একসময় কুরবানির ঈদে একটি মাঝারি গরু কিনতে যে টাকা লাগতো, এখন সেই টাকায় গরুর অগ্রিম বুকিংও সম্ভব নয়।
ঢাকার গাবতলী, পোস্তা কিংবা বিভাগীয় শহরের পশুর হাট, সব জায়গায় গত দুই দশকে কুরবানির পশুর দাম কয়েক গুণ বেড়েছে।
কিন্তু একই সময়ে সেই গরুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপজাত ‘চামড়ার দাম’ উল্টো কমেছে।
অর্থাৎ, যে গরু ২০ বছর আগে ৩০-৪০ হাজার টাকায় কেনা যেত, এখন তার দাম ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। অথচ সেই গরুর চামড়া, যা একসময় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রে ৫০০-৮০০ টাকায়ও বিক্রি হয় না।
অথচ একই সময়ে চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েক গুণ।
বাংলাদেশের কুরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে এই বৈপরীত্য এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেলিব্রেটি মাংস ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান জানালেন, ২০০৩ সালের তুলনায় সব কিছুর দাম কয়েকগুণ বাড়লেও চামড়ার দাম কমে গেছে কয়েকগুণ।
“২০০৩-২০০৪ সালে এক একটা চামড়া বিক্রি হয়েছে সাড়ে তিন হাজার, চার হাজার টাকায়। অথচ তখন জুতার দাম ছিল হয়তো ৩০০ টাকা। এখন সেই চামড়াটা বিক্রি হয় ৩০০ টাকায় কিন্তু জুতার দাম পাঁচ হাজার টাকা,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
প্রশ্ন উঠছে গরুর দাম বাড়ছে, বাড়ছে জুতার দামও তাহলে কাঁচা চামড়ার দাম কমছে কেন? বা জুতার দাম, গরুর দাম ঠিক করে না দিলেও চামড়ার দাম কেন ঠিক করে দিচ্ছে সরকার?
দাম কমার দীর্ঘ ইতিহাস
২০১৩ সালে সরকার-নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা।
কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে সেই দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে।
২০২৬ সালের কুরবানির ঈদে যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকায়।
যা আবার গত বছরের চেয়ে দুই টাকা বেশি।
এই হিসাবে এবার মাঝারি সাইজের একটি গরুর চামড়ার দাম কমবেশি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা।
কিন্তু কয়েক বছরের মতো এবারও ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি দামে চামড়া বিক্রি না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চামড়ার সবচেয়ে বাজে অবস্থা ছিল ২০১৯ সালে। সে বছর চামড়ার দাম না পেয়ে কুরবানির চামড়া ফেলে দেওয়া ও মাটিতে পুঁতে ফেলার মতো ঘটনাও দেখা গিয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বুঝতে পারে, স্থানীয় ট্যানারিগুলো পুরো বাজার সামলাতে পারছে না। তখন বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি এবং দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ২০২০ সালে সাময়িকভাবে ওয়েট ব্লু ও কাঁচা চামড়া রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
এরপর থেকে আবারও অল্প অল্প করে বাড়তে শুরু করে চামড়ার দাম।
ওয়েট ব্লু লেদার ইমপোর্ট বন্ধ হয়ে যাওয়াটাকে চামড়ার দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন মাংস ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান।
তাই এটা আবার শুরু করা গেলে চামড়ার দাম বাড়বে বলেও মনে করেন এই ব্যবসায়ী।
ওয়েট ব্লু রপ্তানি কেন বন্ধ?
পশুর চামড়া থেকে লোম ও ময়লা পরিষ্কার করে ক্রোমিয়াম লবণের সাহায্যে ট্যানিং বা প্রক্রিয়াজাত করার পর চামড়ার রঙ হালকা নীলচে হয়। এই অবস্থাকেই ওয়েট ব্লু বলে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, একসময় বাংলাদেশ থেকে ওয়েট ব্লু রপ্তানি হতো। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর সরকার এটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের ভেতরে পূর্ণাঙ্গ চামড়াশিল্প গড়ে তোলা।
মাঝে সাময়িকভাবে দেওয়া হলেও এখন এই চামড়া রপ্তানি বন্ধ আছে বলেই আলাপকে জানালেন চামড়া শিল্পখাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) জেষ্ঠ্য সহ-সভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ।
“আসলে এটা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিক্রি করলে দেশে জুতা, ব্যাগ, ফিনিশড লেদারসহ উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করা কঠিন হয়ে যাবে। কারণ তখন ভালো চামড়াটা বিক্রি হয়ে যায়। যেটা থাকে সেটার মান অতো ভালো থাকে না,” বলেন তিনি।
চামড়া শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসাবে তখন সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরাও।
চামড়ার দাম কমছে, বাড়ছে জুতার দাম
চামড়ার দাম কেন জুতার দামে প্রতিফলিত হয় না, এর পেছনে মধ্যসত্ত্বভোগী, ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, রপ্তানি বাজার হারানো, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা এবং চামড়া সংরক্ষণে দূর্বলতাকে প্রধান কারণ বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
“সরকার হয়তো ভালোর জন্যই চামড়ার দাম ঠিক করে দেয় কিন্তু এর ফাঁয়দা ব্যবসায়ীরা অন্যভাবে নিচ্ছেন। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের একটি প্রভাবও হয়তো আছে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
বাংলাদেশের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকারী ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আফতাব খানও বললেন একই কথা।
বাংলাদেশ থেকে চামড়া চীন ছাড়া আর কোথাও রপ্তানি করা যাচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, “এর ফলে গত কয়েক বছর চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না।“
চামড়ার দাম কম প্রসঙ্গে ট্যানারি মালিকরা জানাচ্ছেন, সচেতনতার অভাবের কথাও। তবে মূল সংকট হিসাবে তারা তুলে আনছেন ট্যানারি শিল্পের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের অভাবকে।
“আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ অর্জন করতে পারেনি। পাশাপাশি সাভারের ট্যানারিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পরিপূর্ণভাবে কার্যকর না হওয়ায় এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন,” বলেছেন আফতাব খান।
হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের পর চামড়াশিল্পকে একসময় সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দেশীয় কাঁচামালের সহজলভ্যতা, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা, সব মিলিয়ে এই খাতকে ঘিরে বড় স্বপ্ন ছিল।
বিশেষ করে কুরবানির ঈদে দেশে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হয়।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির হিসাবে, কোরবানির সময় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ পশু জবাই হয়। সারা বছর আরও প্রায় সমপরিমাণ পশু জবাই করা হয়।
এবারের ঈদেও অন্তত ১ কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানালেন চামড়া শিল্পখাতের ব্যবসায়ী নেতা সাখাওয়াত।
বছরে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও কেন শিল্পটি এগোতে পারছে না?
ট্যানারি মালিকেরা বলছেন, চামড়া শিল্পে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে রপ্তানি বাজার থেকে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের দিকে প্রক্রিয়াজাত চামড়া প্রতি বর্গফুট ২-৩ ডলারে রপ্তানি হতো। এখন সেই একই চামড়া চীনা ক্রেতাদের কাছে ৭০-৮০ সেন্টে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সালমা ট্যানারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ আলাপ-কে বলেন, “একসময় বায়াররা ট্যানারি অফিসে বসে থাকতেন চামড়া কেনার জন্য। এখন সেই পরিস্থিতি নেই।”
মূল সংকট পরিবেশগত ব্যর্থতা
চামড়াশিল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে উঠে এসেছে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্সের অভাব।
বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ পায়নি বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো।
এই সনদ ছাড়া ইউরোপের বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখায় না।
যদিও ২০০৩ সালে সাভারের হেমায়েতপুরে পরিবেশবান্ধব ট্যানারিপল্লি গড়ার প্রকল্প নেওয়া হয়। যার ফলে ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় সেখানে।
কিন্তু শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই স্থানান্তর করা হয়েছিল।
বর্তমানে সাভার ট্যানারিপল্লির সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের (সিইটিপি) সক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার পানি শোধনের। অথচ কুরবানির মৌসুমে ট্যানারিগুলোর প্রয়োজন হয় প্রায় ৩৫ হাজার কিউবিক মিটার পানি। এ ছাড়া কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এখনো কার্যকর ডাম্পিং ইয়ার্ড গড়ে ওঠেনি।
ফলে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে ইউরোপে রপ্তানি করা যাচ্ছে না বাংলাদেশের চামড়া।
কাঁচা চামড়া শুধু কুরবানির উপজাত নয়; এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সম্পদ বলছেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু সেই সম্পদ এখন অনেকের কাছেই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বাংলাদেশ, যে দেশ একসময় চামড়াশিল্পকে দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানি খাত হিসেবে দেখার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই দেশই এখন আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে লড়ছে।
যার ফলে মূল্যস্ফীতির রেকর্ডের মাঝেও কুরবানির চামড়ার দর ছুটছে উল্টো রথে।