সৌদি আরবের দাম্মামে আবাসন ব্যবসায়ী বাংলাদেশি মোহাম্মদ ফয়সাল। মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরু হওয়ার পর তার বেচাকেনা কমে গেছে অন্তত ৩০ শতাংশ।
এর চেয়েও খারাপ অবস্থা তার এক প্রতিবেশীর। একটি তেল পরিশোধনাগারে কাজ করতেন তিনি। গত মাসে তার চাকরি চলে যাওয়ার পর এখনো চাকরি খুঁজে পাননি।
“বিশেষ করে তেলের রিফাইনারিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখানে অনেক ছাঁটাই হয়েছে। যাদের অনেকেই এখান থেকে চলে গেছে। আরও অনেকে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। পুরো জীবন হঠাৎ করেই ওলটপালট হয়ে গেছে,” আলাপ-কে বলেছেন ফয়সাল।
সৌদি আরবের সব খাতে যুদ্ধের প্রভাব না পড়লেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়েছে বলে জানান তিনি।
পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, বেগুন, আপেলের মতো খাদ্য পণ্যের দাম বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এখানে অনেকের চাকরি নেই, ব্যবসা ভালো না। এ অবস্থায় শত শত বাংলাদেশি প্রবাসী এক ধরনের অনিশ্চয়তা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে।”
একই অবস্থা কাতারে। ‘কাতার প্রবাসী’ গ্রুপে দেওয়া পোস্টে রাসেল রহমান লিখেছেন, “আমি গাফায় একটা রেস্টুরেন্টে জব করতাম। গত মাসের ৩১ তারিখ থেকে চাকরি নাই। রেস্টুরেন্ট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিছে মালিক পক্ষ, স্যালারিও দেয় নাই।”
এরপর কড়জোড়ে অনুরোধের ইমোজি ব্যবহার করে লিখেছেন, “কেউ কি একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?”
শাহেদ হোসেন নামের আরেকজন কাতার প্রবাসীর ভাষ্য, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেড়ে গেছে কাতারের জীবনযাত্রার ব্যয়।
“এখানে আমাদের যে স্বাভাবিক জীবন ছিল, যুদ্ধ শুরুর পর তা পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে। সব খাবারের দাম বেড়ে গেছে। আগে যে পেঁয়াজ কিনতেন ১-২ রিয়াল কেজিতে, সেটা দুই তিনগুণ বেড়ে ৫-৬ রিয়াল হয়ে গেছে। একইভাবে ১ রিয়াল কেজি দরের আলু হয়ে গেছে ৪ থেকে ৫ রিয়াল। এদিকে অনেকেরই চাকরি, উপার্জন নেই।”
জনশক্তি রপ্তানিতে মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কতটা
যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল ২৮এ ফেব্রুয়ারি। এরপর মার্চ ও এপ্রিলে মধ্যপ্রাচ্যে কার্যত বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানো যায়নি বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।
“আমাদের শ্রমবাজারের ৭৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। অথচ মার্চ এবং এপ্রিলে মধ্যপ্রাচ্যে লোক পাঠানোর সংখ্যা অনেক নেমে এসেছে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
তবে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বিএমইটি’র তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও বেশি। ২০২৫ সালে ১১ লাখের মতো অভিবাসী বিভিন্ন দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯ লাখ গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে। যা প্রায় মোট সংখ্যার ৮২ দশমিক ৪ শতাংশ।
চলতি বছরের মার্চে ৪৪ হাজার ৬৫৮ জন কর্মী বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬৬ হাজার ৭৭৩ জন।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার ৩৩ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার ৩২ শতাংশ কমেছে, যা গত ৫৪ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে পাঠানো কর্মী সংখ্যার ওপর।
বিএমইটির তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারির তুলনা মার্চে সৌদি আরবে কর্মী যাওয়ার হার কমেছে ৪৪ শতাংশ।
মার্চে দেশটি ২৪ হাজার ৮৬২ জন বাংলাদেশি কর্মীকে ছাড়পত্র দিলেও ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৮২ জন।
জনশক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও এখনো এর ‘উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি’ বলে মনে করেন প্রবাসী কল্যান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “লোক যখন যেতে পারছে না তার মানে প্রভাব তো পড়ছেই। তবে এটা এখনো উল্লেখযোগ্য নয়। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হবে।”
শঙ্কা রেমিট্যান্সেও
সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোতে কর্মসংস্থান কমছে বাংলাদেশিদের। অথচ, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেই।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে এখন আছেন ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক। যারা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের রিজার্ভকে শক্তিশালী রেখেছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে প্রায় ৪৬ শতাংশ রেমিট্যান্স এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
গেল মার্চে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে। ওই মাসে পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এসেছে ২৬ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, একই সময়ে মোট রেমিট্যান্সের মধ্যে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ (সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমান) থেকে এসেছে ১০ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার।
তবে সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতে এই ধারা বিঘ্নিত হতে পারে।
তারা বলছেন, এই টাকা ছিল অধিকাংশ প্রবাসীদের সঞ্চয় থেকে পাঠানো। কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যেখানে বেতন আটকা, সেখানে রেমিট্যান্স বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ এটাই।
এ নিয়ে সৌদি আরব প্রবাসী ফয়সাল বলেন, “দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো কমেছে। আগে যতটা পাঠাতে পারতাম ততটা পাঠানো হয়নি বরং উলটো এখানে অনেকেই দেশ থেকে টাকা এনে চলছে। আবার যাদের কিছুটা সেভিংস ছিল তারা সেটা ভেঙে চলছে।”
মধ্যপ্রাচ্য সংকট জ্বালানির পাশাপাশি শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে নতুন করে চাপে ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
“মধ্যপ্রাচ্যে লোক পাঠানো যাচ্ছে না। তার মানে রেমিট্যান্স যতটা আসতো সেটা তো আসছে না। সমস্যা যত দীর্ঘমেয়াদে চলবে বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব ততটাই বাড়বে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট শেষ হওয়ার প্রতীক্ষায় আছেন সেখানকার চাকরিজীবীরা আর ব্যবসায়ীরা। আশা করছেন শিগগিরই ভালো সময়ে ফিরবে।
আর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জানালেন তারা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছেন।
তার ভাষায়, “এখন যারা জবলেস আছেন তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ নিয়ে দূতাবাস কাজ করছে।”