জ্বালানি তেলের দাম কমিয়েছে সরকার। বছরের প্রথম দিনে লিটার প্রতি দুই টাকা দাম কমানো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পুরো বছরজুড়ে তেলের যে দরপতন, তার কোনো প্রভাবই দেখা যায়নি ২০২৫ সালে।
এর আগে বছরের শেষ বুধবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা কমেছে। বছরজুড়ে টানা দরপতন, ২০২০ সালের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম নামিয়ে এনেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
এদিকে ১লা জানুয়ারির এই সমন্বয়ের পরও বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম বেশি।
রয়টার্স এর প্রতিবেদন বলছে, ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচারস (তেলের একটি ভবিষ্যত চুক্তি) অনুযায়ী বিশ্ববাজারে ২০২৫ সালে প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে তেলের দাম।
এটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা তিন বছর বার্ষিক দরপতনের ঘটনা।
বুধবার (৩১ডিসেম্বর) ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০.৮৫ ডলার।
অন্যদিকে বিদায়ি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট-এর (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে রেকর্ড প্রায় ২০ শতাংশ।
অথচ বাংলাদেশে ২০২৫ সাল শেষে পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশে তেলের দাম কমেনি ১ টাকাও।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ছিল ১০৪ টাকা। যা ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে বেড়ে ১০৫ টাকা হয়।
বছরের শেষ দিন ৩১এ ডিসেম্বরও বাংলাদেশের বাজারে ডিজেলের দাম ছিল ১০৪ টাকা। যা ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারিতে ২টাকা কমে ১০২ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম কমেছে ১৯ থেকে ২০ শতাংশ তখন দেশের বাজারে এর কোনো সুবিধাই পায়নি ভোক্তা।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে সরকারের মুনাফা করার দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে বিপিসির অদ্ভুত হিসাব।
আলাপকে তিনি বলেন, “ফান্ড বাড়লেও এর কোনো সমন্বয় হয় না। আমরা বার বার বলেছি কিন্তু সরকার শোনে না। অথচ সারা দুনিয়ার নিয়ম হলো সরকার সেবা দেবে, মুনাফা করবে না। কিন্তু শুল্ক–করের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব নিয়েও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে না সরকার। বিনিয়োগের নামে বাড়তি মুনাফা করছে বিপিসি।”
দেশের বাজারের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের এই পার্থক্যের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, “বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে বা অনেক কমলে সরকার ২ টাকা করে দাম বাড়ায় আবার ২টাকা কমায়। এতে কোনো প্রভাব পড়ে না। তা ছাড়া বিশ্ববাজারে যখন দাম কমে তখন সেটা বিবেচনায় নেয়া হয় না। কিন্তু বাড়লে সেটা খুব দ্রুত আমলে নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়।”
এক দশক আগেই বিপিসির আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার দাবি তোলা হলেও তা কার্যকর হয়নি বলেও জানান তিনি।
এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি বলেন, “বাজারদরের কথা বললেও তা এড়িয়ে সুবিধামতো মূল্য নির্ধারণের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়ের সূত্র তৈরি করা হয়েছে। সূত্রে ৯টি জায়গায় দুর্বলতা জানানোর পর বর্তমান সরকার দুটি সংশোধন করেছে। তাই বিশ্ববাজারে দাম কমলেও ভোক্তা বাড়তি দামে কিনছে, আর বিপিসি মুনাফা করছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি বলেন, “তেল পাচারের যুক্তি হাস্যকর। সীমান্তের অজুহাতে দেশের ভোক্তাকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই।”