মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে দামের ওঠানামা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বিতর্কিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি এই চারটি বাস্তবতার মাঝখানে ওয়াশিংটনে সই হলো বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি সহযোগিতার নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে (ডিওই) সই হওয়া এই চুক্তিকে সরকার ‘দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ’ বললেও বিশ্লেষকদের একাংশ এটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।
এদিকে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহযোগিতার জন্য শেভরন ও এক্সিলারেট এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।
ইউএস এম্বাসি ঢাকার ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে চলমান সহযোগিতা নিয়ে শেভরনের প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের লারোসার সঙ্গে এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী সক্ষমতা কাজে লাগানো নিয়ে এক্সিলারেট এনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভেন কোবোসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ক্রিস্টেনসেন।
চুক্তির আড়ালে ভূরাজনীতি
চুক্তিটি এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা চাপে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পর এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এমনকি সঠিক সময়ে জ্বালানি না পেয়ে দ্বিগুণ দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
এই বাস্তবতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইছে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র, দুই দেশই।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই এমন কথা জানিয়েছে মার্কেটস্ক্রিনার। তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপ গ্যাস কমানোর পরিকল্পনা করায় এশিয়ার বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করছে রাশিয়া।
এমনকি চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে ডিসকাউন্টে এলএনজি বিক্রি করছে রাশিয়া।
পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও এশিয়ায় নিজেদের এলএনজি বিক্রি বাড়াতে চাইছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের মতো দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো এখন মার্কিন কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের নতুন এমওইউ সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ বলেই মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন।
“রাশিয়া তো অনেকদিন ধরেই এলএনজি রপ্তানি করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। এটা কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মার্কেটে এখন নতুন প্লেয়ার,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখন দ্রুত বাড়তে থাকা এলএনজি বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীন-রাশিয়া ফ্যাক্টর কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে গত এক দশকে চীন ও রাশিয়ার বড় বিনিয়োগ এসেছে।
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে রাশিয়া, আর কয়লাভিত্তিক ও অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের বড় উপস্থিতি রয়েছে।
নতুন মার্কিন জ্বালানি সমঝোতাকে অনেক বিশ্লেষক এই প্রভাবের ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখছেন।
নিক্কি এশিয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ‘এলএনজি ডিপ্লোম্যাসি’ এখন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূরাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখন শুধু জ্বালানি বিক্রি করছে না, বরং এলএনজিকে ব্যবহার করছে কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়াকে চীন ও রাশিয়ার প্রভাববলয় থেকে দূরে রাখার একটি উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৫ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি
ফেব্রুয়ারিতে হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি) বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আলোচনা হয়েছে কি হয়নি তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলছে।
এখন নতুন জ্বালানি সমঝোতা সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। কারণ, জ্বালানি আমদানির প্রতিশ্রুতি বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর মার্কিন কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এর পেছনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হওয়া সেই রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড চুক্তির প্রতিশ্রুতি বড় ভূমিকা রেখেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় এলএনজি আমদানিকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কৌশলগত উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা কাজ করছে কি না, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।
কারণ বাণিজ্য চুক্তিতে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কিনতে হবে বাংলাদেশকে।
এর মানে হলো বাংলাদেশ ধাপে ধাপে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনবে, যাতে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমে এবং জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা থাকে।
তবে এই শর্ত না থাকলেও বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এলএনজি আমদানির ভালো উৎস বলে মনে করছেন ইজাজ হোসেন।
তার ভাষায়, “এলএনজি আমদানি নির্ভরতা যাতে এককভাবে কোনো জোন বা দেশকেন্দ্রিক না হয়, সেটা খেয়াল রাখা ভালো। এ ক্ষেত্রে অন্তত তিন থেকে চারটি জায়গা থেকে এলএনজি আমদানির চুক্তি করে রাখতে পারলে ভালো। তাতে কোথাও ঝামেলা হলেও সেটা সরবরাহের ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশের বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না।”
এ ক্ষেত্রে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা ও এর ফলে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কেনার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
তবে এখানে দামের বিষয়টি মাথায় রেখে চুক্তি করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
এদিকে চুক্তির সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কিছুই প্রকাশ করেনি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
আমদানি নির্ভরতা নাকি সক্ষমতা
জ্বালানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া এই প্রাথমিক চুক্তি একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ালেও তা আমদানিনির্ভরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাই বাংলাদেশকে নিজেদের নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র খোঁজার দিকে নজর বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন।
কারণ বাস্তবতা হলো, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র দ্রুত নিঃশেষ হচ্ছে। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনও প্রয়োজনীয় মাত্রায় পৌঁছায়নি। তাই শিল্প ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছেই।
ফলে এলএনজির বিকল্প আপাতত খুব সীমিত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ডলারভিত্তিক জ্বালানি চুক্তি ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবেই।
ওয়াশিংটনের এই সমঝোতা তাই শুধু একটি জ্বালানি চুক্তি নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কূটনীতি এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থানের দিকনির্দেশও অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই পথ কি শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা দেবে, নাকি ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও কূটনীতিকে আরও গভীরভাবে একটি নতুন নির্ভরতার ভেতরে আটকে ফেলবে?