কেন রাজনৈতিক নেতারা পশুর হাটের ইজারা নিতে আগ্রহী 

কুরবানির পশুর হাট শুরুর সপ্তাহখানেক আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি একটি নির্দেশনা জারি করে, যেখানে কোরবানির পশু বিক্রির জন্য কোন হাটে নেওয়া হচ্ছে, তা ব্যানারে লিখে ট্রাকের সামনে টানিয়ে রাখতে বলা হয়। 

বিক্রেতারা বিক্রির জন্য গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ নিতে পারেন যেকোনো হাটেই। কিন্তু কেন এই নির্দেশনা? 

এর কারণ হচ্ছে, গাড়িতে করে পশু পরিবহনের সময় বিভিন্ন হাটের ইজারাদাররা ‘পেশিশক্তি’ খাটিয়ে ওইসব গাড়ি ভর্তি পশু নিজেদের হাটে ভিড়িয়ে নেন। বিক্রেতারা চাইলেও তখন পছন্দের হাটে নিতে পারেন না। 

তবে পরিবহন মালিক সমিতির ওই নির্দেশনার পরও বন্ধ হয়নি জোর খাটানোর সংস্কৃতি। অনেক সময় ‘অস্ত্রের ভয়’ দেখিয়েও নিজেদের হাটে পশু ভিড়িয়ে নিচ্ছেনে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

“গরুগুলো রাস্তার মধ্যে বিভিন্ন পয়েন্টে জোর করে ধরে রেখে দিচ্ছে। অন্য হাটে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ব্যাপারীকে মারছে। অস্ত্রের ভয় দেখাচ্ছে। এরকম অনেক হচ্ছে,” আলাপ-কে বলেছেন ঢাকার দিয়াবাড়ি হাটের ইজারাদার শেখ ফরিদ হোসেন। 

বাংলাদেশের যতগুলো অস্থায়ী কুরবানির হাট বসেছে, সবচেয়ে বেশি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে দিয়াবাড়ি হাট। এই হাটের এবারকার ইজারাদার ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ। 

নিজে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ার পরও গরু ভাগিয়ে নেওয়া ঠেকাতে পারছেন না তিনি। 

কিন্তু জোর করে পশু নিজেদের বাজারে কেন নিয়ে যাচ্ছেন ইজারাদাররা? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে মোটা অংকের অর্থ। 

ঈদুল আযহা এলে বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর-সবখানেই তৈরি হয় এক ধরনের অর্থনৈতিক উন্মাদনা। আর এই উন্মাদনার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলো কুরবানির পশুর হাট।

বাইরে থেকে শুধু কয়েক দিনের জন্য পশু কেনাবেচার জায়গা মনে হলেও, বাস্তবতা হলো- বড় একটি হাট মানেই অস্থায়ী এক বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। 

এসব হাটে হয় হাতবদল হয় কোটি কোটি টাকা, দৃশ্যমান হয় রাজনৈতিক প্রভাবের দাপট এবং ক্ষমতার প্রদর্শনী।

হাটের ইজারা এতটাই আকর্ষণীয় যে, অনেক ধনী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা নিয়ে নেন ইজারা। এমনকি আল্ডারওয়ার্ল্ড ডনদের মধ্যে খুনোখুনিরও খবরও জানা যায়। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে হাটের ইজারা নিয়ে নেন এবং নিজেরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে লাভবান হন। 

হাজার হাজার কোটি টাকার পশু বিক্রির মহাযজ্ঞে কেন্দ্র হাটগুলো ইজারা নিতে হামলে পড়েন প্রভাবশালীরা। 

কেন পশুর হাটের ইজারা আকর্ষণীয়? 

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পশু কুরবানি দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। গরু কুরবানির তালিকায়ও বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে উপরের সারিতে। 

সরকারি হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৯১ লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়। এর মধ্যে গরু-মহিষের সংখ্যা ৪৭ লাখ ৫ হাজার এবং ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার। 

এবার দেশে আরও বেশি কুরবানি হবে বলে জানিয়েছেন মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। 

মে মাসের শুরুর দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, চলতি বছর কুরবানিযোগ্য গবাদিপশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। 

এসব পশু বিক্রির জন্য স্থায়ী হাটের পাশাপাশি অস্থায়ী হাট বসায় সরকার। এবারের ঈদে দেশজুড়ে হাটের সংখ্যা তিন হাজার ৬০০। 

আর দেশের সবচেয়ে বেশি কুরবানি হওয়া রাজধানী ঢাকাতে হাটের সংখ্যা ২৪টি। গাবতলীর স্থায়ী হাটসহ উত্তর সিটিতে ১২টি এবং দক্ষিণ সিটিতে ১১টি হাট রয়েছে। 

বিপুল সংখ্যক কুরবানির পশু বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশাল অংকের বাণিজ্য। 

বাংলাদেশের কুরবানির পশুর বাজার আসলে কত বড় তা নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হয়, পরিমাণটা ৭০ হাজার কোটি টাকা থেকে এক লাখ কোটি টাকা হতে পারে। 

আর এখানেই লুকিয়ে আছে হাট ইজারা নেওয়ার নেপথ্যের কারণ। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া এবং রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য হাট ইজারা বড় ক্ষেত্র বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 

স্থপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আলাপ-কে বলেন, “হাট নেওয়ার আগ্রহের পেছনে দুইটা কারণ থাকে। একটা হচ্ছে ফাইন্যান্সিয়াল। এইটা তাদের তাড়িত করে যে, হাট নিতে হবে।

“আরেকটা হচ্ছে, শক্তি প্রদর্শন। রাজনীতি করতে গেলে দেখাতে হবে যে, পাওয়ার আছে। দৃশ্যমানভাবে যদি হাট দখল থাকে, সেখানে অনেক মানুষকে জড়িত করা যাবে, দলীয় কর্মীদেরও। সব মিলিয়ে শক্তি প্রদর্শনেরও বিষয় থাকে।” 

পশুর হাটের সঙ্গে যেসব বিষয় জড়িত

একটি বড় কোরবানির পশুর হাটে কয়েক দিনে যে পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়, তা মাঝারি শিল্প কারখানাতে একমাসেও হয় না, বলে মত বিশ্লেষকদের। 

বড় হাটগুলোতে হাজার হাজার গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া এমনকি উটও বিক্রি হয়। প্রতিটি পশুর ওপর সরকার নির্ধারিত ৫ শতাংশ হারে খাজনা আদায় করা হয়। 

এছাড়াও হাটে রয়েছে নানা ধরনে ফি ও মাশুল। গাড়ি পার্কিং, দোকান ভাড়া, পরিচ্ছন্নতা ফি, লোডিং-আনলোডিং চার্জ, এমনকি কখনো কখনো অনানুষ্ঠানিক টাকাও ওঠানো হয়। 

আর এসব কারণেই হাট ইজারা নেওয়া মানেই হলো একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাওয়া। 

হাটে পশুর কেনাবেচার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নগদ অর্থের প্রবাহ। বাংলাদেশের অনেক ব্যবসা ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল হলেও কুরবানির হাটে ঘোরে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা সরাসরি হাতবদল হয়। 

নগদ অর্থের এই প্রবাহ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বেশিরভাগ সময়ই নগদ টাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ মানেই দ্রুত বিনিয়োগ, রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করা, কিংবা অন্য ব্যবসায় তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে হয়। 

আর বাংলাদেশের হাট ইজারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হলো রাজনৈতিক প্রভাব। বেশিরভাগ সময়ই এটা ক্ষমতার প্রতীকও। একটি বড় হাট নিয়ন্ত্রণ করতে কাজে লাগানো যায় শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে। অসংখ্য ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক, শ্রমিকসহ পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় নেতাদের ওপরও প্রভাব তৈরি করা যায়। 

এছাড়াও পশুখাদ্য বিক্রি, অস্থায়ী দোকান ও থাকার জায়গা তৈরি, পশু চিকিৎসা, বাঁশ, ত্রিপল, বিদ্যুৎ সংযোগসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ চলে আসে একই ছাতার নিচে। 

এসব কারণেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অনেকেই শুধু আর্থিক লাভের জন্য না, ক্ষমতার অবস্থান ধরে রাখার জন্যও হাট ইজারা নেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 

আর এটা করতে গিয়ে বেশিরভাগ সময়ই তৈরি করা হয় সিন্ডিকেট। 

হাট ইজারায় রাজনৈতিক প্রভাব 

বাংলাদেশের হাট ইজারার নেওয়ার রাজনৈতিক আধিপত্যের ধারা এবারও অব্যাহত রয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

যখন যে দল ক্ষমতায়, তখন সেই দলের নেতাকর্মীরা নিয়ন্ত্রণ করেন হাট বাজার। আর হাটের দখল নিতে গিয়ে সিন্ডিকেট করায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ। 

এবারও রাজনৈতিকভাবে ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে গেছে হাট। সিংহভাগের ইজারা নিয়ে নিয়েছে বিএনপি। 

রাজধানীর স্থায়ী হাট গাবতলীর ১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন পরিবহন ব্যবসায়ী মো. হানিফ, যিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। 

বাংলা সন ১৪৩৩ বছরের জন্য গাবতলী হাটে সরকার নির্ধারিত মূল্য ছিলো ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। তবে একজন ছাড়া আর কেউ দরপত্রে অংশ নেয়নি। স্বাভাবিকভাবেই মাত্র ১২ হাজার টাকা বেশি দিয়ে হাট পেয়ে যান হানিফ। অথচ এর আগের বছর ইজারা চূড়ান্ত হওয়ায় দর উঠেছিলো ১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। 

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী পাঁচ হাটেও ইজারায় খরা পড়েছে। ‘প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র’ ছাড়াই সেখানকার পাঁচটি হাট গত সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম দামে ইজারা দেওয়া হয়েছে। 

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জের পাঁচটি হাটেই গত বছরের তুলনায় কম দামে ইজারা দেওয়া হয়েছে। 

কিশোরগঞ্জের নিকলীতে গুপি রায়ের গোহাট গতবারের তুলনায় আড়াই কোটি টাকা কমে ইজারা দেওয়া হয়েছে সোয়া কোটি টাকায়। 

বেশিরভাগ হাটই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দর কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।  

দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর অস্থায়ী ২১টি মধ্যে ১৯টির ইজারা পেয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা। 

একটি হাটের ইজারা পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান। আরেকটি হাটের ইজারাদার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ী। 

স্থপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “(হাট ইজারায়) ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা শক্তিটা প্রদর্শন এবং ফিনান্সিয়াল গেইনটা করে। ব্যক্তিবিশেষের কথা বাদ দিলে বিরোধীদলীয়রা খুব বেশি সুবিধা করতে পারে না।

“আগে ৮০ শতাংশের মতো সরকারদলীয় লোকেরা ছিলো। এবার ৯০ শতাংশ বলা যায়।” 

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “ঢাকা শহরে যদি দেখেন। এখানে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক ভারসাম্য আছে। সরকারি ও বিরোধীদলীয় এমপিরা আছেন। কিন্তু এখানে সরকারদলীয় লোকেরাই এতো সংখ্যক ইজারা পাচ্ছেন। এটাতো প্রশ্নবিদ্ধ। কেন আমরা ৩০ শতাংশও নিরপেক্ষ দেখছি না?”  

তবে সব জায়গায় চিত্র একইরকম না। অস্থায়ী হাটের মধ্যে সবচেয়ে টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে দিয়াবাড়ি। 

ইজারা দিতে সরকার নির্ধারণ করে ৮ কোটি ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা। তিনজন দরদাতার মধ্যে সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ১৫ লাখে হাট ডেকে নেয় শেখ ফরিদের মালিকানাধীন এসএফ করপোরেশন। যদিও প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রায় সবাই সরকারদলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।  

গত বছর এই হাটের ইজারা মূল্য ছিল ১০ কোটি ১ লাখ টাকা, যা এবার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এবার এত টাকা কেন হাটের ইজারা নিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর এসএফ করপোরেশন মালিক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শেখ ফরিদ হোসেন বলেন, “আমরা আশা করছি, হাটটা অনেক ভালো হবে।

“অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অনেক ভালো হবে। গরু আসছে।”

শেখ ফরিদ বলেন, “এইটা ঐতিহ্যবাহী হাট। এই হাটে ওইরকমভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া লাগে না। ব্যাপারীরা সবাই জানে, এখানে গরু নিয়ে আসলে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয় না। এখানে আসলে স্বাচ্ছন্দ্যে গরু বিক্রি করা যায়। 

“যদি প্রত্যাশামতো গরু আসে, লাভ করার জন্যই নিয়েছিলাম। এখন যদি রাস্তাঘাটে যে রকম হেনস্তার শিকার হচ্ছি আমরা, সেরকমভাবে যদি অন্যান্য হাটে আমাদের হাটের গরুগুলো সরিয়ে নেয়, তাহলে এখানে লাভ করাটা কষ্টকর হয়ে যাবে। চালান তোলাটাই কষ্টকর হয়ে যাবে।” 

আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে স্থানীয় সরকার

রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কাছে ‘জিম্মি’ হয়ে যাওয়ায় ইজারা থেকে স্থানীয় সরকার বড় ধরনের আয় হারাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

প্রতিবছরই হাট থেকে মোটা অংকের আয় হয় ইজারাদারদের। মাত্র কয়েকদিনের অস্থায়ী হাট থেকে কতটা মুনাফা করে ইজারাদাররা তা ফুটে ওঠে ২০১৭ সালে ঘটনায়। 

ওই বছর রাজধানী ঢাকার ১৬টি অস্থায়ী কোরবানির হাট থেকে ১২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয় করে ইজারাদাররা। আর ইজারা দিয়ে হাট থেকে সিটি করপোরেশন রাজস্ব পায় ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকা। 

হাট ইজারার বিষয়টি ‘প্রতিযোগিতামূলক’ হয় না বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। 

স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে হাট ইজারায় ‘শৃঙ্খলা’ আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। 

আলাপ-কে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমাদের দেশে দেখা যায় যে, এগুলো কম্পিটিটিভ বিডিংয়ের মাধ্যমে হয় না। অনেক সময়ই স্থানীয় প্রভাবশালীরা কম দামে এটা নেওয়ার চেষ্টা করে এবং স্থানীয় সরকারগুলোকে এটা থেকে যেটা পাওয়ার কথা, অনেকসময়ই সেটা পায় না।

“কিন্তু সেটা যদি তারা পেতো, তাহলে আর্থিক সংকটের এই রকম পরিস্থিতিতে একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারতো।” 

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ভালো কম্পিটিশনের মাধ্যমে যদি ইজারা দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় সরকারগুলো ভালো আয় করতে পারে। কারণ, স্থানীয় সরকারগুলো অনেক উন্নয়নমূলক কাজটাজ করতে পারে না অর্থায়নের অভাবের কারণে। তাদের রিসোর্স মোবিলাইজেশন ক্যাপাসিটি খুবই সীমিত। দুই-একটা যেসব জায়গা থেকে পায়, ইজারা হলো তার মধ্যে একটা।” 

প্রভাব বিস্তার করে হাট ইজারা নেওয়ার সমালোচনা করেন স্থপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তার মতে, এই প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা প্রয়োজন। 

“আমরা যে কথাটা বলি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুযোগের সমতা থাকবে এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করবে না, সেটার প্রতিফলন নাই। অনেক হাটে দেখা যায় যে, ইজারা প্রক্রিয়ার আগেই কেউ না কেউ খুঁটি বসাচ্ছে। তার মানে সে কীভাবে বুঝলো সে ইজারা পাচ্ছে। তার মানে পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে স্বচ্ছতাম জবাবদিহিতার অভাব বিদ্যমান।” 

ইজারাদারদের খুশি করতে গিয়ে স্থানীয় সরকার রাজস্ব বলেও মনে করেন আদিল মুহাম্মদ খান। 

“হাটের ইজারা থেকে যে টাকা উঠছে এবং প্রকৃতপক্ষে হাটে যে টাকা অর্জিত হয়, এটার মধ্যে বড় গ্যাপ আছে।” 

এই স্থপতি মনে করেন, লোকবল নিয়োগ ও অস্থায়ী অবকাঠামোর নির্মাণের মতো যে কাজগুলো ইজাদাররা করেন, সেই এই কাজ স্থানীয় সরকারও করতে পারে। 

“কিন্তু সেটা না করে লক্ষ্যই হচ্ছে দলের লোককে সুবিধা দেওয়া। তাদের আয় বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া। মানে করপোরেশনের আয় বাড়ানোর আগ্রহ কম। আয় বাড়ানোর জন্য নিজে উদ্যোগী না হয়ে দলীয় লোকদেরকে দিয়ে দিচ্ছে।” 

হাট ইজারার ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে স্থানীয় সরকারকে ‘শৃঙ্খলা’ আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। 

“আমার মনে হয়, এখানে যদি আরেকটু ডিসিপ্লিন আনা হয় এবং নীতিমালাগুলো আরও শক্তভাবে করা হয় এবং সেই নীতিমালা ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে স্থানীয় সরকারগুলো এখান থেকে আরও বেশি অর্থ আদায় করতে পারবে।”

কুরবানির পশুর হাটে ইজারাদাররা যুক্ত হন শুধু কমিশনের জন্য নন, এর মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রণ করেন বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ‘ইকোসিস্টেম’। আবার ব্যবসা ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি প্রায় সময়ই এটা হয়ে ওঠে মর্যাদার বিষয়ও। 

বাংলাদেশের বাস্তবতায়, যেখানে ব্যবসা ও রাজনীতি প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, সেখানে একটি বড় হাটের ইজারা হয়ে ওঠে ক্ষমতা প্রদর্শন ও ব্যাবসায়িক লাভের এক মৌসুমি মঞ্চ।