শেলটেকের বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান হবে একটি শহরের সমান

চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এমন একটি শহরের নাম বলতে যেখানে অন্তত ৫০ হাজার আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান আছে। জবাবে চ্যাটজিপিটি জানিয়েছে, বগুড়া, ময়মনসিংহ এবং যশোরের কথা। কুষ্টিয়া শহরে সব মিলিয়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের পরিমান দশ হাজারের বেশি নয়।

বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী শেলটেক গ্রুপ সম্প্রতি বড় ধরনের একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যেখানে ৪৫ হাজারের মতো মানুষের নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে শেলটেকের এই নতুন বিনিয়োগে আগামী চার বছরে বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, বগুড়া কিংবা যশোর শহরের সমান কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

শেলটেক গ্রুপের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিনিয়োগের আকার হতে যাচ্ছে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছর ধরেই এক ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির চড়া পারদ, ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট, উচ্চ সুদহার- সবমিলে ব্যবসা সম্প্রসারণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। তবে কিছুটা সুখবর মিলছে রাজনৈতিক পরিবেশের স্থিতিশীলতা ও রিজার্ভে।

কিন্তু চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকেই গেছে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উচ্চ মূল্য সংযোজন শিল্পে নতুন সুযোগ না হওয়া।

এমন অবস্থায় সবাই যখন অপেক্ষায় তখন কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, রিয়েল এস্টেট, উৎপাদন, টেক্সটাইল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি- এই পাঁচটি খাতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী শেলটেক গ্রুপের ১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি সুখবর।

এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে ৪৫ হাজার কর্মসংস্থানের ৪০ হাজারই হবেন প্রান্তিক কৃষক, যারা যুক্ত থাকবেন চুক্তিভিত্তিক কৃষি পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে। এই পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় সরাসরি কর্মসংস্থান হবে আরো দেড় হাজার জন মানুষের।

শেলটেক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা এবং দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করছে।”

বড় এই বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেন তানভীর আহমেদ।

“এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় শেলটেক গ্রুপের এই বিনিয়োগকে অর্থনীতি ও ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ‘পজেটিভ সিগন্যাল’ হিসাবে দেখছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

“রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতি হলেও এখনো বাংলাদেশের অর্থনীতি সুস্থির হয়নি। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ অবশ্যই পজেটিভ ইনিশিয়েটিভ। কারণ, বেশ কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায়ীরা নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। এ অবস্থায় শেলটেকের এমন বিনিয়োগ দেখে অন্যরা উৎসাহিত হবেন। যেটা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই ভালো হবে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

এক নজরে শেলটেকের পরিকল্পনা।

কেন অপেক্ষা, স্থবির ব্যবসা

বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কয়েক বছর ধরেই প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। এর পেছনে বেশ কিছু কারণের কথা বলেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক।

“অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশ এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাছাড়া নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যয় বেড়েছে। ঋণের সুদহার আগের তুলনায় অনেক বেশি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দেশের ভেতরে মূলস্ফীতির চাপ এবং বিশ্বের কয়েকটি ফ্রন্টে যুদ্ধ চলছে। এরফলে আন্তর্জাতিক বাজারও স্লো হয়ে গেছে। সবমিলে নতুন বিনিয়োগ আসছে না। যার ফলে সেভাবে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

রবিবার বেসরকারি ঋণের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিনের স্থবিরতার পরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এখনও দুর্বল। 
গত মে শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা আগের মাসের ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে সামান্য বেশি। গত মার্চে প্রবৃদ্ধি নেমেছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা ছিল এ পর্যন্ত সর্বনিম্ন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পর্যালোচনায়ও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ।

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট আপডেটের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হলো- উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আহরণ এবং মন্থর বেসরকারি বিনিয়োগ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বেশিরভাগ শিল্পগোষ্ঠী নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসা ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে। ফলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা এখন আর নিয়মিত ঘটনা নয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতো বড় বিনিয়োগ ঘোষণা দিয়েছিলো দুটি ব্যবসায়ী গ্রুপ।

২০২২ সালে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করে। ওই বিনিয়োগের আওতায় গাজীপুরের মুক্তারপুরে ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, ডাল, লবণ, স্টার্চ ও ফিড উৎপাদনের জন্য একটি নতুন শিল্পপার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছিলো। একই সঙ্গে নরসিংদীতে প্রোটন ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন ও অ্যাকসেসরিজ উৎপাদন, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে গার্মেন্ট কারখানা এবং পোলট্রি, জুতা ও গ্লাসওয়্যার শিল্পে বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব প্রকল্পে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা জানায় গ্রুপটি।

আর ২০২৩ সালে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে কুমিল্লার তিতাসে প্রায় ৩,২০০ একরজুড়ে একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। প্রকল্পটির আওতায় পিভিসি, কেমিক্যাল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্প কাঁচামাল, লজিস্টিকস এবং অন্যান্য উৎপাদনশিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম বড় বিনিয়োগ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে ২০২৩ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে উচ্চ সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানের কারণে বড় আকারের নতুন শিল্প বিনিয়োগের ঘোষণা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্প শুরুর পরিবর্তে চলমান প্রকল্প সম্পন্ন করা এবং আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে শেলটেক গ্রুপের কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, রিয়েল এস্টেট, উৎপাদন, টেক্সটাইল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার বহুমুখী বিনিয়োগ পরিকল্পনা কেবল একটি করপোরেট সম্প্রসারণ নয়; বরং স্থবির বিনিয়োগ পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষায়, “তারা (শেলটেক) যে ঝুঁকি নিয়েছে, তারা যদি সাকসেসফুল হয়, তবে সেটা ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করবে। অন্যরাও আসবে।” 

কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, রিয়েল এস্টেট, উৎপাদন, টেক্সটাইল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি- এই পাঁচটি খাতে হবে বিনিয়োগ।

কেন ব্যতিক্রম শেলটেক?

১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু করা শেলটেক মূলত রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হলেও গত এক দশকে তারা ব্যবসার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

বর্তমানে রিয়েল এস্টেট, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, শিরিষ কাগজ, কৃষি, হসপিটালিটি, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, ডিজিটাল গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।

নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- একটি খাতে নয়, একাধিক খাতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি একইসঙ্গে কৃষি, শিল্প, রপ্তানি, আবাসন, উৎপাদন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করছে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটিকে “পোর্টফোলিও ডাইভার্সিফিকেশন” বলা হয়। কোনো একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল না থেকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমে।

শেলটেকের এ ধরনের বিনিয়োগে বড় কোম্পানির সুবিধা হিসাবেও দেখছেন অনেক ব্যবসায়ী।

প্লামি ফ্যাশনস-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক বলেন, “এক্সেস টু ফাইন্যান্স-এর সুবিধা শেলটেক-এর জন্য যতটা সহজ হয়েছে, সেটা অন্য প্রতিষ্ঠানের জন্য নাও হতে পারে। তবে তাদের এমন ঘোষণা নিঃসন্দেহে আরও ১০জন ব্যবসায়ীকে উৎসাহিত করবে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

সরকারের সহায়তার কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।

কৃষিতে বড় বিনিয়োগ

শেলটেকের ঘোষিত বিনিয়োগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প।

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে স্পেন-বাংলাদেশ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে ক্যানজাত ফল ও সবজি রপ্তানিও হচ্ছে।

বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির পরিমাণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম।

উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল ও সবজি উৎপাদিত হলেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুল পরিমাণ পণ্য নষ্ট হয়। ফলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রস্তুত-খাদ্য, ক্যানজাত ফল, হিমায়িত কৃষিপণ্য এবং ভ্যালু-অ্যাডেড ফুডের চাহিদা বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে অনেক অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের পরবর্তী রপ্তানি সম্ভাবনার অন্যতম খাত হিসেবে দেখছেন। যা এককভাবে পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর না থেকে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনবে।

শেলটেক জানিয়েছে, প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৪০ হাজার কৃষককে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। শুধু তাই নয়, পূর্ণ সক্ষমতায় প্রকল্পটি পরিচালিত হলে বছরে প্রায় ২ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার রপ্তানি আয়ের আশা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ঠরা মনে করছেন, এ ধরনের ব্যবসা পরিকল্পনার ফলে উভয় পক্ষের ঝুঁকি কমে আসবে- চুক্তিভিত্তিক কৃষিকাজের মাধ্যমে কৃষক আগাম বাজার নিশ্চিত করতে পারবে। অন্যদিকে নির্দিষ্ট মানের কাঁচামাল পাবে উদ্যোক্তারা।

তাছাড়া জয়েন্ট ভেঞ্চারের এ ধরনের বিনিয়োগ শুধু দেশের ভেতরেই নয়, দেশের বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছেও পজেটিভ ম্যাসেজ দেবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক।

শেলটেকের প্রকল্প যদি সফলভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে শুধু রপ্তানি আয়ই বাড়বে না; কৃষকের জন্যও নিশ্চিত বাজার তৈরি হতে পারে এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চুক্তিভিত্তিক কৃষিকাজের মাধ্যমে কৃষক আগাম ক্রেতা নিশ্চিত করবেন। প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করবে বীজ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও মান নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে উৎপাদনশীলতা ও আয়- দুটিই বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডে প্রায় ১৭৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ পরিকল্পনা।

রিয়েল এস্টেটে নতুন বাজি

কৃষির পাশাপাশি রিয়েল এস্টেটেও বড় বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঢাকার বনশ্রী এলাকায় ৫৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হবে ১৭ তলা শেলটেক লিগ্যাসি প্লাজা। প্রায় দুই লাখ বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস নিয়ে এটি আন্তর্জাতিক মানের লিড (এলইইডি) সনদপ্রাপ্ত গ্রিন বিল্ডিং হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া জলসিঁড়ি আবাসন এলাকায় যৌথ উদ্যোগে ২৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে ২১টি আবাসন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং ক্রেতাদের অপেক্ষার প্রবণতার কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে রিয়েল এস্টেট খাত।

এমন সময়ে নতুন প্রকল্পে বড় বিনিয়োগকে খাতটির প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

উৎপাদন ও টেক্সটাইলেও সম্প্রসারণ

উৎপাদন খাতে সিলেটে অবস্থিত গ্রাইন্ড টেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। গ্রাইন্ড টেক বাংলাদেশের একমাত্র শিরিষ কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সিলেটে শেলটেক গ্রুপের মালিকানাধীন এই কারখানাটি তৈরির আগে বাংলাদেশে শিরিষ কাগজ ছিল শতভাগ আমদানীমুখী।

গ্রাইন্ড টেকের এমন সক্ষমতা রয়েছে, যেখান থেকে বাংলাদেশের চাহিদা সম্পূর্ণ মিটিয়ে বিদেশেও শিরিষ কাগজ রপ্তানি করা যাবে। এমনকি পাশ্ববর্তী দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আমদানীকারকেরাও এখন তাদের আগ্রহ জানাচ্ছেন গ্রাইন্ড টেক-এর কাছে।

এর অর্থ হচ্ছে, শিরিষ কাগজ শিল্পে এই ৮৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে শেলটেক গ্রুপ একটি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর পণ্যকে রপ্তানিমুখী পণ্যে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে ব্লেন্ডেড সুতার উৎপাদন বাড়াতে এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড প্রায় ১৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে।

২০২৭ সালের মধ্যে এই সম্প্রসারণ শেষ হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ক্রমেই উচ্চ মূল্য সংযোজন পণ্যের দিকে এগোচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে উন্নত মানের সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক।

গ্রাইন্ড টেক লিমিটেডে ৮৫ কোটি টাকার বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নজর

কৃষি, আবাসন বা উৎপাদনের পাশাপাশি শেলটেকের নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনায় রয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিও। নিজেদের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ১০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুত স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশে শিল্পখাতে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপও রয়েছে। ফলে অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠী এখন নিজস্ব বিদ্যুত উৎপাদনের বিকল্প উৎস খুঁজছে।

সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ এখন শুধু পরিবেশগত দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতারও অংশ। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুত ব্যয় কমানো, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “গ্যাস, বিদ্যুত, জ্বালানিতে যে ধরনের সমস্যা রয়েছে তাতে অনেকেই বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছেন না। তবে এখানে কোনো কোম্পানি যদি নিজেদের বিদ্যুত আংশিক হলেও নিজেরাই উৎপাদন করতে পারে তাহলে সেটা ভালো হবে। আর সেটা যদি নবায়নযোগ্য বিদ্যুত হয় সেটা আরও ভালো।”

কর্মসংস্থান ও টার্নওভার

শেলটেক জানিয়েছে, তাদের নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৪৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজারই হবে চুক্তিভিত্তিক কৃষিকাজের মাধ্যমে। বাকি কর্মসংস্থান হবে কারখানা, বিপণন, পরিবহন, নির্মাণ, প্রশাসন, প্রকৌশল এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়।
এরমধ্যে শুধু কারখানাতেই সরাসরি প্রায় ১,৫০০ জনের কর্মসংস্থান হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি বড় শিল্প প্রকল্পের কর্মসংস্থান শুধু সরাসরি নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবহন, প্যাকেজিং, গুদামজাতকরণ, কৃষি উপকরণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় সেবাখাত।

সবমিলে নতুন এই বিনিয়োগের পর বড় ধরনের বার্ষিক টার্নওভারের প্রাক্কলন করেছে শেলটেক।

বর্তমানে শেলটেক গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

নতুন প্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে আশা করছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ।

অর্থাৎ আগামী চার বছরে শেলটেকের আয় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অর্থনীতির জন্য কী বার্তা?

শেলটেকের ১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার বিনিয়োগ একা বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি বদলে দেবে এমনটি বলার সুযোগ নেই, তবে সেটা বাংলাদেশের ব্যবসাখাতে এক ধরনের আস্থা তৈরি করবে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মনে করেন, একক কোনো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির গতিপথ বদলে দেয় না। কিন্তু এমন উদ্যোগ যদি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে এবং বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৈচিত্র্যে নতুন গতি আনতে সহায়ক হবে।
তবে সেজন্য সরকারের সহায়তার কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।

তার ভাষায়, “যে সব প্রতিষ্ঠান নিজেরা বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে চায় তাদের সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য যে ধরনের পলিসি সহযোগিতা দরকার সেটা প্রোভাইড করতে হবে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এতে অন্যদের কাছে একটা ভালো বার্তা যাবে। তারও উৎসাহিত হবে।”