আলাপ এক্সপ্লেইনার

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের ঝুঁকি কতটা?

ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক লড়াইয়ের দামামা যেভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট যদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে গড়ায় তার প্রথম ধাক্কা লাগবে জ্বালানির বাজারে। আর সেই ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের খুচরা বাজার থেকে শ্রমবাজার পর্যন্ত।

কারণ একদিকে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, আর সেটা পুষিয়ে নিতে বাড়বে পণ্যের দাম। অর্থাৎ এই চক্রটা শুরু হলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ অনিবার্য।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবাসীরা ফিরতে শুরু করলে রেমিট্যান্স সংকটের পাশাপাশি তীব্রতর হয়ে উঠতে পারে চলমান কর্মসংস্থান ঘাটতি। তার মানে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’।

সহজ করে বললে, জ্বালানির চাপে একদিকে নিত্যপণ্যের দাম যেমন বাড়বে তেমনি অব্যাহত থাকবে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ার ধারা। যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় স্ট্যাগফ্লেশন।

সব মিলে তাই বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর জ্বালানি, মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক শ্রমবাজার ও রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি এই তিন ফ্রন্টে ঝুঁকি বাড়বে বলেই সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করছেন এখনই যুদ্ধের প্রভাব দেখা না গেলেও যুদ্ধের সময় আর ব্যাপ্তি বাড়লে এবং এর ক্ষয়-ক্ষতি যত বাড়বে তার প্রভাবও তত বেশি হবে।

“যদি বড় আকারে যুদ্ধ হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে সাপ্লাই লাইনে ক্ষতি হবে। আর ক্ষতির পরিমাণ বাড়লে শুধু বাংলাদেশই নয় পুরো বিশ্বেই এর ইমপ্যাক্ট পড়বে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

এদিকে পুরো বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশও।

কারণ একদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি শঙ্কার পাশাপাশি ঘনীভূত হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্স তথা ডলার সংকটও।

এ নিয়ে ইতোমধ্যেই জরুরি বৈঠক করেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্ত্রণালয়।

জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের স্থাপনা, কূটনীতিক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ইরানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বাড়বে ঝুঁকি

বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ২০ শতাংশের বেশি পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং ২৩ শতাংশের বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এর করিডোর হরমুজ প্রণালি।

বাংলাদেশের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা আরও বেশি।

কারণ বাংলাদেশে অপরিশোধিত-পরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলএনজি এবং এলপিজি আমদানির বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য।

বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত থেকে জ্বালানি তেল কেনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

সেই সঙ্গে কাতার এবং ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ।যা আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে যার প্রধান নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত অবস্থান ইরানের হাতে। যেখানে এখন বাজছে যুদ্ধের দামামা।

যে কারণে ইরান ও হরমুজ প্রণালির ওপর যে কোনো ধরনের আঘাত বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির বলেই মনে করছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

“দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ চললে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের জ্বালানিতে প্রভাব পড়বে। কারণ আমাদের মোট জ্বালানি প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর। যা নিয়ে এক ধরনের ঝুঁকি ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

আমদানি নির্ভরতায় জ্বালানিতে সংকট কতটা?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের জন্য মোট ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল কেনার কথা রয়েছে বাংলাদেশের। যার ১৪ লাখ টনই আসবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) এবং সৌদি আরবের আরামকো থেকে।

অন্যদিকে জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে বিপিসি যে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টন পরিশোধিত তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারও একটা বড় অংশ আসবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে।

অন্যদিকে এলপিজি আমদানি মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর না হলেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এবং ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। যেখানে শুধু কাতার থেকেই প্রতি বছর আমদানিকৃত এলএনজি’র প্রায় ৪০ শতাংশ আসে।

আর এই সব দেশ থেকে আসা সব ধরনের জ্বালানির প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি।

সুতরাং হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ভিন্ন পথে জ্বালানি আমদানি করতে হলে খরচ বাড়বে নিঃসন্দেহে।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির চিত্র

জ্বালানির অশনি সংকেত মূল্যস্ফীতি ও শিল্পখাতে 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন জ্বালানি সংকট তৈরি হলে এর প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাতে। কারণ গ্যাসের উপর নির্ভর করে টেক্সটাইলের বিভিন্ন প্রক্রিয়া যেমন ডাইং, স্পিনিং, ফিনিশিং সহ প্রায় সব উৎপাদন প্রক্রিয়া।

 “জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে প্রভাব পড়লে এর প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, খরচ বাড়লে দামও বাড়বে। সুতরাং তেলের দাম বাড়লে সেটা সরকার যদি ভর্তুকি না দেয় তার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়বে।”

গ্যাস নির্ভর খাতগুলোতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এছাড়া দেশের ১৫২টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি গ্যাসভিত্তিক। আর এখানেও আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে বলে জানান তিনি।

“যে সব জায়গায় গ্যাস ব্যবহৃত হয়; সেটা হোক পরিবহন, বিদ্য বা পোশাক শিল্প সে সব জায়গায় প্রভাব পড়বে। আর উৎপাদন খরচ বাড়লে এর প্রভাব শ্রমবাজারেও পড়বে,” আলাপকে বলেছেন ম. তামিম।

রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজার

ইরানে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ থাকলেও ইরানে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই দেশটির স্বাস্থ্যখাতে কাজ করে।

যে সংখ্যা খুব বেশি না হলেও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ে।

কারণ বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবাসীর বসবাস মধ্যপ্রাচ্যে।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দশ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গেছেন; যার ৮৯ শতাংশই সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে তাতে যদি প্রবাসীরা দেশে ফিরতে শুরু করেন তাহলে একদিকে যেমন প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, অন্যদিকে এটা দেশের শ্রমশক্তি বাজারেও তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন ইমতিয়াজ আহমেদ।

এজন্য বাংলাদেশকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শই দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

নয়তো সংকট তীব্র হলে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা।