কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি, সিন্ডিকেটের চাপ, কী হয়েছিল নবীনের সঙ্গে 

কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি করে আলোচনায় আসে ‘নবীন পাঞ্জাবি’। ঈদের আগে মগবাজারের শোরুম জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ, সিন্ডিকেটের চাপ ও প্রাণনাশের শঙ্কা তুলে ব্যবসা গুটিয়ে দেশ ছাড়ার ঘোষণা, এরপর আবার প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালুর কথা জানানো হয়েছে।

এই ওঠানামার মধ্যেই সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন। দেশে কি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার সুযোগ নেই? নাকি চাপ, ভয় আর সমঝোতার মধ্যেই টিকে থাকতে হয় উদ্যোক্তাদের?

ঈদের বাজারে কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি করে আলোচনায় আসা ‘নবীন পাঞ্জাবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফেজ এনামুল হাসান নবীন ব্যবসা গুটিয়ে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান মঙ্গলবার। তার ভাষ্য অনুযায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের চাপ ও নিরাপত্তা শঙ্কায় তার এই সিদ্ধান্ত।

দোকান বন্ধ করে দেওয়ার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা। পরে অবশ্য তাদের ফেইসবুক পেইজে জানানো হয়, শোরুমের কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।

কী হয়েছিল

মঙ্গলবার রাতে ফেইসবুক পোস্টে এনামুল হাসান নবীন লিখেছেন, “সিংহের মতো বাঁচতে চাই। কিন্তু সিন্ডিকেটের গুলিতে সন্তানদের এতিম করতে চাই না। তাই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো একদিন দেশে ফিরব ইনশাআল্লাহ।”

ঈদ মৌসুমে রাজধানীর মগবাজারে ‘নবীন ফ্যাশন’-এর শোরুমে কম দামে পাঞ্জাবি বিক্রি শুরু করেন নবীন। “দুইটা কিনলে চারটা ফ্রি”এমন অফার দিয়ে প্রায় ৩৩০ টাকায় একটি পাঞ্জাবি বিক্রি করছিলেন তিনি। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভিড় বাড়তে থাকে ক্রেতাদের।

কিন্তু এই কম মূল্যে বিক্রিই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য। অভিযোগ ওঠে, আশপাশের ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে তার দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নবীনের দাবি, বাজারে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে রেখেছে। পাঞ্জাবি ৪ হাজার ৫০০ টাকার নিচে এবং পাজামা ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে বিক্রি করা যাবে না। তিনি সেই নিয়ম ভেঙে কম দামে পণ্য বিক্রি করায় বাধার মুখে পড়েন।

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। নবীনের ভাষ্য, ভিডিওটি তাদের পক্ষ থেকে করা হয়নি। একজন গ্রাহক তা ধারণ করে ফেইসবুকে পোস্ট করেন, সেখান থেকেই বিষয়টি ভাইরাল হয়।

এদিকে, তার অভিযোগ দোকানের সামনে পুলিশ মোতায়েন করে শোরুম বন্ধ রাখা হয়। এমনকি আলো জ্বালাতেও বাধা দেওয়া হয়। পরে পুলিশ দাবি করে, তারা দোকান বন্ধ করেনি। তবে খুলতেও অনুমতি দিতে পারেনি।

ভিডিওতে একজনকে শোরুমের ক্যাশ কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ গলায় বলতে শোনা যায়, “আপনারা যে দামে পাঞ্জাবি দেন, তা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রিলিজ করে দেন।”

যা বলছেন নবীন

মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এনামুল হাসান নবীন বলেন, “আমরা কোনো দুই নম্বর ব্যবসা করি না। আমরা লিগ্যাল ব্যবসা করছি। আমাদের কাস্টমার আলাদা, যারা কম দামে ভালো পণ্য চায়। কিন্তু তবুও একটা আক্রমণাত্মক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করেন, তাকে ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে, ভিডিও মুছে না ফেললে সব শোরুম বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে তিনি নিজেকে নিরাপদ মনে করছেন না।

“আমার ছোট ছোট সন্তান। আমি পাঞ্জাবি বিক্রি করতে গিয়ে আমার জীবন দিতে পারব না,” বলেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন নবীন। তার ভাষায়, “একজন থানার ওসি যদি এভাবে ভীতু আচরণ করেন, তাহলে আমি কোথায় যাব? অন্য থানায় গেলে অভিযোগ নেবে না। ফলে আমি কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারিনি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা শর্ট টার্ম লাভের জন্য ব্যবসা করি না। আমরা কম দামে পণ্য দিয়ে মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ ও মাদক থেকে ফিরে আসা মানুষ কাজ করে। তাদের নিয়েও চিন্তা হচ্ছে।”

নিজেকে “একটা কীটপতঙ্গ” হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাকে যদি এভাবে মেরে ফেলা হয়, বিচার পাব? আমার সন্তানরা কি বিচার পাবে? জীবন একটাই, এই জীবন আমি সিন্ডিকেটের কাছে শেষ করতে রাজি না।”

সরকারের প্রতিও অভিযোগ করে তিনি বলেন, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নেই, বরং বড় ব্যবসায়ীরাই বেশি সুবিধা পায়।

“আমি কোন আইনি পদক্ষেপ নেই নাই বর্তমান আইন ব্যবস্থার উপর আমার সংশয় আছে যে তাদের কাছ থেকে আমি পরিপূর্ণ ইনসাফ পাবো।”

এই বিষয়ে শতভাগ অনিশ্চয়তা আছে উল্লেখ করে নবীন বলেন, এরকম অনেকবার হয়েছে। এইবারই আল্লাহর রহমত যে একজন গ্রাহক আমাদের ভিডিও করেছে সেজন্য আপনারা দেখতে পারছেন। আগে কখনো পুলিশ নিয়ে এরকম আসে নাই।

এর আগে ২১এ মার্চ ঈদের দিনও লাইভে এসেছিলেন নবীন। সেখানেও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কাজ করে যাবেন তারা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়

নবীনের দেশ ছাড়ার ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। প্রচুর পেইজ ও প্রোফাইল থেকে নবীনের পক্ষ নিয়ে পোস্ট করা হয়।

ডাকসু নেতা এবি জুবায়ের এক পোস্টে বলেন, “কম দামে কাপড় বিক্রি করাই তার অপরাধ। এজন্য তাকে ব্যবসা করতে দেওয়া হয়নি।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নবীনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করা প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ ও পুনর্বাসিত মানুষদের কর্মসংস্থানও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকীও প্রশ্ন তোলেন, “এই ঘটনার পর কি কেউ দেশে ভালো কিছু করার সাহস পাবে? সরকার এসব সিন্ডিকেট ভাঙবে কবে?” 
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই নবীনকে “লো-কস্ট উদ্যোক্তা মডেল”-এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাজারে একটি অঘোষিত মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করছে, যেখানে কম দামে পণ্য বিক্রি করলে বাধার মুখে পড়তে হয়।

আবার অনেকে এই ঘটনাকে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ‘নেগেটিভ সিগন্যাল’ হিসেবে দেখছেন।

আবারও খুলছে শোরুম

নবীন ফ্যাশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদের আগের দিন মগবাজার শাখা জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার পরও তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকছে না। বুধবার প্রতিষ্ঠানটির এক ফেইসবুক পোস্টে বলা হয়, এবারের ঈদ আনন্দ উৎসব ১৫ দিনব্যাপী চলবে- ইনশাআল্লাহ।

পোস্টে উল্লেখ করা হয়, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর হস্তক্ষেপে মগবাজার শাখা ছাড়া অন্যান্য শোরুম চালু রাখা হচ্ছে। এসব শোরুমে আকর্ষণীয় অফারও অব্যাহত থাকবে।

এ ছাড়া, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাফেজ এনামুল হাসান নবীন চীন থেকে ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে ঈদ উপলক্ষে গ্রাহকদের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন বলেও জানানো হয়েছে।