নজরুল ও আব্বাসউদ্দিন মিলে যেভাবে তৈরি করেছিলেন ঈদের অ্যানথেম ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’

জনপ্রিয় শিল্পী আব্বাসউদ্দিন একদিন নজরুলের কাছে গিয়ে বললেন, ঈদকে কেন্দ্র করে একটি গান লিখে দিন। 

সময়টা তখন খ্রিস্টিয় ১৯৩১ সাল। অবিভক্ত ভারতবর্ষে মুসলমানদের উৎসবকে ঘিরে জনপ্রিয় বাংলা গান প্রায় ছিলই না। 

কাজী নজরুল প্রথমে একটু সন্দিহান ছিলেন।

“এই গান কে শুনবে? আর এইচএমভি তো আমার ইসলামি গান রেকর্ড করবে না”, আব্বাসউদ্দিনকে সেদিন বলেছিলেন নজরুল।  

তবে আব্বাসউদ্দিন হাল ছাড়েননি। নিজেই রেকর্ড কোম্পানিকে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। অবশেষে হিজ মাস্টার্স ভয়েস বা এইচএমভি সম্মত হয়। নজরুল গবেষক নাসিম আহমেদের বয়ানে উঠে এসেছে ঐতিহাসিক সেই ঘটনাপ্রবাহ। 

এরপরের ঘটনাও গল্পের মতো। সেই ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের ছেলে মুস্তাফা জামান আব্বাসির এক সাক্ষাৎকারে। 

“আব্বা নজরুলকে বলতেন কাজিদা। একদিন নজরুল বললেন, পান নিয়ে আসো আর চা। আব্বা অনেকগুলো পান এনে দিলেন। তারপর নজরুল কাগজ নিয়ে বসেই গানটি লিখে ফেললেন” - সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন মুস্তাফা জামান আব্বাসি।

গান লেখা শেষ করে নজরুল নাকি মজা করে বলেছিলেন, “সুরটা এখনই করব, না পরে করব?”

আব্বাসউদ্দিন সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, “এখনই করেন কাজিদা।” 

সেই মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যায় সুর।

কাজী নজরুল ইসলাম

নজরুল গবেষক নাসিম আহমেদ আলাপকে বলেন, ১৯৩১ সালের শেষের দিকে গানটি লেখা হয়। প্রকৃত তারিখ পাওয়া যায়নি।

তখনকার রেকর্ড করা গ্রামোফোন ডিস্কে দুইপাশে দুটি গান ছিল। সেই রেকর্ডটির একপাশে ছিল ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি। আরেকপাশে ছিল ‘ইসলামেরই সওদা লয়ে  এলো নবীন সওদাগর।’

নাসিম আহমেদ বলেন, দুটি গানের কোনোটিই আকাশবাণী বেতারকেন্দ্রে কখনো বাজানো হয়নি। রেকর্ড আকারে বাজারে আসে এবং প্রচুর বিক্রি হয়েছিল।

“বিপুল, বিপুল এবং বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।”

নাসিম আহমেদের ভাষায়, প্রথমে নজরুল ভেবেছিলেন, যে এই গান কে শুনবে? কিন্তু  বাজারে আসার পর  ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে।

সেই থেকে শুরু। আজ প্রায় একশো বছর পর আজো ঈদের চাঁদ উঠলেই বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের মনে ভেসে ওঠে একটি সুর “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”।

চাঁদ দেখার ঘোষণা আসে মসজিদের মাইকে। মুহূর্তেই টেলিভিশন, রেডিও, সোশ্যাল মিডিয়া- সবখানে যেন ছড়িয়ে পড়ে সেই সুর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঈদের সকাল মানেই এই গান। কেউ নতুন জামা পরে শুনেছে, কেউবা প্রবাসে বসে এই সুরে খুঁজে পাচ্ছে নিজের বাড়ির গন্ধ।

সময় বদলেছে। ঈদের প্রস্তুতি বদলেছে, গান শোনার মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম এর লেখা আর আব্বাস উদ্দিন আহমেদের কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই গানটি আজো ঈদের আবেগের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে, যেন ঈদ আর এই সুর একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঈদ মানেই যেন এই সুর, এই গান। সন্ধ্যয় ঈদের চাঁদ দেখা গেছে এমন ঘোষণার সাথে সাথেই পাড়ায় মহল্লায় প্রথমেই শোনা যায় হৈ হুল্লোড়। আর তার পরপরই টেলিভিশন ও রেডিওতে বেজে ওঠে এই গানটি।

নজরুল-আব্বাসউদ্দিন রসায়ন

মুস্তফা জামান আব্বাসি বলেন, আব্বাসউদ্দিন বয়সে একটু ছোট হলেও দু জনের সম্পর্ক বন্ধুর মতোই ছিল।

আব্বাসউদ্দিন আহমেদ

আব্বাসউদ্দিন আহমেদের স্মৃতিকথা উল্লেখ করে তার ছেলে বলেন, “সেই সময়কার রেকর্ড কোম্পানি এইএমভির কর্মকর্তা ভগবতী ব্যানার্জি তখন বলেছিলেন, ‘আব্বাস সাহেব মুসলমানদের পয়সা নেই। তারা রেকর্ড কিনতেও পারবে না। পুজোর সময় গান বিক্রি হয়। ঈদের সময় কোন গান বিক্রি হবে না।"

কিন্তু আব্বাসউদ্দিন রাজি করিয়েছিলেন এইচএমভির কর্তাকে।

গানটি প্রথম গেয়েছেন আব্বাসউদ্দিন নিজেই। লেখার কদিন পরেই রেকর্ড করা হয়েছিলো।

ঈদের থিম সং

গানটি ১৯৭০ এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশে জনপ্রিয় হতে থাকে। বিশেষ করে তখন রেডিও ও টেলিভিশনে ঈদকে কেন্দ্র করে এই গান বাজানো হয়।

“১৯৭০ থেকে ২০২৬। এখন পর্যন্ত এটি ঈদুল ফিতরের থিম সং” - বলছিলেন নাসিম আহমেদ।

তবে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, ৭০ দশক নয়, গানটি যখন থেকে মুক্তি পেয়েছে তখন থেকেই তুমুল জনপ্রিয়।

আলাপকে তিনি বলেন, “এটা আসলে পপুলার হয়ে যায় কারণ ওই সময় মুসলমানদের উৎসবকেন্দ্রিক ইসলামিক গান ছিল না। এই গান দিয়েই  একটা ইসলামিক পুনর্জাগরণমূলক গান হয়।

“অবিভক্ত ভারতবর্ষে মুসলমানরা ইন্টালেকচুয়ালি তেমন অবস্থানে ছিল না। সেরকম একটা পরিস্থিতিতে তখন এই গানটা পপুলারিটি লাভ করে।”

এই গানটির কারণে তখন মুসলিমদের যে সঙ্গীত এবং সাহিত্যের প্রতি যে তাদেরও আগ্রহ এবং মনোযোগ সেটার দারুণ একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটে বলে উল্লেখ করেন নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক।

“এই গানের মধ্যে দিয়ে একটা মুসলিম পুনর্জাগরণ ঘটেছে।”

নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক বলেন, “প্রথম রিলিজের পরপরই এটা একটা অপরিহার্য ঈদের গানে পরিণত হয়। এই গান ছাড়া ঈদ চিন্তাই করা যায় না।”

নজরুল গবেষকরা বলছেন, “অন্য এলাকায় মুসলিমরা গান করলেও বাঙালি মুসলিমের কাছে সঙ্গীত ছিল অপাঙক্তেও। কিন্তু এই গানটিতে ধর্মীয় ভাবধারা আর ঈদের যে খুশি সেটা খুব চমৎকারভাবে ধরা পরেছে।”

সেই থেকে এই গানের শুধু উত্থানই হয়েছে। এমনকি অমুসলিম শিল্পী সতিনাথ মুখার্জিসহ আরো অনেকের কণ্ঠে শোনা গেছে গানটি।

গানটিকে ধীরে ধীরে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতার। ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই এই গানটি বাজানোর একটি রীতি প্রচলন করেছে সরকারি এই দুটি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান।

মুস্তাফা জামান আব্বাসির ভাষায়, গানটি জনপ্রিয় করেছে বাংলার মুসলমান। তার মতে, আব্বাস উদ্দিন মারা গেছেন ১৯৫৯ সালে। তার পরে এত বছর বাংলার মুসলমানরা এই গান গেয়ে গেছেন। আব্দুল আলিম, আব্দুল হালিম চৌধুরী, বেদার উদ্দিন আহমেদ, সোহরাব হোসেনদের নামও উল্লেখ করেন তিনি।