যাত্রা পথে তেলের সঙ্গে শেষ হয়ে গেল একই পরিবারের তিনজনসহ পাঁচটি প্রাণ। শুক্রবার সন্ধ্যায় গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী বাসটি টাঙ্গাইলের কালিহাতীর ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে তেল শেষ হয়ে যায়।
চালক ও সহকারীরা তেল আনতে গেলে দীর্ঘ সময় বাসটি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। আর চৈত্রের ভ্যাপসা গরম থেকে বাঁচতে বাস থেকে বেরিয়ে মহাসড়কের পাশেই রেললাইনের ওপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন অনেক যাত্রী।
ঠিক সেই সময়ে ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জগামী ‘সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনটিতে কাটা পড়েন ঐ বাসের পাঁচজন যাত্রী। মুহূর্তেই ট্রেনের চাকায় পিষ্ট হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তাদের দেহ।
রাজধানীর বাইরে তেল সংকটের আরেকটি চিত্র দেখা গেল রংপুরের পীরগঞ্জে। সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, ইঞ্জিন চালিত ভ্যানের সঙ্গে রশি বেঁধে টেনে নেওয়া হচ্ছে একটি গাড়ি।
অসহায় চালক জানালেন, রাজারামপুর ইউনিয়ন থেকে পার্শ্ববর্তী একের পর এক পাম্প ঘুরতে গিয়ে ফুয়েল শেষ হয়ে গেছে। তাই এভাবেই এখন তেল বা গ্যাসের খোঁজ করছেন তিনি।
ঢাকার বাইরে আরও কয়েক এলাকায় দেখা যাচ্ছে মোটরসাইকেল চালকরা আর তাদের বাহন চালাতে পারছেন না। অনেকেই পেট্রোল-অকটেন নিতে পাম্পের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন বাইকের ফুয়েল ট্যাংক হাতে।
ঈদ পরবর্তী সময়ে ঢাকার বাইরে জ্বালানি তেলের এমন তীব্র সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজধানী অভিমুখী ফিরতি যাত্রায়।
দেশজুড়ে এমন চিত্র দেখা গেলেও বাসের ক্ষেত্রে জ্বালানি সংকট তীব্র নয় বলেই জানালেন, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক এএসএম আহাম্মেদ খোকন।
“লং রোডে বাসের ক্ষেত্রে, ডিজেলে সমস্যা নেই। তবে অকটেন-পেট্রোলে সমস্যা হচ্ছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
কমছে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল
জ্বালানি সমস্যায় কেবল বাস নয় এর সঙ্গে কমেছে ট্রাকের চলাচল। এতে ঢাকায় আগের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রাকের প্রবেশ কমেছে বলে জানালেন তেজগাঁও ট্রাক চালক মালিক সমিতির সভাপতি তালুকদার মো. মনির হোসেন।
“সাধারণত ট্রাক বা পিকআপে পণ্য পরিবহন হয়। ডিজেল সংকটে ঢাকায় পণ্যবাহী ট্রাক-পিকআপের প্রবেশ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে,” বলেছেন তিনি।
আলাপ-কে তিনি জানান, ঢাকার বাইরে প্রতিটি ট্রাক ১০ লিটার করে ডিজেল পাচ্ছে। এতে একটি ট্রাককে যাত্রা পথে তেল নেওয়ার জন্য চার থেকে পাঁবার দাঁড়াতে হচ্ছে।
“যে ট্রাকটি দিনে দিনে চলে আসার কথা, সেটি বার বার তেল নিতে গিয়ে অনেক দেরি করে ফেলছে। অনেক ট্রাকের আসতেই দুই থেকে তিন দিন লেগে যাচ্ছে।”
অতিরিক্ত সময়ের সঙ্গে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ বাড়ছে, আবার অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে পণ্য পচে যাওয়ার শঙ্কা।
মূল্যস্ফীতি ও বেকার সমস্যা
পরিবহন খাতে এমন সমস্যা আরও কিছু দিন চলতে থাকলে তা নিত্যপণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম।
“তেলের কারনে পরিবহন খরচ বাড়বে, আর খরচ বাড়লে দামও বাড়বে। সুতরাং তেলের দাম বাড়লে সেটা সরকার যদি ভর্তুকি না দেয় তার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়বে,” আলাপ-কে বলেছেন তামিম, যিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য।
এদিকে তেল সংকটে সড়কে বাস, ট্রাক, পিকআপ কমে যাওয়ায় পরিবহন শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন রংপুর ট্রাক মালিক সমিতির যুগ্ন আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান বাবু।
তিনি বলেন, “বাস, ট্রাক, পিকআপ সব মিলিয়ে আমাদের ৩০ হাজারের মতো শ্রমিক আছে। প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক গাড়ি চালাতে পারছে, বাকি ২০ হাজার শ্রমিকই প্রায় বেকার অবস্থায় আছে।”
রংপুর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, আশিক হোসেনে ভাষ্য, “ঈদের আগে দূরপাল্লার ৮০ শতাংশ গাড়ি চলছে কিন্তু ঈদের পর এখন ১০০ শতাংশ বন্ধ আমাদের।”
পাম্পে ট্যাগ অফিসার, ডিপোতে বিজিবি
সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার রেশনিং ছাড়াও বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকারের এমন উদ্যোগের ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মজুতের ভয়ংকর চিত্র বেরিয়ে আসে।
শনিবার পেট্রোল পাম্পে 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। আর বুধবার থেকে তেলের ডিপোগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগ করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর ছাড়া অন্যান্য জেলা ও বিভাগীয় শহরের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে 'ট্যাগ অফিসার' হিসেবে নিয়োগ দেবে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে জ্বালানি তেল মজুত প্রতিরোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে দেশের ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে শনিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
এছাড়া তেল পাচার রোধে সীমান্তে অতিরিক্ত টহলসহ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানিয়েছে বিজিবি।
এত কিছুর পরও জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং ঈদ যাত্রা নিয়ে বিএনপিকে বিরোধীদের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করেন সিনিয়র সাংবাদিক আশরাফ কায়সার।
“এবার ফিরে আসা এবং যাওয়াটা কোনোটাই খুব একটা সুখের হয়নি। বিরোধী দল এগুলোকে নিয়ে ইস্যু করতে পারে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।