উৎপাদনের ভরা মৌসুমেও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকখাতের (আরএমজি) কারখানায় মেশিন বন্ধ হয়ে থাকছে দিনের একটা বড় অংশ।
বিদ্যুতের অভাবে বাড়ছে জেনারেটর নির্ভরতা, আবার জ্বালানির দামও বেড়েছে। সবমিলিয়ে পোশাক উৎপাদন খরচ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর প্রভাবে কমছে উৎপাদন, বিলম্ব হচ্ছে শিপমেন্ট, কমে আসছে মুনাফা।
পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি খাতে ‘বড় ধরনের চাপ’ তৈরি হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন শিল্প মালিকরা।
ইতোমধ্যে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, বাধ্য হয়ে কেউ কেউ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত।
বাড়তি খরচ আন্তর্জাতিক বাজারে সমন্বয়ের সুযোগ না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে মালিকদের।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম আলাপ-কে বলেন, দেশের তৈরি পোশাক খাত এখন তিনটি বড় চাপের সঙ্গে লড়ছে। জ্বালানি সংকট, লোডশেডিং এবং বাড়তি উৎপাদন ব্যয়।
“গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও বহু কারখানা আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আরও কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং রপ্তানি খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বড় ধাক্কায় পড়বে।”
লোডশেডিংয়ে ব্যাহত উৎপাদন
বিদ্যুত সংকটে সবচেয়ে বাজে সময় পার করছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায় থাকা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো।
সংকটের সময় বিদ্যুত সরবরোহে যখন ‘লোড’ ব্যবস্থাপনা করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি লোডশেডিংয়ের শিকার হয় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা।
ব্যবসায়ী নেতা হাতেম বলেন, “সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে পল্লী বিদ্যুতের লাইনে চলা কারখানাগুলো। কোথাও কোথাও দিনে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য যায়গায়ও দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার লোডশেডিং হচ্ছে।”
লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানাগুলো ’নাজেহাল’ অবস্থার মধ্যে পড়েছে বলে জানিয়েছেন জে-মার্ফ অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান কে এস জাহিদ।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “জেনারেটরও ঠিকভাবে চালাতে পারছি না। ডিজেল সংকট আছে, বাজারে সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে সেটাও বাড়তি খরচে। ফলে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।”
তার মতে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে এবং কোম্পানির লোকসান বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পণ্য পাঠাতে না পারলে অর্ডার বাতিলের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন এই উদ্যোক্তা।
“আমাদের দেশে অনেক শিপমেন্ট শেষ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু গার্মেন্টস নয়, সব সেক্টরই এখন ঝুঁকির মধ্যে আছে,” বলেছেন সাভারের আউকপাড়া এলাকার এই গার্মেন্টস ব্যবসায়ী।
যদিও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সব এলাকায় এক রকমন না। বিশেষ করে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর কয়েকদিন বিদ্যুত সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানেও পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ার চিত্র আসছে।
“আমাদের ২৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে এবং পুরো চাহিদাই এখন পূরণ হচ্ছে। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আমরা কোনো লোডশেডিং করছি না,” আলাপ-কে বলেন ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (কারিগরি) মো. সোলায়মান হোসেন।
ডিজেলে বাড়ছে ব্যয়
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে এখন অনেক কারখানাই তেলভিত্তিক জেনারেটরনির্ভর হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।
তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে পরিবহনের ভাড়া। কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহণে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে পোশাক শিল্পে।
সব মিলে জ্বালানি ব্যয় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে বলে জানান ঢাকার ধামরাইয়ের বাথুলি এলাকার টি-শার্ট ও পোলো শার্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কিউট ড্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসাইন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ।
“আগে ডিজেলে যে পরিমাণ খরচ হতো এখন সেটা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আবার ডিজেলের দাম বেড়েছে। আমার ধারণা, এতে আমাদের মোট এনার্জি খরচ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
গ্যাসের সংকটে বাড়ছে চিন্তা
বিদুতের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে গ্যাসের নতুন মূল্যবৃদ্ধি।
গত বছরের ১৩ই এপ্রিল থেকে শিল্পখাতে গ্যাসের প্রতি ঘনমিটারের দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করা হয়েছে। ক্যাপটিভ বিদ্যুতকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের দাম সাড়ে ৩১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা করা হয়েছে।
২০২২ সালের পর থেকেই গ্যাসের এমন মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে এবং এতে পোশাক শিল্প চাপে পড়ছে বলে মনে করেন মো. হাতেম।
“রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ২০২২ সালে ১২ টাকার গ্যাস বেড়ে হলো ৩০ টাকা। তখন এই চাপ সামলাতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে এবারও জ্বালানি খরচ বাড়ানো হয়েছে। এরপর গ্যাসের দামও বাড়লে, নিশ্চিত করেই নতুন করে আরও অনেক কারখানা চাপে পড়বে।”
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ মনে করেন আগামীতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে গড়াতে পারে। আর সেটা হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটে চাপে পড়বে।
“গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প ও সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবহারের বিষয়টি দেখতে হবে,” বলেছেন তিনি।
রপ্তানিতে ধাক্কা
শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দেশের রপ্তানি খাত ধারাবাহিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের অগাস্ট থেকে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করছে।
বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম বলেন, “কয়েক বছর ধরেই শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে প্রতি মাসে রপ্তানিও কমছে।”
পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা গেলে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় এতদিনে ‘বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতো’ বলেও মনে করেন তিনি।
বাড়ছে কারখানা বন্ধ ও ঋণ ঝুঁকি
পোশাকখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকের উচ্চ সুদহার এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে পোশাক শিল্পখাতকে।
বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শ্রমিক সুবিধা বাড়ানোর ফলে পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। এর ওপর জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় অনেকটা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।
সব মিলে অতিরিক্ত খরচের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার।
তিনি বলেন, “গত ২০ দিনে উৎপাদন খরচ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে খেলাপির ঝুঁকিতে পড়বেন। এতে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের দাম বাড়ছে না, কিন্তু উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে বলে মনে করেন কিউট ড্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ হোসাইন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ।
তার ভাষায়, “যে সব অর্ডার নেওয়া হয়ে গেছে সেখানে আর কিছু করার নেই। পরের অর্ডারে হয়তো বাড়তি খরচের বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে।”
তবে বাড়তি খরচ সমন্বয়ের এই চেষ্টা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার কারণে সহজ হবে না বলেও মনে করেন তিনি।