পুকুরে জলপরী, চাঁদে সাঈদী: অবিশ্বাস্যকে বিশ্বাস করা কি শুধু বাংলাদেশিদের বৈশিষ্ট্য?

এই লেখাটি পড়ার ত্রিশ মিনিটের মধ্যে দশজনের সাথে শেয়ার করলে আজকেই বড় কোনো একটা সুখবর পেয়ে যাবেন। আর শেয়ার না করলে আগামী দশ বছর দুর্ভাগ্যেই কেটে যাবে।

এমন মেসেজ নিশ্চয়ই কখনো না কখনো ফেইসবুক, মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। অনেক বছর আগে নতুন নতুন ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট খোলার পর হঠাৎ করেই কেউ ফরওয়ার্ড করে দিতেন এমন মেসেজ। একদম পরীক্ষার আগের দিন তাও। চিন্তায় তখন মাথায় ঘাম ঝরতো, যদিও এটা বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব না তা সবারই জানা, তাও উদ্বেগ কাজ করতো, যদি কোনো না কোনোভাবে মিলে যায়?

এমন অলৌকিক এবং অবিশ্বাস্য বিষয় বিশ্বাস করে ফেলার প্রবণতা ঘনঘনই দেখা যায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে। তাই অসুখ সারাতে দ্বারস্থ হতে হয় ঝাড়ফুঁকের, চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় গর্ভবতী হলে বের হওয়া যায় না, গাছে থাকে ভূত-প্রেত, সেতুর পিলার বসাতে প্রয়োজন হয় বাচ্চাদের মাথা, চাঁদে দেখা যায় বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের মুখ, পুকুরে দেখা যায় জলপরী, এবং মাকে ভালোবাসলে পোস্টে কমেন্ট করতে হয়। কোথা থেকে আসে অবিশ্বাস্যকে বিশ্বাস করার এই প্রবণতা? আর এটি কি শুধু বাংলাদেশের মানুষের সহজাত কোনো বৈশিষ্ট্য?

আলেয়া, নিশির ডাক, জলপরীর উৎপত্তি ও বাংলার মিথ

সম্প্রতি নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার এক গ্রামে ‘পুকুরে জলপরী দেখা গেছে’ এমন গুজব ছড়িয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের ভিডিওতে দেখা গেছে, আশেপাশের গ্রাম থেকে শত শত মানুষ সেই পুকুরের পাশে ভিড় করছে জলপরী দেখতে। এই বিষয়ে নানা ভিডিও বানানো শুরু করেছে নানা প্ল্যাটফর্মের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। অবস্থা এমন দিকে গেছে যে, গুজব ছড়ানোর ব্যাপারে সতর্ক করে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাছে মুচলেকাও নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

জলপরীর ধারণা যে প্রথম নরসিংদীর মানুষের মাথায় এসেছে তা না। প্রাচীন গ্রিসের গান গেয়ে নাবিকদের পথ ভোলানো সাইরেন থেকে শুরু করে ইংরেজ নাবিকদের মারমেইড, অ্যাসিরিয়ান-ব্যাবিলোনিয়ান সভ্যতার দেবী আতারগাতিস ও আরব্য রজনীর মৎসমানব পর্যন্ত, সারাবিশ্বের নানা সভ্যতার লোককথায় এমন কাহিনী আছে।

শুধু জলকন্যা না, বিভিন্ন সভ্যতার লোককথার মধ্যে অনেক ধরনের এমন প্রাণী আছে যা আমাদের আধুনিক উপলব্ধির কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। মৎস্যকন্যা যেমন অর্ধেক মানুষ অর্ধেক মাছ, তেমনি আছে ফন বা অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক ছাগল। আছে সেন্টর যা অর্ধেক মানুষ ও অর্ধেক ঘোড়া। আছে মিনোটর, বা ষাঁড়ের মাথাওয়ালা মানুষ।

এমন অর্ধেক পশু আর অর্ধেক মানুষের মতো জীব না হলেও অনেককিছুই আছে এই অঞ্চলের লোককথায়ও। শাকচুন্নি, মেছো ভূত, গেছো ভূত, মামদো ভূত, এগুলোর কথা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই ছোটোবেলায় জেনেছে মায়ের কাছে নয়তো গল্পের বইয়ের পাতায়। এগুলো এখন বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ছোটবেলার গল্প, বাচ্চাদের ভয় দেখানোর যন্ত্র বা ঠাকুমার ঝুলির চরিত্র। তবে এমন অনেক কাহিনি আছে, যা এখনো মানুষ বিশ্বাস করে। যেগুলোকে বলা হয় ‘আর্বান লেজেন্ড’।

‘নিশি শুধু দুইবার ডাকে’ হয়তো এই গল্পটি কোনো দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা করতে তৈরি হয়েছিলো। একটি আর্বান লেজেন্ড অনুযায়ী, ‘নিশি’ নামের এক অশরীরী সত্তা কোনো এক পরিচিত ব্যক্তির কণ্ঠ অনুকরণ করে ঘর থেকে বের করে দূরে কোথাও নিয়ে হত্যা করে। কিন্তু এই নিশি আবার দুইবারের বেশি কাউকে ডাকতে পারে না। তাই বলা হয়, রাতের বেলা গ্রামে চলাচল করার সময় কেউ দুইবারের বেশি না ডাকলে তাতে সাড়া না দিতে। কারণ নিশি শুধু দুইবার ডাকে।

এরপর আছে আলেয়া। পুকুরের তলায় পচে যাওয়া জৈব পদার্থ থেকে নিষ্কৃত দাহ্য গ্যাস দ্বারা তৈরি আলো, যা দেখে গ্রামবাংলার মানুষের কল্পনায় তৈরি হয়েছে ভূতের আলোর গল্প। শুধু পুরোনো সময়ের বা গ্রামের মানুষই না, শহরের মানুষের মুখেও এসব কাহিনি শোনা যায়।

এগুলো তো ভূত-প্রেতের গল্প বা রূপকথা। এছাড়া অনেক ধরনের অলৌকিক বিষয়ে আধুনিক শহুরে মানুষকে বিশ্বাস করতে দেখা যায়। এর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো হাতের রেখা দেখে মানুষের ভাগ্য বলে দেওয়া। জ্যোতিষীকে দিয়ে হাত দেখিয়ে ভবিষ্যৎ জানার কায়দায় অনেকেই এখনো বিশ্বাস করেন। যেই কারণে বসুন্ধরার যমুনা ফিউচার পার্কের ভেতরেও একটি জ্যোতিষীর কার্যালয় আছে।

এছাড়া, বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় আচার ও নিয়মকানুনের বিভিন্ন রকম বোঝাপড়ার কারণেও অনেক ধরনের চর্চার উদ্ভব হয়। যেমন, বিভিন্ন সুরা পড়ে ফুঁ দেওয়া পানি পান করে বা কোনোকিছু লিখা কাগজ তাবিজে ভরে তা পরে নির্দিষ্ট ফলের আশা করা।

এটা শুধু বাংলার মানুষের অভ্যাস না

এমন জিনিস যে শুধু বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে, তা বললে ভুল হবে। 

২০১২ সালে ভারতে যিশুর এক মূর্তির পা থেকে টপ টপ করে পানির ফোঁটা পড়তে থাকে। এটিকে ‘হোলি ওয়াটার’ বা পবিত্র পানি ভেবে মানুষ পাতে ভরে তা পান করতে শুরু করে। পরে জানা যায়, এটি কাছের একটি আটকে যাওয়া টয়লেটের পানি। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে একটি প্রতিবেদনও হয়েছিলো তখন।

এর আরও অনেক বছর আগে ১৯৯৫ সালে ভারতের নয়াদিল্লির এক মন্দিরে এক পূজারি দাবি করেন, তিনি গণেশের মূর্তির সামনে এক চামচ দুধ ধরার পর হঠাতই সেই দুধ গায়েব হয়ে যায়, যেন দেবতা গণেশ দুধ পান করে নিয়েছিলেন। এই খবর ছড়ানোর পর ভারতসহ সারাবিশ্বের বিভিন্ন মন্দিরে দুধ হাতে মানুষের ভিড় পড়ে যায়। তবে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, তাদের মন্দিরের গণেশের মূর্তি দুধ পান করছেন না।

এমন ঘটনা শুধু এই উপমহাদেশেরই না, অনেক সময়ই ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মানুষকে সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করতে দেখা যায়, যেখানে যিশুর চেহারা দেখা গেছে। হয়তো কোনো একটি টোস্ট বা পিৎজা একটু অস্বাভাবিকভাবে পুড়েছে, কোনো দরজা বা রাস্তায় অস্বাভাবিকভাবে রং উঠেছে, সেখানেই তারা খুঁজে পান যিশু খ্রিস্টের চেহারা।

এছাড়া আমেরিকায়ও আছে নানারকমের আর্বান লেজেন্ড। হরিণ, কুকুর কিংবা মানুষকে হত্যা করে তাদের চামড়া গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ানো দৈত্য স্কিনওয়াকার নিয়ে নানা ফোরামে গল্প হয়, অনেকে তা বিশ্বাসও করে। এছাড়া আকাশে অস্বাভাবিক কোনো বস্তু, অস্বাভাবিক আকৃতির কোনো মেঘ বা আলো থেকে প্রসূত অজানা উড়ন্ত বস্তু বা ইউএফও'র গল্প তো আছেই।

এছাড়া পশ্চিমা বিশ্বের অনেক ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক বিশ্বাস করেন, মানুষ কখনো চাঁদে যায়নি, বরং পুরো জিনিসটা কোনো একটা স্টুডিওতে শুট করা ভিডিও। তারপর, পৃথিবীও নাকি আসলে গোলাকার না, বরং তা চ্যাপটা, এবং সূর্য পৃথিবীর চারপাশে নাকি ঘোরে।

বিশ্বাস যখন মানুষের ক্ষতি করে

এতক্ষণ যেসব গল্পগুজব, অন্ধবিশ্বাস, আর্বান লেজেন্ডের কথা বলা হলো, তার অনেকগুলো শুনতে সাবলীল শোনালেও, সবসময় এর ফলাফল এতটা সরল হয় না। অনেক সময় মানুষের ক্ষতি ডেকে আনে এমন বিশ্বাস।

২০১৩ সালের ২৮এ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে জামায়াত নেতা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হয়। সেদিন রাতেই একটি গুজব ছড়ায়, দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর চেহারা নাকি চাঁদে দেখা গেছে। সমসাময়িক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এমন দাবি প্রথম ছড়ানো হয়েছিলো ‘বাঁশের কেল্লা’ নামের একটি ফেইসবুক পেইজ থেকে।

বিভিন্ন এসএমএস এবং এমনকি মসজিদে মাইকিংয়ের মাধ্যমেও এই দাবি ছড়ানো হয়, এবং এই গুজবের জের ধরে হওয়া সহিংসতায় তিন দিনে সারাদেশে চল্লিশের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

২০১৯ সালে পদ্মা সেতুর নির্মাণ চলাকালীন সময় একটি গুজব ছড়ায়, পদ্মাসেতুর স্তম্ভ বসানো যাচ্ছে না কারণ নদী ক্ষিপ্ত। নদীর স্রোত শান্ত করে পদ্মা সেতুর স্তম্ভ বসাতে হলে মানুষকে বলি দিয়ে পানিতে তাদের মাথার খুলি ফেলতে হবে। এই গুজবের জের ধরে আরেকটি গুজব ছড়ায়, বিভিন্ন এলাকায় নাকি এই মাথার খুলি সংগ্রহ করতে একটি চক্র শিশুদের অপহরণ করছে। এক পর্যায়ে স্কুল থেকে বাচ্চাকে আনতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে একজন মা নিহত হওয়ার কথা সবারই হয়তো জানা।

অলৌকিক ঘটনার গুজবে বিশ্বাসের কারণে প্রাণনাশের ঘটনাও নতুন না, এবং পুরোনো দিনে এর ভুক্তভোগী বড় অংশেই ছিলেন নারীরা। আমেরিকায় ‘সালেম উইচ হান্ট’ একটি কুখ্যাত উদাহরণ। কোনো নারী এমন আচরণ করলে, যা সমাজের চোখে ‘অস্বাভাবিক’, তাকে ‘উইচ’ বা ডাইনি আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার রেওয়াজ ছিলো। ১৬৯২ থেকে ১৬৯৩ সালের মধ্যে দুই শতাধিক নারীকে ম্যাসাচুসেটসে ‘উইচ হান্টের’ অংশ হিসেবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

নারীদের ধরে পুড়িয়ে ফেলার কথা যখন বলা হচ্ছেই, ভারতবর্ষের সতীদাহ প্রথার কথা বাদ দেওয়া উচিত নয়, এক সময় বিধবা হিন্দু নারীদের স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর মরদেহের সাথেই পুড়িয়ে ফেলা হতো। এছাড়া, ‘জ্বিনের আছর’ থেকে মুক্তির জন্য ঝাড়ফুঁক, তাবিজ ব্যবহার ও মারধরের উদাহরণ বর্তমানেও দেখা যায়।

এসবকিছুর পর পুকুরে জলপরী দেখা, এবং শত শত মানুষের সেটা বিশ্বাস করার ঘটনা খুব স্বাভাবিক এবং সাবলীল লাগতে পারে। অনেক সময় মানুষ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের অভাবে এসব বিশ্বাস করে। অনেক সময় বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের ভিন্ন ভিন্ন বোঝাপড়ার কারণে এসব বিশ্বাস দানা বাঁধে। এমন বেশিরভাগ বিশ্বাসেরই বিজ্ঞানে কোনো ভিত্তি নেই, তবে সাবলীল রূপকথা বা লোককথায় বিশ্বাস করাতে হয়তো কোনো ক্ষতিও নেই।

এমন বিশ্বাস তখন ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, যখন তার কারণে মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন সময়ই আমার দ্বারস্থ হতে হবে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের।