বন্দরে জট-ধর্মঘটের কারণে রমজানে পণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা

ভোটের পরপরই রমজান। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১৮ বা ১৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে পারে রমজান মাস। ঠিক এমন সময়ে, প্রায় দেড় সপ্তাহ ধরে অচলাবস্থার মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বন্দর।

বিভিন্ন মেয়াদে চলা আন্দোলনটি রমজানের আগে আরেক দফা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের এই আন্দোলনে তৈরি হওয়া চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জট ও সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তারা।

রমজানের বাজারে প্রভাব

চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, খেজুরর মতো পণ্যগুলো বাজারে সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে তা বাজারে বড় প্রভাব ফেলবে বলে জানান, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন।

তিনি আলাপকে বলেন, “রোজার পণ্যের সরবরাহ চেইনে কোনো বাধা তৈরি হলে বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর।”

এই আন্দোলনের প্রভাবে পণ্যের দাম বেড়ে গেলে তার চাপটা সাধারণ মানুষকে পোহাতে হবে বলেই মনে করছেন তিনি।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আলাপকে বলেন, “বন্দরের সংকটে আমদানি করা পণ্য খালাস ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য খালাস বিঘ্নিত হলে বাজারে দাম বাড়বে। যেহেতু রোজার আগের দু-একদিন চাহিদা ও বেচাকেনা বেশি থাকে। তখন সরবরাহ কম হলে দাম দ্রুত বেড়ে যাবে।”

এদিকে বন্দর চালু হলেও খাতুনগঞ্জের বেচাকেনা জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব পড়বে বলেই মনে করছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

তার ভাষ্য, “খাতুনগঞ্জে কাজ করা শ্রমিকদের বেশিরভাগ ভোলা, বরিশাল, বাগেরহাট অঞ্চলের। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে শ্রমিকরা নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা কমছে।”

কনটেইনার জট

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন ইয়ার্ডে পড়ে ছিল মোট ৪১ হাজার ৮৭টি টিইইউস কনটেইনার, যা বন্দরের মোট ধারণক্ষমতার প্রায় ৬৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

একটি ২০ ফুট লম্বা, ৮ ফুট চওড়া এবং ৮ ফুট উঁচু কন্টেইনারকে ১ টিইইউ ধরা হয়। যা পণ্যবাহী জাহাজ এবং টার্মিনালের কন্টেইনার ধারণক্ষমতা মাপার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বন্দরে বর্তমানে ৩১ হাজার ১৩৩টি টিইইউস পূর্ণ কনটেইনার (এফসিএল) রয়েছে। 

পাশাপাশি ডিপোতে আছে আরও ১ হাজার ৯৩৭ টিইইউস, আর এলসিএল কনটেইনারের সংখ্যা ১ হাজার ১৭২ টিইইউস। 

বন্দরের বাইরে বা ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) রয়েছে ১ হাজার ৬৩০ টিইইউস। অন্যদিকে ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে জমেছে ১৩৫ টিইইউস। 

এছাড়া বন্দরের ইয়ার্ডে পড়ে আছে আরও ৩ হাজার ৪৫৪ টিইইউস খালি কনটেইনার এবং ১ হাজার ৬২৬ টিইইউস রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই হিসাবের বাইরে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পরিমাণ কত জানতে চাইলে হাসিনা আরজু, ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার (প্রশাসন), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আলাপকে বলেন, “বন্দর বন্ধ থাকার প্রভাব তো পড়বেই। তবে এর পরিমাণ কত তার কোনো হিসাব চূড়ান্ত হয়নি।” 

তবে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে ইতোমধ্যেই একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

কীসের আন্দোলন, কেন স্থগিত?

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে কর্মবিরতি পালন করে আসছিল চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। 

৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের লাগাতার কর্মসূচির ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যসহ বন্দরের প্রায় সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পর রবিবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে হচ্ছে না।

এরপর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নেতাদের সঙ্গে সন্তোষজনক আলোচনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর আলাপকে বলেন, “এনসিটিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার কাজ এই সরকারের সময়ে হবে না। সবকিছু বিবেচনা করে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।”

সোমবার সকাল ৮টা থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তবে তিনিসহ আরও ১৫জন কর্মচারীকে হয়রানিমূলক বদলি, ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলাসহ যে ধরনের হয়রানি করা হচ্ছে ১৪ই ফেব্রুযারির মধ্যে তা বন্ধ না হলে ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে আবারও বন্দর অচল করে দেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেশের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল, যা বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে। 

ফলে এই টার্মিনালে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তার প্রতিফলন পড়ে সারাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থায়।

সব কিছু মিলে তাই রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।