ডিসি সাহেবের হাতে একটি কার্তুজভরা বন্দুক তুলে দিলেন তার আরদালি।
পাঞ্জাবী-টুপি পরা কিশোরগঞ্জের ডিসি - অর্থাৎ জেলা প্রশাসক বন্দুকটা উঁচিয়ে ধরে টিপে দিলেন ট্রিগার। বিকট শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠলো।
সাথে সাথে একটি মাঠ ভর্তি মানুষ - সংখ্যায় লাখ লাখ- এবং তার আশপাশের গ্রামগুলোর রাস্তায়, বাড়ির উঠোনে, দালানের ছাদে - যে যেখানে পারলো সেখানেই কাতার বেঁধে নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর আরো কয়েক দফা করা হলো ফাঁকা গুলির আওয়াজ। মোট ছ’বার। শেষবার গুলির আওয়াজের এক মিনিটের মধ্যে শুরু হয়ে গেল ঈদের জামাত। বাংলাদেশের সবচাইতে বড় ঈদের জামাত।
এভাবেই প্রতি বছর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদুল ফিতরের জামাত শুরু হওয়াটা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে বহু বছর ধরে।
প্রায় দুই শতাব্দী আগে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় এই ঈদের জামাত শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের অঞ্চল ছাড়িয়ে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসতে শুরু করে।
কেউ ঘোড়ার গাড়িতে, কেউ নৌকায়- শুধু একসঙ্গে নামাজ পড়ার বিরল অভিজ্ঞতার জন্য ছুটে যেতে থাকেন শোলাকিয়ায়।
ধীরে ধীরে সেখানকার ঈদ জামায়াতই হয়ে ওঠে এক বিশাল মিলনমেলা, সামাজিক বিভাজন সরিয়ে রূপ নেয় সমতার প্রতীকী মঞ্চ হিসেবে।
শোলাকিয়া এখন যেন পরিণত হয়েছে সারাদেশের মানুষের ঈদগাহে। অনেকেই বলেন, উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত হয় শোলাকিয়াতে।
শোলাকিয়া নামকরণ নিয়ে আছে রহস্য। কেউ বলেন, এখানে সোয়া লাখ মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতেন বলে ‘সোয়া লাখ’ থেকেই এসেছে শোলাকিয়া।
আবার অন্যদের মতে, সোয়া লাখ টাকা বা জমির হিসাব থেকেই এসেছে এই নাম।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- শোলাকিয়া কীভাবে হয়ে উঠল ইতিহাস, বিশ্বাস আর মিলনমেলার কেন্দ্র? আর কীভাবে হয়েছিল শোলাকিয়ার নামকরণ?
উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত
কিশোরগঞ্জ জেলার নরসুন্দা নদীর ঠিক পাশেই চর শোলাকিয়া গ্রাম। শীতের কুয়াশা কিংবা বর্ষার বৃষ্টি- আবহাওয়া যেমনই থাকুক, সেখানকার ঈদগাহ মাঠে জামাতে অংশ নিতে জড়ো হন কয়েক লাখ মানুষ।
শোলাকিয়া ঈদগাহর আয়তন প্রায় সাত একর, মূল মাঠ ছয় দশমিক ছয় একরের। মাঠের পাশে আছে পুকুর ও শৌচাগার।
প্রাচীর দিয়ে ঘেরা মাঠে প্রবেশের জন্য চারদিকেই রয়েছে অনেকগুলো পথ। ঈদের জামায়াতের সময় কাতারে কাতারে মানুষে ভরে ওঠে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের জামাতে মূল মাঠে ২৬৫টি কাতার হয় এবং প্রতি কাতারে দাঁড়াতে পারেন প্রায় পাঁচশ জন মানুষ।
মূল মাঠ ছাড়াও ঈদগাহের পাশের বিভিন্ন রাস্তা, ব্রিজ এমনকি বিভিন্ন বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়েও ঈদ জামাতে অংশ নিতে দেখা যায় বহু মানুষকে।
সোয়া লাখ থেকে শোলাকিয়া
ঈদগাহের নাম শোলাকিয়া কীভাবে হলো তার পেছনে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। তবে সব জনশ্রুতিতেই একটি বিষয়ে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
শোলাকিয়া নামটি এসেছে সোয়া লাখ অর্থাৎ এক লাখ পঁচিশ হাজার থেকে। কেউ বলেন সোয়া লাখ মানুষ, কেউ বলেন সোয়া লাখ টাকা থেকে নাম হয়েছে শোলাকিয়া।
জনশ্রুতি আছে, ঈদগাহের প্রথম ঈদ জামাতে সোয়া লাখ মানুষ জমায়েত হয়েছিল। বিশাল সেই ঈদ জামাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে মাঠটি পরিচিতি পায় ‘সোয়া লাখিয়া’ নামে। মানুষের মুখে মুখে সোয়া লাখিয়া শব্দটি পাল্টে শোলাকিয়া হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের ভেতরেই রয়েছে শোলাকিয়া ঈদগাহ মসজিদ। সেখানে ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ তাকরিম হোসাইন জিহাদ।
আলাপকে তিনি বলেন, “প্রথম জামাতে সোয়া লাখ মানুষ হয়েছিল বলে এর নাম হয়েছিল সোয়া লাখিয়া। সোয়া লাখিয়া থেকে শোলাকিয়া।”
এছাড়া আরেকটি জনশ্রুতি হলো, এখান থেকে সোয়া লাখ টাকার রাজস্ব আদায় হতো। মোঘল শাসনামলে এই এলাকায় ছিল রাজস্ব সংগ্রহের একটি অফিস।
পুরো পরগণায় যে রাজস্ব সংগ্রহ হতো তার পরিমাণ ছিলো সোয়া লাখ টাকা। সোয়া লাখ টাকার সেই রাজস্ব অফিস থেকে শোলাকিয়া নামটি এসেছে বলেও অনেকে ধারণা করেন।
প্রথম ঈদ জামাত ও ইমাম
শোলাকিয়ায় ঈদের প্রথম জামাত ১৮২৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় বলে উল্লেখ অনেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সেখানে সৈয়দ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি স্থানীয় জমিদারদের সহযোগিতায় ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠা এবং প্রথম জামায়াতে ইমামতি করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত ‘ময়মনসিংহ জেলায় ইসলাম’ গ্রন্থে।
এই বইয়ে লেখা হয়েছে, সৈয়দ আহমেদ কিশোরগঞ্জের সাহেব বাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। তার পূর্বপুরুষ ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে ইরান থেকে ভারতে আসেন। প্রথমে বর্ধমানপুর এবং পরে কিশোরগঞ্জে বসবাস শুরু।
সেই সময়ে সাহেব বাড়ি এলাকায় কোনো মসজিদ ছিল না। সৈয়দ আহমেদ ১৮২৭ সালে একটি মসজিদ এবং পরের বছর ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। আর সেটিই পরে শোলাকিয়া ঈদগাহ নামে পরিচত হয়।
“ময়মনসিংহ জেলায় ইসলাম” বইয়ের লেখক মো. আবদুল করিম লিখেছেন, হয়বতনগর ও জঙ্গলবাড়ীয়ার দুজন জমিদার এবং ঐ অঞ্চলের আপামর জনতা উপস্থিত হয়ে ১৮২৮ সালের ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ঐতিহাসিক ‘শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ’।
জমিদাররা যেভাবে যেতেন ঈদ জামাতে
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, ঈদের দিন ঘোড়ার গাড়িতে সিংহাসন পেতে সেখানে বসে ঈদগাহে আসতেন জমিদারেরা। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদাররা আসতেন সাজানো নৌকায়।
পথে প্রজাদের বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা দান করতেন জমিদাররা।
জমিদারদের এই আয়োজন দেখতে, আর একই সাথে জমিদারদের সাথে নামাজ আদায় করতে পারবেন বলে দূরদূরান্ত থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে আসতেন অসংখ্য মানুষ।
ঈদের আনন্দ পাশাপাশি বাড়তি এই আকর্ষণ, এভাবেই গড়ে ওঠে এই মাঠের ঐতিহ্য।
বন্দুকের গুলির আওয়াজে শুরু হয় নামাজ
বর্তমানে শোলাকিয়া ময়দানে ঈদ জামাত শুরু হয় বন্দুকের গুলির আওয়াজের মাধ্যমে। দীর্ঘদিনের এই রেওয়াজ অনুযায়ী বন্দুকের গুলির আওয়াজের মাধ্যমে নামাজ শুরুর সময় সম্পর্কে জানান দেওয়া হয়।
জামাত শুরু হওয়ার ৫ মিনিট আগে তিনটি, ৩ মিনিট আগে ২টি এবং ১ মিনিট আগে ১ টি ফাঁকা গুলির আওয়াজ করা হয় শটগানে।
ঈদের দিন ভোর থেকে দলে দলে মুসল্লিরা আসতে শুরু করেন মাঠে। দূর থেকে অনেকেই আগের দিন রাতে এসে অবস্থান নেন।
সারা বছরের তুলনায় ঈদের দিন জনসমাগম বাড়ে কয়েকগুণ। সেই সাথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করবার প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। বাড়তি চাপ সামলাতে বাড়ে জেলা পুলিশের নজরদারিও।
ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয় নজরদারি। এছাড়াও আগের দিন রাতে এবং ঈদের দিন সকালে থাকে পুলিশের বিশেষ টিম।
এ ছাড়া ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই মাঠে থাকে পুলিশের অ্যাডভান্স চেকিং টিম। ঈদের আগের দিন রাতে শোলাকিয়া মাঠে থাকে বাড়তি পুলিশের উপস্থিতি।
আগত মুসল্লিদের নিরাপত্তায় ‘পর্যাপ্ত পুলিশ, র্যাব ও আনসার’ থাকবে বলে জানান কিশোরগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম ভূইয়া।
তিনি বলেন, “কয়েকদিন আগে থেকে ১০ সদস্যের অ্যাডভান্স চেকিং টিম মাঠে থাকে। ঈদের দিন সকালে নিয়োজিত হয় বিশেষ একটি টিম। যেখানে কিশোরগঞ্জ ছাড়াও আশেপাশের অন্যান্য জেলা ও রেঞ্জ রিজার্ভের পুলিশ সদস্যরাও যুক্ত হন।”
এছাড়াও “ঈদের আগের দিন রাত থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকে” বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রবেশপথে দেহ তল্লাশি করা হয়।”
২০১৬ সালের পর থেকেই ঈদ জামায়াতকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সেই বছর ঈদুল ফিতরের জামাতের আগে জঙ্গি হামলার হামলা ঘটনা ঘটে।
শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের পাশের সংযোগ সড়কে তল্লাশি চৌকিতে ওই হামলায় দুজন পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন নিহত ও আহত হন।
দুইশ বছর ধরে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান হয়ে উঠেছে ইতিহাস, বিশ্বাস এবং সামাজিক সমতার এক জীবন্ত প্রতীক। “সোয়া লাখ” মানুষ বা রাজস্বের হিসাব, যেখান থেকেই উৎপত্তি হোক না কেন, শোলাকিয়া ঘিরে রয়েছে ঐতিহ্য আর মানুষের আবেগগের গভীরতা।
জমিদারদের শৌর্য প্রদর্শন থেকে শুরু করে আজকের লাখো মুসল্লির মিলনমেলা অবধি শোলাকিয়ার ঈদ জামাত বদলেছে সময়ের সঙ্গে।
কিন্তু তার মূল সুর একই থেকেছে- তা হলো একসঙ্গে দাঁড়ানোর শক্তি। নিরাপত্তা, আয়োজন আর ঐতিহ্যের সমন্বয়ে প্রতি বছরই মনে করিয়ে দেয় যে, শোলাকিয়া কেবল একটি নাম নয়, এটি বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি।