ঈদ এলেই বাড়ি ফেরে মানুষ, নাড়ীর টানে। আবার ঈদ মৌসুমের যাতায়ার যেন হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির খসড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঈদযাত্রায় ১৫ই মার্চ থেকে ২২এ মার্চ পর্যন্ত ১৮৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮২ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ২০২ জন।
একই সময়ে রেলপথে সাতটি দুর্ঘটনায় ৪২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। ৪৪ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে সাতটি দুর্ঘটনায় ৫৬ জনের প্রাণহানি ও ৮৮ জন আহত হয়েছেন।
মোট মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৮৬ জনের।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঈদের দিন শনিবার রাত থেকে রবিবার বিকাল পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
প্রতি বছরই ঈদযাত্রায় প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি হলেও এবার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে সড়কের পাশাপাশি রেল ও নৌপথের দুর্ঘটনাও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধারাবাহিকতার মানে হলো, সড়ক নিরাপত্তায় কোনো কার্যকর উন্নতি হয়নি বরং অতিরিক্ত গতি, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
ঈদের দিনই ৮ জনের মৃত্যু
এখনো দুর্ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি যাত্রীকল্যাণ সমিতি। তবে গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ঈদের দিন শনিবার সকাল থেকে বিকালের মধ্যে ছয় জেলায় অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন।
ময়মনসিংহের তারাকান্দায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন। চট্টগ্রামের পটিয়ায় বাস উল্টে একজন এবং মিরসরাইয়ে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চালক নিহত হন।
নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর ও মাদারীপুরে পৃথক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আরও চারজন প্রাণ হারান যাদের বেশিরভাগই কিশোর ও তরুণ।
কুমিল্লার ট্রেন-বাস ট্র্যাজেডি
ঈদের সময় সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার জাঙ্গালিয়া কচুয়া এলাকায়। ভোররাতে একটি যাত্রীবাহী বাসকে চট্টগ্রাম মেইল ট্রেন সজোরে ধাক্কা দিলে মুহূর্তেই দুমড়ে মুচড়ে যায় বাসটি।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনটি ক্রসিং পার হচ্ছিলো। ওই সময় গেটম্যান না থাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাস রেললাইনে উঠে পড়লে সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের পর বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে টেনে নিয়ে যায় ট্রেন।
ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১২ জন। নিহতদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং দুই শিশুও রয়েছে। আহত হন আটজন।
এই ঘটনায় গেটম্যানকে আসামি করে মামলাও করা হয়েছে।
মহাসড়কজুড়ে মৃত্যু
ঈদের ছুটিতে ফাঁকা সড়ক যেন হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া গতির ক্ষেত্র। হবিগঞ্জের মাধবপুরে আসবাবপত্রবোঝাই একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে চারজন নিহত হন।
ফেনীর রামপুর এলাকায় একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া যানজটে অন্য একটি দ্রুতগতির বাস ঢুকে পড়ে। প্রাণ হারান তিনজন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-রামপুর এলাকায় চট্টগ্রামমুখী একটি লেন বন্ধ রেখে সংস্কারকাজ করছিল সড়ক ও জনপদ বিভাগ। সংস্কারকাজ চলার কারণে যানবাহনের গতিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
রবিবার ভোরে একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীরগতিতে চলায় পেছনে থাকা একটি বাসের চালকের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স চালকের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। এ ঘটনায় সেখানে যানবাহনের জটলা তৈরি হয়। ওই জটলায় কয়েকটি দ্রুত গতির বাস পরপর ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যান। গুরুতর আহত হন ছয়জন।
ঈদের আগের দিন শুক্রবার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে উপজেলার ভরাডোবা এলাকায় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামনের তিনটি যানবাহনকে ধাক্কা দেয়। এতে দুজন নিহত ও ছয়জন আহত হন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা
ঈদের এই দুর্ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশজুড়ে আছে মোটরসাইকেল আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তরুণ জীবনের অসমাপ্ত গল্প। নতুন বাইক, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হওয়া, একটু দ্রুত চালানোর রোমাঞ্চ সব মিলে এই স্বল্প সময়ের আনন্দই অনেক ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে।
কিশোরগঞ্জে বন্ধুদের সঙ্গে বের হওয়া তিন তরুণ, সুনামগঞ্জে নতুন মোটরসাইকেলে ঘুরতে যাওয়া দুই বন্ধু, ফরিদপুরে কিশোর চালক। প্রতিটি ঘটনাতেই একই চিত্র। নিয়ন্ত্রণ হারানো, সড়কে ছিটকে পড়া, আর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে জীবন থেমে যাওয়া।
শনিবার কিশোরগঞ্জে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে তিন তরুণ। পরে পেছন থেকে একটি পিকআপ তাদের চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জে নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে ঈদের দিনে ঘুরতে বের হয়েছিল দুই বন্ধু। বৃষ্টিভেজা পিচ্ছিল সড়কে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যায়। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
ঢাকাতেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি। একাধিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অনেক রোগী ভর্তি হয়েছেন।
মহাসড়কের বাইরেও দুর্ঘটনা
প্রতিবছর ঈদের সময় মহাসড়কের দুর্ঘটনা যেন নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এবার দুর্ঘটনা ঘটেছে রেল ও নৌপথেও। এবারের ঈদযাত্রার শুরুর দিকে ভয়াবহ এক লঞ্চ দুর্ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল সারাদেশ। দুই লঞ্চের সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিল দুইজন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে দেখা যায়, ‘আসা যাওয়া-৫’ নামক একটি লঞ্চে ছোট ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী উঠছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকটি লঞ্চ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছন থেকে আসা যাওয়া-৫ লঞ্চটিকে জোরালো ধাক্কা দেয়। দুই লঞ্চের মাঝখানে পড়ে ট্রলারে থাকা যাত্রীরা পিষ্ট হন। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।
একজনের মরদেহ মিললেও, আরেকজনের মরদেহ ভেসে যায় নদীতে। দুই দিন পর আধা কিলোমিটার দূরে ভেসে উঠে সেই মরদেহ।
সেদিনই মহাসড়কের বাইরে আরেক বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল। রেললাইন থেকে ছিটকে পড়েছিল ট্রেনের ৯টি বগি।
ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী আন্তনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঈদে ঘরমুখী যাত্রীতে ভরা ছিল। সান্তাহার জংশন পার হয়ে উত্তরের বাগবাড়িতে এসে ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীরা নিচে পড়ে আহত হন। এ ছাড়া বগির ভেতরে থাকা অনেক যাত্রীও আহত হন।
বাগবাড়ি এলাকায় রেললাইন মেরামতের কাজ চলছিল, লাল নিশানাও টাঙানো ছিল। কিন্তু লোকোমাস্টারের সংকেত অমান্য করেই ট্রেনটি চলছিল।
সান্তাহার ও কুমিল্লার ট্রেন দুর্ঘটনায় বার্তা এসেছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও। কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে ট্রেন–বাসের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সম্প্রতি বগুড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর গত শনিবার দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ট্রেন দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ অবিলম্বে খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন।
কেন বাড়ছে দুর্ঘটনা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেন, “ঈদযাত্রায় প্রতিবছরে আমরা দুর্ঘটনা দেখি। এবারের যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি নৌ এবং রেল দুর্ঘটনাটা অ্যালার্মিং।”
আলাপকে তিনি বলেন, “ট্রেন ট্র্যাক মেইন্টেনাস আগে করে ফেলা হয়। নজরদারি থাকে। তো সে জায়গাতে গেটম্যান থাকবে না কেন? তারপরে আরেকটা জায়গায়, হচ্ছে যে মেইন্টেইনেন্সের কাজ চলছিল, সিগন্যাল ওভারলুক করে চলে গেছে। এটা অ্যালার্মিং।”
সড়ক দুর্ঘটনার পরিস্থিতি উন্নতি হয়নি মত দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “গাড়ি উলটে পড়ে যাচ্ছে, স্পিডিং করে মোটর সাইকেলের দুর্ঘটনা-এগুলো কিন্তু আমরা হরহামেশা ঘটছে। তার মানে আমাদের এখানে আমাদের কোনো ইমপ্রুভমেন্ট নাই, বরং আরও কিছুটা বাড়ছে।”
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চালকের সংকটের কথা উল্লেখ করে সাইফুন নেওয়াজ বলেন, “চালকের সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে আমাদের। নাইলে দেখা যাবে চালক ওভারলোডেড হবে।”
সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ভালো কোম্পানিভিত্তিক বাস সিস্টেম আনতে হবে। এতে প্রতিযোগিতা কমবে, পর্যাপ্ত চালক থাকবে এবং গাড়ি নিরাপদে ট্র্যাক করা যাবে।
“এগুলো এক্সিকিউট হয় না কারণ যারা এক্সিকিউট করবে, তারা অনেকসময় যাদের কারণে দুর্ঘটনা কমে না তাদের দ্বারাই প্রভাবিত হয়। তাদের স্বার্থটাই রক্ষা হয় বেশি।”
সাইফুন নেওয়াজ বলেন, “আমরা চিন্তা করি শর্ট টার্মে, আমরা লং টার্ম চিন্তা করি না এবং কাছে মনে হয় আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনাটা এখনো ইচ্ছার উপর ডিপেন্ড করে।”
অন্যদিকে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলছেন, দেশে প্রতিবছর ঈদকেন্দ্রিক মানুষের যাতায়াতের মুভমেন্ট যে হারে বাড়ে আনুপাতিক হারে যানবাহনের মুভমেন্টও বাড়ে।
“সড়কের স্বল্পতা, আইন প্রয়োগের স্বল্পতা, নানান স্বল্পতার মধ্য দিয়ে এই ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়াপদে পদে গলদের কারণে মূলত সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ে।”
আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি উল্লেখ করে মোজাম্মেল হক আলাপকে বলেন, “মনিটরিং ব্যবস্থায় ঘাটতিগুলো রয়েছে। এগুলো স্বল্প মেয়াদী, দীর্ঘ মেয়াদী, মধ্যমেয়াদী সমাধানের একটা ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।”