ভোলার বোরহানউদ্দিনের ছোট ব্যবসায়ী পলক মিঞা তার সাত পুরুষের জমি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। নিম্ন আদালতে মামলা চলাকালে তিনি বাংলায় সাক্ষ্য দেন, কাগজপত্র বোঝেন, বিচারকের প্রশ্নের জবাব দেন। কিন্তু বিচারকের রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে তাকে আসতে হয় ঢাকার উচ্চ আদালতে।
মামলা যখন উচ্চ আদালতে যায়, হঠাৎ বদলে যায় দৃশ্যপট। নিজের জীবন, নিজের জমি ও তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু ভাষা তার নাগালের বাইরে। পলক সাহেবের চোখে পলক পড়ে না, কোর্টরুমে বসে থাকেন কেবল।
প্রথমেই মামলার ড্রাফটিং বা আরজি ইংরেজিতে, এরপর আইনজীবীদের তর্ক তাও ইংরেজিতে, রায়ের খসড়া যেটা সেটাও ইংরেজি। সবশেষ আদালতের আদেশ সেটাও আসে ইংরেজিতে।
জানালেন প্রতিবার শুনানি শেষে আইনজীবী যা বুঝিয়ে দিয়েছেন, সেটুকুই ছিল তার ভরসা। আর মামলার রায়ের দিন তিনি কেবল জেনেছেন এখানেও হেরেছেন তিনি।
তার ভাষায়, “বিচার হয়েছে কিন্তু আমি বুঝি নাই কিছুই। উকিল সাহেব বলছে আমি হারছি।”
সহজ সরল প্রশ্ন তার “তাহলে এটা আমার বিচার ক্যামনে হইল?”
তার এই প্রশ্নটি শুধু একজন সাধারণ বাঙালির নয়; এটি ন্যায়বিচারের ভিত্তি, মানবাধিকারের প্রশ্ন- এই বিচার বুঝতে না পারাকে ‘অমানবিক’ বলছেন বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।
“নিজ দেশে বসে আমার বিচার হচ্ছে অথচ আমি সেটা বুঝতে পারছি না। এটা অমানবিক,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
বিচার কেন মাতৃভাষায় হওয়া জরুরি?
ভাষা শহিদরা বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু ঘর বা বাজারে বাংলা বলার অধিকার চাননি। তারা চেয়েছিলেন শিক্ষা, প্রশাসন, রাষ্ট্রপরিচালনা এবং আদালত সবখানে বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হোক।
কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও দেশের সব ধরনের আদালতে এখনও বাংলা ভাষার প্রচলন শুরু করা যায়নি।
অথচ ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত হলো বিচারপ্রার্থী যেন বুঝতে পারেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, আদালতে কী যুক্তি উঠছে, রায়ে কী বলা হচ্ছে।
ভাষা বোধগম্য না হলে তিনি মূলত নিজের মামলার সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন না বলে মনে করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মারিয়া তানজিমাৎ।
“বিষয়টি এমন আপনি জেল খাটছেন কিন্তু কেন, কীভাবে আপনি দোষী সাব্যস্ত হলেন; কোর্টে পুরো বিচারকার্য চলার সময় আপনি উপস্থিত থেকেও তার কিছুই বুঝতে পারছেন না,” আলাপকে বলেছেন তিনি।
এটা শুধু বাংলা ভাষার বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের উপজাতিগোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রেও সত্যি বলে মনে করেন তিনি।
'আমি বাঙালি না চাটগাঁইয়া'
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য সমস্যা আরও জটিল। তারা অনেকেই বাংলায়ও পুরোপুরি সাবলীল নন, ইংরেজি তো দূরের কথা।
এমনকি স্থানীয় ভাষাও এখানে বিবেচনা করা যেতে পারে।
যেমনটা একবার দাবি করেছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
মানবতাবিরোধী অপরাধের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সংসদ সদস্য ছয় দিন ইংরেজিতে সাক্ষ্য দেওয়ার পর সপ্তম দিনেও যখন তিনি ইংরেজিতে কথা বলছিলেন আর তাতে কোর্টের সময় ব্যয় হচ্ছিল বেশি তখন ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবীর তাকে বাংলায় সাক্ষ্য দিলে সময় কম লাগত এবং বেশি কথা বলতে পারতেন বলে মন্তব্য করলে তার উত্তরে সাকা চৌধুরীর বলেছিলেন, “আমি বাংলায় সাক্ষ্য দিতে পারবো না, ইংরেজিতেই দেবো। কারণ, আমি বাঙালি না চাটগাঁইয়া। বাংলায়তো আমি ভালো বলতে পারতাম না। টেকনিক্যাল প্রবলেম হতো।”
মানবিক অধিকার
বিচার কেবল প্রদান করলেই হয় না, তা বোঝার সুযোগও নিশ্চিত করতে হয়।
‘ইন্টারন্যাশনাল কভিন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস’-এর ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এমন ভাষায় অভিযোগ জানাতে হবে যা তিনি বোঝেন এবং প্রয়োজনে দোভাষীর সহায়তা দিতে হবে।
অর্থাৎ, বিচার বোঝার অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ভাষা যদি প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
‘ইউনিভার্সাল ডিকলারেশন অন হিউম্যান রাইটস’-এর ১০ নম্বর অনুচ্ছেদেও ন্যায্য ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু ভাষা বোঝা না গেলে সেই অধিকার কার্যকর থাকে না বলেই মনে করেন মারিয়া তানজিমাৎ।
আইনের শাসনের মৌলিক নীতি আইন সবার জন্য সমান এবং বোধগম্য। যদি রায় ও আদেশ এমন ভাষায় হয় যা অধিকাংশ মানুষ বোঝেন না, তাহলে আইন ও জনগণের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয় হতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পলাশ কান্তি দাশ।
তিনি আলাপকে বলেন, “বাংলাদেশে নিম্ন আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার মোটামুটি সবটাই এখন বাংলাতে হয়। কিন্তু সমস্যা হয় উচ্চ আদালতে। এখানে কিছু কিছু বেঞ্চ বাংলায় হিয়ারিং ও অর্ডার পাস করলেও বেশিরভাগ বেঞ্চই এটা হয় না।”
কোন কোন আইনজীবী যারা খুব ভালো ইংরেজি জানেন না তাদেরকে কোনো বিচারক সরাসরি তাদের কোর্টে মামলা পরিচালনা না করার নির্দেশ দেন বলেও জানান তিনি।
তার ভাষায়, “শুধু বিচারপ্রার্থী নয়, অনেক সময় অনেক আইনজীবীও ভালো ইংরেজি না জানার কারণে অনেক বেঞ্চ থেকে মামলা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ পান। আর সেটাও তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় ইংরেজিতেই।”
আদালত আইনজীবী নিয়োগ দিলেও দোভাষীর বিষয়টি সেভাবে বিবেচনা করতে পারে না এবং এটি বিচারপ্রার্থীকে করতে হয় বলে তা খরচের বলেও মন্তব্য করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মারিয়া তানজিমাৎ।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের এখানে অনুবাদক বা দোভাষীর কোনো স্ট্রাকচার তৈরি হয়নি। তা ছাড়া আইনের অনেক বিষয়েই ইংরেজি করা সম্ভব না।”
বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্পষ্টীকরণ করা হয়েছে। সংবিধানে বলা হয়েছে যে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।
তবে “জুডিশিয়াল ভাষা রাষ্ট্রের ভাষা কাভার করে না”, তাই সংবিধানে বলা হলেও এটা বাস্তবায়ন করা কঠিন বলেই মনে করেন মারিয়া।
উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজ দেশের আদালতে দাঁড়িয়ে কেউ যেন নিজেকে বিদেশি মনে না করেন তার সমাধান জরুরি বলেই মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক।
তিনি বলেন, “সরকারকে বসে চিন্তা ভাবনা করতে হবে অধিকার কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। এজন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে উপায় বের করতেই হবে।”
আইনি প্রক্রিয়া বিলাসিতা নয়; এটি আইনের শাসনের ভিত্তি। তাই মাতৃভাষায় যে কারো বোঝার অধিকার রয়েছে তিনি ন্যায়বিচার পেলেন কিনা।