সোনার দাম বাড়ছে হু হু করে। বাড়তে থাকা সোনার দাম আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। দেশের বাজারে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেট এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন দাম বাড়বে আরও।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিট থেকে নতুন এই দর কার্যকর হবে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিপাকে, তখনই বিনিয়োগকারীদের ভরসা হয়ে ওঠে সোনা। সেই চেনা চিত্রই আবারও দেখা যাচ্ছে বিশ্ববাজারে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিলো ২ লাখ ২২ হাজার ৭২৪ টাকা। জানুয়ারির শেষে দাম বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা। এক মাসের মধ্যে দাম বেড়েছে ৬৩ হাজার ২৭৭ টাকা।
জুয়েলার্স সমিতি দাবি করছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার (পাকা সোনা) দাম বাড়ার প্রেক্ষিতে এই দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে মূল কারণ হচ্ছে, বিশ্ববাজারে সোনার মূল্যবৃদ্ধি।
বাজুসের সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, “আমাদের দেশে কোনো গোল্ড উৎপাদন হয় না, কোনো খনি নেই। গোল্ড আমাদের ইমপোর্ট করে আনতে হয়। ওয়ার্ল্ডওয়াইড এটা একটা বিকল্প কারেন্সি। এই বিকল্প কারেন্সি বা মেটাল যখন ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইউজ হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক মজুত করছে। ডলারটা পড়ে যাচ্ছে, আর বিশ্ব বাজারে গোল্ডটা সমাদৃত হচ্ছে। অনেক দেশে ডলারকে পেছনে ফেলে গোল্ডকে সমৃদ্ধ করছে। যার কারণে ইন্টারন্যাশনালি এটার দাম বাড়ছে। সেই বাজারটাকে বাজুস শুধু সমন্বয় করে।”
তিনি আরও বলেন, “গোল্ড প্রাইস ১০০ ডলার আজকেও বেড়ে গেছে। এই মেটালকে যদি আমরা ইমপোর্ট করে আনি আর বাংলাদেশ এবং অন্যান্য বাজারের সাথে সমন্বয় না রাখি তাহলে তো স্মাগলিং হয়ে যাবে। দেখা যাবে বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিয়া চলে যাবে, এইখানে দাম বেশি হলে ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশে চলে আসতে পারে। এই সমস্ত কিছুর ওপরে প্রাইসটা অ্যাডজাস্ট করা হয়।”
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি কেবল বাজারের স্বাভাবিক ওঠানামা নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নীতিগত অস্থিরতার সম্মিলিত প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে বিশ্ববাণিজ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে সোনার দাম শিগ্গিরই আউন্সপ্রতি ৭ হাজার ডলারে উঠে যাবে।
কেন বাড়ছে সোনার দাম
সোনা বরাবরই ‘সেইফ হেভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্যযুদ্ধ কিংবা বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিলেই বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ছেড়ে সোনার দিকে ঝোঁকেন।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতির উত্তাপ সেই অনিশ্চয়তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই উত্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নেটো মিত্রদের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের হুমকি, গ্রিনল্যান্ড দখলের ইঙ্গিত, ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান, ইরানকে ঘিরে কঠোর অবস্থান সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত দোলাচল বিশ্ববাজারে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
এর সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া ও কানাডার মতো ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি যুক্ত হয়ে নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা উসকে দিচ্ছে।
ম্যারেক্স-এর বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেয়ার বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং মার্কিনকেন্দ্রিক মডেলের পরিবর্তে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা আঞ্চলিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ার লক্ষণ যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তা বিনিয়োগকারীদের সোনায় বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত করছে।"
ফেড নিয়ে উদ্বেগ, ডলার নিয়ে শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরুর খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যখন একটি দেশের মুদ্রানীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলছে, “ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দাম বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আর যখন এমনটা হয়, তখন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা টলে যায়।”
সুদহার, ডলার ও মূল্যস্ফীতি
সোনার দামের পেছনে অর্থনৈতিক কারণও বড় ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার কমার প্রত্যাশা, ডলারের তুলনামূলক দুর্বলতা, প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি; এসব কারণে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সোনা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সুদহার কম থাকলে সোনায় বিনিয়োগের সুযোগ ব্যয় কমে যায়, ফলে চাহিদা বাড়ে।
এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ব্যাপক হারে সোনা কিনছে। ডলার নির্ভরতা কমাতে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রবণতা সোনার দামে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।
২০২৫ সালে সোনার দাম বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা। যা ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে, উদীয়মান বাজারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রিজার্ভ হিসেবে সোনা কেনা অব্যাহত রাখায় মাসে গড়ে ৬০ মেট্রিক টন সোনা কেনা হতে পারে।
২০২৫ সালের শেষে পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা মজুত দাঁড়ায় ৫৫০ টন, যা ৭০০ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক টানা ১৪ মাস ধরে সোনা কেনা অব্যাহত রেখেছে।
বাজারের গতি ও মনস্তত্ত্ব
সোনার দাম যখন ৫ হাজার ডলারের মতো মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করে, তখন নতুন বিনিয়োগকারীরাও বাজারে ঢোকেন। এতে দাম আরও দ্রুত বাড়ে। ফিউচার্স ও ইটিএফ বাজারে লেনদেন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এই প্রবণতাকে আরও জোরদার করছে।
সামনে কী হতে পারে?
গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে ব্যাংক অব আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু ব্যাংক মনে করছে, অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে দাম ৬ হাজার ডলারও ছাড়াতে পারে।
লন্ডন বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন-এর বার্ষিক মূল্যবান ধাতু (প্রেশাস মেটাল) পূর্বাভাস জরিপ অনুযায়ী, বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে ২০২৬ সালে সোনার দাম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং গড় মূল্য ৪ হাজার ৭৪২ ডলার হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সোনার এই মূল্যবৃদ্ধি কোনো একক ঘটনার ফল নয়। বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, নীতিগত অস্থিরতা ও বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব, সবকিছু মিলেই সোনাকে আবারও বিশ্ববাজারের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছে।