জ্বালানি সংকট: বিপদের মুখে বাংলাদেশ, বেশি ঝুঁকিতে কারা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ইরানের সাথে মার্কিন-ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে অনেক দেশে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর প্রভাবে দেউলিয়া হওয়ার পথে কোনো কোনো দেশ। 

কতটা বিপদে বাংলাদেশ

তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে বাংলাদেশের নাম। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, বাংলাদেশের জ্বালানি নির্ভরতা মধ্যম সারির হলেও জ্বালানি সঙ্কটের এই ধাক্কা সামলানোর শক্তি খুব কম।

এর অন্যতম কারণ রিজার্ভ সংকট। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন যে পর্যায়ে আছে, তা দিয়ে মাত্র তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ড অনুযায়ী এটি বেশ আশঙ্কাজনক।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তৈরি পোশাক শিল্প। এই কারখানাগুলো আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। অন্যদিকে পণ্যের দাম বাড়ালে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের চাহিদা কমবে। অর্থাৎ নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য উভয় সঙ্কট দেখা দেওয়ার শঙ্কা আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের গ্রস রিজার্ভ এখন ৩৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। তবে আইএমএফ-এর বিপিএম-সিক্স হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ ২৯ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার। 

আমদানি ব্যয় মেটাতে ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে হয় বাংলাদেশকে। রিজার্ভ একেবারে কমে গেলে কমবে টাকার মানও। এতে বিদেশ থেকে তেল-গ্যাস আমদানি হয়ে উঠবে আরো ব্যয়বহুল। সেক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে মূল্যস্ফীতি।

প্রতিবেশীদের হালচাল

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর অবস্থা আরও করুণ। ইরান যুদ্ধের কারণে খাঁদের কিনারায় এখন পাকিস্তান। তাদের আমদানিকৃত জ্বালানির ৯০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পাকিস্তানের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে।

দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণ এখন ৯১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের তথ্যমতে, ২০২৬-এর প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও, রিজার্ভ এখনো বিপজ্জনকভাবে কম।

দেউলিয়া দশা থেকে কেবল ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলো শ্রীলঙ্কা। পর্যটন খাতের কল্যাণে তাদের রিজার্ভ ৭ বিলিয়ন ডলার পারও হয়েছিলো।

তবে সাম্প্রতিক জ্বালানি সঙ্কট তাদের অর্থনীতির জন্য নতুন হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী হলে ভেঙে পড়তে পারে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি।

ইরান যুদ্ধের ধাক্কা লেগেছে নেপালেও। রান্নার গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে সেখানে। ইতোমধ্যেই গ্যাসের রেশনিং পদ্ধতিতে চলে গেছে তারা।

নেপালের ক্ষেত্রে সুখবর হলো তাদের রিজার্ভ। দেশটির রিজার্ভ এখন ২৩ বিলিয়ন ডলার। যা দিয়ে তারা দেড় বছরের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারবে। তবে যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা শ্রমিকরা দেশে ফিরে এলে ধ্বসে পড়বে নেপালের অর্থনীতি।

একই অঞ্চলে বাস করেও অনেকটাই নিরাপদ অবস্থানে আছে ভারত। সাত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো বিশাল ডলার রিজার্ভ আছে তাদের। একইসাথে তেলের জন্যেও মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর নয় দেশটি।

ভারতের তেল শোধনাগারগুলো রাশিয়ার তেল প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। তাই তাদের হাতে সবসময়ই বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির সুযোগ আছে। একইসাথে বিদ্যুতের জন্যও খুব বেশি বিদেশমুখী নয় ভারতের জ্বালানি খাত।

আমদানি করা গ্যাসের চেয়ে নিজস্ব কয়লার ব্যবহারই বেশি করে ভারত। এই বিষয়গুলো মধ্যপ্রাচ্যের এই টালমাটাল অবস্থাতেও ভারতকে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।

আসন্ন খাদ্য সংকট

জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু লাইট-ফ্যান কিংবা যানবাহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তায় আঘাত হানছে। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে নাইট্রোজেন সার তৈরি হয়। গ্যাসের দাম বাড়লে বাড়ে সারের দাম। এতে খাদ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ না হলে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।



দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে