বাংলার আকাশে উড়োজাহাজ রাজনীতি: ওয়াশিংটন বনাম ইউরোপ

একদিকে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক বার্তা, অন্যদিকে ইউরোপের চাপ। এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল উড়োজাহাজ চুক্তি করল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

কয়েক মাস আগেও যেখানে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস, সেখানে শেষ মুহূর্তে সব হিসাব পাল্টে গিয়ে বোয়িংয়ের ঝুলিতে গেল অর্ডার।

প্রশ্ন উঠছে এটি কি শুধুই নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত, নাকি বাংলাদেশের আকাশে শুরু হয়েছে বড় শক্তিগুলোর নীরব প্রভাবের লড়াই?

এটি কি শুধুই বহর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, নাকি ওয়াশিংটন-ইউরোপের টানাপোড়েনে বাংলাদেশের নতুন অবস্থান?

শেষ পর্যন্ত এয়ারবাসকে সরিয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে বড় চুক্তি হওয়ায় অনেকেই এটিকে কেবল বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

“এয়ারবাস থেকে সরে এসে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা, সম্ভাব্য বাণিজ্য চাপ মোকাবিলা এবং বৃহত্তর কূটনৈতিক ভারসাম্যের অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে,” আলাপ-কে বলেছেন বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম।

সরকার অবশ্য বলছে, বিমানের বিদ্যমান বহর ও অপারেশনাল বাস্তবতা বিবেচনায় বোয়িংই বেশি কার্যকর। বর্তমানে বিমানের অধিকাংশ উড়োজাহাজ বোয়িং নির্মিত হওয়ায় প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কম থাকবে।

এই চুক্তি বাংলাদেশের বৃহত্তর বিমান চলাচল খাতের লক্ষ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত।

তার ভাষায়, “বাংলাদেশ আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হওয়ার পথে এগোচ্ছে। বিমানের নতুন উড়োজাহাজ সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।”

এয়ারবাস বনাম বোয়িং

গল্পের শুরুটা ২০২৩ সালে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরের সময় এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার একটি সমঝোতা সই করেছিল তৎকালীন সরকার।

তখন এটিকে ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বোয়িং থেকে এয়ারক্রাফট কেনার আলোচনা সামনে আসে। যা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর।

ত্রিশে এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে হওয়া চুক্তি নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, “রিসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা আর্ট (ART) চুক্তি আমাদেরকে একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। এতে এমন অনেক ধারা রয়েছে, যা উভয় দেশের জন্যই উপকারী হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং আজকের মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের পথ সহজ করা।”

এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের “পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্কেরও একটি দৃষ্টান্ত” বলেও মনে করেন তিনি।

চুক্তির আওতায় বোয়িং বিমানকে সরবরাহ করবে দুইটি ৭৮৭-৯, আটটি ৭৮৭-১০ এবং চারটি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ।

এই ১৪টি এয়ারক্রাফট কিনতে খরচ হচ্ছে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি টাকার বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণের পদক্ষেপ। যার ফলে আগামী এক দশকে বিমানের উড়োজাহাজের সংখ্যা বেড়ে ২৭টিতে পৌঁছাবে বলে জানান ওয়াহিদুল আলম।

“এবারের চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩১ সাল থেকে আগামী পাঁচ বছরে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজগুলো দেশে আসবে। হিসাব অনুযায়ী তখন বাংলাদেশের কাছে ২৭টি এয়ারক্রাফট হবে। কিন্তু এর মধ্যে পুরনো অনেকগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। তাই এই সংখ্যাটাও ভুল।” 

জিএসপি প্লাস সুবিধায় প্রভাব ফেলবে

ইউরোপের চাপ

এয়ারবাসকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা সামনে আসার পর থেকেই ইউরোপীয় কূটনীতিকদের বক্তব্য বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে।

গত বছরের ২৬এ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকায় নিযুক্ত চার ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দেন, বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লোটজ বলেছিলেন, “দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বিভিন্ন ইস্যু যেমন, জিএসপি প্লাস আলোচনার পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এয়ারবাস কেনার মতো বড় সিদ্ধান্তগুলোও আলোচনার মেজাজ নির্ধারণ করে। অবশ্যই এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। তবে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক জীবনের মতো, প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব থাকে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর।”

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২০২৯ সালের পর জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লক্ষ্য।

বাংলাদেশের বাজারে এয়ারবাসের প্রবেশ যদি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তা ইউরোপের সাথে সম্পর্কের জন্য ভালো হবে না বলেই মনে করেন ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ।

“আমরা আশা করছি, এয়ারবাসকেও বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তাদের উড়োজাহাজও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে। যদি তাদের জন্য দরজা বন্ধই থাকে, তাহলে এটি ভবিষ্যতের পারস্পরিকতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের জন্য একটি ভালো সংকেত হবে না,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেইড ডিল

বোয়িং বিশ্বের অন্যতম বড় মার্কিন রপ্তানি ব্র্যান্ড। ফলে বোয়িং থেকে বড় অর্ডার মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দৃশ্যমান বার্তা।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিকে অনেকেই বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নানা ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। মানবাধিকার, নির্বাচন, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে একাধিকবার আলোচনা ও চাপ তৈরি হয়েছে।

এই বাস্তবতায় বোয়িংয়ের মতো মার্কিন জায়ান্টের সঙ্গে বড় চুক্তি ওয়াশিংটনের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

সব মিলে ইউরোপের অবস্থান ঢাকার ওপর এক ধরনের “নরম কূটনৈতিক চাপ” সৃষ্টি করলেও বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির পর বাংলাদেশ-ইউরোপ সম্পর্ক “খারাপ হবে না” বলেই মনে করেন এভিয়েশন বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম।

“এয়ারক্রাফট বাংলাদেশকে কিনতেই হতো। দুই পক্ষই এখানে চেষ্টা করেছে। তবে আমার মনে হয়, বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি। যা বোয়িংকে এই চুক্তিতে অ্যাডভানটেজ দিয়েছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে গিয়ে ইউরোপিয় কোম্পানির সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে।

তার ভাষায়, “বেসরকারি খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন যে রাজনৈতিক কারণে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘাটতি কমানোর চাপের ফলে একটি ইউরোপীয় কোম্পানির প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। এটি একটি বাস্তবতা এবং আমাদের জন্য এটি একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”

বোয়িং ও এয়ারবাস দুই উড়োজাহাজ ব্যবহার করলে রুট পরিকল্পনা ও অপারেশনাল বৈচিত্র্য বাড়বে

বোয়িংয়ের নিরাপত্তা বিতর্ক

বোয়িংয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাস পুরোপুরি স্বস্তির নয়। বিশেষ করে ৭৩৭ ম্যাক্সকে ঘিরে একাধিক দুর্ঘটনা ও বৈশ্বিক তদন্ত কোম্পানিটির ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয়।

তাদের আরেকটি এয়ারক্রাফট ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের উৎপাদন মান নিয়েও গত কয়েক বছরে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে।

গত বছরের ১২ই জুন এয়ার ইন্ডিয়ার একটি দুর্ঘটনার পর ড্রিমলাইনারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এমন বিতর্কের মধ্যেও কেন বোয়িংয়ের ওপর এত বড় আস্থা রাখছে বিমান?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইন এখনও বোয়িং পরিচালনা করছে এবং নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থাও আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে।

তবু সমালোচকদের মতে, এই বিনিয়োগে ঝুঁকির দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত ছিল।

বৈচিত্র্য নাকি ব্যয়বহুল বাস্তবতা

বিশ্বের বড় এয়ারলাইনগুলো সাধারণত তাদের বহরে বৈচিত্র্য রাখে। বোয়িং ও এয়ারবাস দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ ব্যবহার করলে রুট পরিকল্পনা ও অপারেশনাল বৈচিত্র্য বাড়ে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি স্বীকার করেন।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম আলাপ-কে বলেন, “দুনিয়ার সব বড় এয়ারলাইনই ব্যালান্সড ফ্লিট বজায় রাখে। প্রতিটি আলাদা উড়োজাহাজের আলাদা-আলাদা সুবিধা অসুবিধা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বোয়িংয়ের বিশেষ দক্ষতা আছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এয়ারবাস এগিয়ে।”

“ব্যালান্সড ফ্লিট” বলতে বোঝায় এমন একটি উড়োজাহাজ বহর, যেখানে বিভিন্ন ধরনের বিমান কৌশলগতভাবে রাখা হয়, যাতে এয়ারলাইনটি স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ সব ধরনের রুট দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে।

তবে বহরে নতুন ধরনের উড়োজাহাজ যুক্ত হলে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।

আকাশের চুক্তি, মাটির বাস্তবতা

বিমান বাংলাদেশের নতুন উড়োজাহাজ কেনা নিঃসন্দেহে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের বড় ঘটনা। কিন্তু এটি শুধু একটি এয়ারলাইনের বহর সম্প্রসারণ নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, ইউরোপের বাণিজ্য রাজনীতি, কৌশলগত ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার প্রশ্ন।

এখন দেখার বিষয়, বোয়িংয়ের এই বিশাল চুক্তি শেষ পর্যন্ত বিমানের ব্যবসায়িক কাঠামোকে শক্তিশালী করে কিনা, নাকি রাজনৈতিক সমীকরণের ভার বইতে গিয়ে আরও বড় আর্থিক চাপে পড়ে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।