যুদ্ধ রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে, যার চাপ আছড়ে পড়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সেই চাপ সামলাতে বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছিল তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে যা স্থগিত হয়ে গেছে।
এবার যুদ্ধ হচ্ছে ইরান-ইসরাইলের মধ্যে। আর তাতে ক্রমেই আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশের এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও ডিজেল আমদানি এবং সরবরাহ। আর তাতে প্রতিদিন ঘনীভূত হচ্ছে জ্বালানি সংকট।
অতিরিক্ত দামে আমদানিতে ফের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ডলারের বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
আর তাতে আবারও সেই আইএমএফেরই দ্বারস্থ হতে হচ্ছে তারেক রহমান সরকারকে।
জ্বালানি ব্যয়ে ক্ষতি কত?
সাধারণত যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে। আর সেটা কমাতে ঋণ নিতে হয় সরকারকে।
শুধু জ্বালানি খাতেই বাংলাদেশ সরকারের ২০২৫ সালের তুলনায় অন্তত ৪০ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ)।
তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি ব্যয় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ৪৮০ কোটি ডলার বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জেডসিএ বলছে, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার বর্ধিত এই দাম যদি এক বছর স্থায়ী হয়, তবে তা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি’র ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।
দ্বিগুণ দামে আসছে তেল-গ্যাস
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য বলছে, তেল-গ্যাস আমদানিতে ইতোমধ্যেই নতুন সরকারের খরচ দ্বিগুণ হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইতোমধ্যে সাতটি জাহাজভর্তি ডিজেল ও এক জাহাজ ফার্নেস অয়েল বাংলাদেশে এসেছে।
এর মধ্যে অন্তত ছয়টি জাহাজে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
তথ্য বলছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যাটসের সূচক অনুসরণ করে, ১৪ ও ১৬ই মার্চ দুই জাহাজ ডিজেল কেনা হয়েছে। যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৬৩ কোটি টাকা করে অথচ খরচ হয়েছে ৪২৫ কোটি টাকা ও ৪৩১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ দুইটি ডিজেলবাহী জাহাজেই অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে গ্যাস সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে দুটি এলএনজি কিনতে হয়েছে বাংলাদেশ সরকারকে।
যেখানে দ্বিগুণ অর্থ খরচ হয়েছে বলে আলাপকে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান।
“জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দুটি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে। একটি কার্গো প্রায় দ্বিগুণ দামে এবং অন্যটি দ্বিগুণেরও বেশি দামে কিনতে হয়েছে,” বলেছেন তিনি।
“স্পট মার্কেট থেকে কেনা দুটি কার্গোর জন্য গত মাসে যেখানে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল, সেখানে বর্তমানে একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।”
কতটা চাপ রিজার্ভে
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে।
আর জেডসিএ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী খরচ বাড়লে, বাংলাদেশ সরকারকে জ্বালানি আমদানিতে এই বছর ব্যয় করতে হবে প্রায় ১ হাজার ৭০০ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ হিসাব বলছে, বিপিএম ৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের রিজার্ভ রয়েছে ২ হাজার ৯৫২ কোটি ৮১ লাখ ডলার।
এতে প্রতি মাসে গড়ে ৬০০ কোটি ডলারের আমদানি ব্যয় ধরলে বাংলাদেশের আমদানির ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা রয়েছে ৪ দশমিক ৯ মাসের।
কিন্তু তেল গ্যাসে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় সেটা কমিয়ে আনবে ৪ দশমিক ১ মাসে।
বাধ্য হয়েই যাচ্ছে সরকার
জ্বালানির এই চাপ শুধু পাম্পের তেল সংকট নয় প্রভাব ফেলবে ডলারে, বাজেট এবং মূল্যস্ফীতিতে; জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
“রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যখন শুরু হয়েছিল তখন তার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল আমাদের অর্থনীতিতে। যা এখনও কাটেনি,” আলাপকে বলেছেন জাহিদ হোসেন।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আইএমএফের কাছে বাড়তি সহায়তা চাওয়া হচ্ছে কি না এবং আগামী জুনের মধ্যে আগের কিস্তি ছাড় হচ্ছে কি না এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী মাসে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক হবে। সেখানে এসব নিয়ে আলোচনা হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, “এই প্রোগ্রাম তো বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। এটা আবার ফারদার রিভিউতে যাবে, সেটা অসুবিধা নাই। ইন দ্য মিনটাইম অর্থনীতির যে অবস্থা, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য যে প্রোগ্রামগুলো আছে, এই সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে, সেগুলো আমরা আলাপ করেছি।”
এদিকে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাক্ষাৎ শেষে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন জানিয়েছেন, অর্থায়ন-সংক্রান্ত আলোচনা সব সময়ই নীতিগত আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
শ্রীনিবাসন বলেন, “অর্থায়ন ও নীতিগত আলোচনা একসঙ্গেই এগিয়ে চলছে। কৌশলগত আলোচনা ও সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
পুরোনো কিস্তি আগে
নর্থ আটলানটিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা নেটোতে ইউক্রেনের যোগদানের সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ২০২২ সালের ২৪এ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে বড় ধরনের সামরিক আক্রমণ শুরু করেছিল রাশিয়া। যার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের জ্বালানি থেকে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সে সময় অতিরিক্ত দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে একদিকে কমেছিল ডলারের রিজার্ভ অন্যদিকে ডলারের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছিল মূল্যস্ফীতি। যা এখনো কমানো যায়নি।
এমনকি সংকট মোকাবেলায় তৎকালীন সরকারকে বড় অঙ্কের ঋণের জন্য দ্বারস্থ হতে হয়েছিল আইএমএফের। আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ৩০এ জানুয়ারি।
মাঝে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো তা পায়নি।
আইএমএফের কাছে নতুন করে ঋণ চাওয়ার আগে পুরোনো ঋণের কিস্তি ছাড় করতে হবে বলেই মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
“আগে ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি আইএমএফের কাছ থেকে ছাড় করতে হবে। এরপর নতুন করে ঋণ চাওয়ার বিষয়টি আসবে,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
আগের ঋণ চুক্তিতে আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার।
তবে শুধু আইএমএফ নয়, সাম্প্রতিক অবস্থা বিবেচনায় বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার কাছে অর্থের উৎস এখন থেকেই খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান।