬এ ফেব্রুয়ারি যে রেট ছিল ১২২ টাকা ২৯ পয়সা। 

তার মানে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশে ডলারের দাম বেড়েছে ৪৬ পয়সা।

দেশের বাজারে এটা খুব বেশি না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বমুখী মার্কিন ডলারের দর।

ইনভেস্টিং ডট কমের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার ইনডেক্স বা ডিএএক্সওয়াই ৩০এ মার্চ পৌঁছেছে ১০০ দশমিক ৫১তে। যা ২৭এ ফেব্রুয়ারি ছিল ৯৭ দশমিক ৬১তে। 

তার মানে যুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

ডলারের ডিএএক্সওয়াই বা ইউএস ডলার ইনডেক্স হলো বিশ্বের প্রধান ৬টি মুদ্রার (ইউরো, ইয়েন, পাউন্ড, কানাডিয়ান ডলার, ক্রোনার ও ফ্রাঙ্ক) বিপরীতে মার্কিন ডলারের শক্তির একটি পরিমাপক বা সূচক।

আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েই চলেছে। যা কিনতে লাগছে অতিরিক্ত ডলার। তাই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারের চাহিদাও বেড়েছে।

শেষ এক বছরে কমেছে বাংলাদেশের সামগ্রিক এলসি ওপেনিং

এলসি নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, শেষ এক বছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক এলসি ওপেনিং কমেছে ২ দশমিক ০৮ শতাংশ।

গত বছরের এপ্রিল থেকে ২০২৬-এর মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে খোলা হয়েছে ৬৯ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারের এলসি।

অথচ এপ্রিল ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে দেশে এলসি ওপেনিং হয়েছিল ৭১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের।

এর মধ্যে শুধু ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির ক্ষেত্রে এলসি কমেছে ২ দশমিক ৫২ শতাংশ।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানালেন, এলসি ওপেনিংয়ে “বিশাল সমস্যায়” রয়েছেন তারা। 

তিনি উদাহরণ দিয়ে আলাপ-কে বলেন, “সুতা আমদানির জন্য আগের মাসে আমি এলসি ওপেন করতে চেয়েছিলাম। তখন আমাকে তারা দিতে পারেনি। এরপর গত সপ্তাহে সুতার দাম বেড়ে গেল ৪০ সেন্ট। তার মানে এখন আমাকে ৩০০ টন সুতার জন্য অতিরিক্ত এই অর্থ খরচ করতে হবে।” 

তবে এই সমস্যা নতুন না হলেও গত এক মাসে এই সমস্যা বেড়েছে বলেই মন্তব্য তার।

তার ভাষায়, “ডলারের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের লিমিট কমে যায়। যখন ৮৩ টাকা ডলার ছিল তখন আমার লিমিট ছিল ৬০ লাখ ডলার। যখন ১২০ হলো তখন সেটা কমে দাঁড়াল ৪০ লাখ ডলারে। মানে ২০ লাখ ডলার নেই। এখন আবারও ডলারের দাম বাড়ছে তার মানে আমার এই লিমিট আবারও কমছে।”

 “ব্যাংকের কারণে আমার একটি পেমেন্ট ৩৩ দিন ডিলে হলো। এতে অর্ডার ক্যানসেল হওয়ার উপক্রম তখন আমি বাধ্য হয়ে এয়ার ফ্রেইটে মালামাল পাঠিয়েছে। আর এতে আমার তিন লাখ ৬০ হাজার ডলার কেটে রাখল। তার মানে অতিরিক্ত খরচ হলো ৪ কোটি টাকার বেশি,” বলেছেন মোহাম্মদ হাতেম।

এলসি ওপেনিংয়ের সমস্যার কারণে ব্যয় বৃদ্ধির কথা জানালেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) প্রচার বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদ কবির।

“এলসি নিয়ে এখন যে সংকট সেটা আসলে বৈশ্বিক অবস্থার কারণে হচ্ছে। কারণ যে অর্ডার আমি কনফার্ম করেছি সেটা সঠিক সময় সরবরাহ করতে পারছি না। এতে কস্টিং বাড়ছে,” আলাপ-কে জানিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিক ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠনটির এই নেতা।

এলসি খোলা নিয়ে আমদানিতে সমস্যা হওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে রপ্তানিতেও। 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি)পরিসংখ্যান বলছে, সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে ৩৪৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ।

যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কম। অর্থাৎ, আগের বছর এই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৪২৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের পণ্য।

সবমিলে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলছেন, “একটা সংকট শুরু হয়েছে সেটা গভীর ও ব্যাপক হতে পারে। কারণ ২০২০ থেকে প্রতি দুই বছর পর পর কোনো না কোনো সংকটের মধ্যে পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে।”