মন্তব্য প্রতিবেদন

পোশাক থেকে বিদেশযাত্রা: নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কার?

“আসার সময় দেখলাম মাইয়ারা পিঠ দেখাইয়া শাড়ি পইড়া রাস্তায় ঘুরতেছে। আমি যদি পারতাম, আগে এই মাইয়াগো বাপ-মা রে পিটাইতাম।”

বক্তব্যটি ছিলো একজন শিক্ষকের। আর দিনটি ছিলো স্বাধীনতা দিবস। ছেলে-মেয়েরা কালচারাল প্রোগ্রামের জন্য সেজেগুজে এসেছে।

আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তার ২৫-৩০ জন শিক্ষার্থীর সামনে এমন মন্তব্য করলেন। অনেককে দেখলাম তার এই মন্তব্যর উপর মৌন সম্মতিও জানাচ্ছে।

আরেক দিনের ঘটনা। ১৫ বছর বয়সী আমার ছোট বোন দাঁড়িয়ে আছে উঠানে। এক চাচি এসে বললেন, “শুন, মা। ভালো বাড়ির মেয়েরা মাথায় কাপড় দেওয়া ছাড়া ঘর থেকে বের হয় না। লোকে খারাপ বলে।”

চাচিকে নিয়ে আমার বোনের অবশ্য কোনো অভিযোগই ছিলো না। শরীরের অন্য অংশের কথা মনে নেই তবে চাচি শাড়ি পড়ে মাথায় কাপড় দিতে ভুলেননি।

আরেকটা ঘটনা না বললে নয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুই বান্ধবী ফুচকা খাচ্ছি। এমন সময় এক ভদ্রমহিলা এসে বললেন, “জাহান্নামি তোরা। বুক, মাথা খালি। গায়ে ওড়না নাই। নির্লজ্জ, বেহায়ার দল। তোরা জাহান্নামি।” 

ফুচকার প্লেটটা হাতেই ছিলো। আমি আর আমার বান্ধবী দুজনই চুপ। উনি গজগজ করতে করতে চলে গেলেন, আর আমরা দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলাম। 

বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। কী এমন পরেছিলাম? একটা সাধারণ কুর্তি, জিন্স, কাঁধে ব্যাগ। যে পোশাকে আমি ক্লাস করি, অফিসে আসি, বাজারে যাই। অথচ কয়েক মিনিটের জন্য আমি ‘জাহান্নামি’ হয়ে গিয়েছিলাম।

এদের কেউ আসলে কোনো দলের সদস্য নন, কারও হাতে লাঠি ছিলো না। আমাদের চারপাশে যারা মোরাল পুলিশিং করেন, তারা এমনই সাধারণ মানুষ। তারা নিজেদের খারাপ মানুষ ভাবেন না। তারা ভাবেন, আমাদের ভালোর জন্যই বলছেন।

শিক্ষকের কথাটাই ধরি। তিনি বললেন, মেয়েদের বাবা-মাকে পেটাতে চান। অথচ ওই মেয়েরা শুধু শাড়িই পরেছিলো, সেজেছিলো। শাড়ি আমাদের নিজস্ব পোশাক, বাঙালির উৎসবের পোশাক। কিন্তু শাড়ি পরার ধরন নিয়েও আপত্তি। তাহলে আসলে সমস্যাটা পোশাক নিয়ে নয়। সমস্যা হলো, নারী নিজের শরীর নিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, এই সহজাত বিষয়টাও মেনে নিতে আমরা অনভ্যস্ত। আর এই অনভ্যস্ততার সংকট নারী-পুরুষ সবারই আছে। 

এখন ভাবি, ওই দিন আমি কী বলতে পারতাম। হয়তো শুধু বলতে পারতাম, “আপা, আমি কী পরবো সেটা আমার আর আল্লাহর ব্যাপার।” হয়তো শিক্ষককে বলতে পারতাম, “স্যার, ওরা তো শুধু শাড়ি পরেছে, অন্যায় তো করেনি।” হয়তো বলা হয়নি, কিন্তু পরের বার যে বলবো সে নিশ্চয়তাও দিতে পারছি না।

আপনি বাংলাদেশে থাকেন এবং একজন নারী, তাহলে আপনি পরিবার থেকে শুরু করে, স্কুল- কলেজ, রাস্তা-ঘাট, গণপরিবহন কোথাও না কোথাও ‘মোরাল পুলিশিংয়ের’ শিকার হয়ে থাকবেন। 

অনেকেই মনে করেন, তারা অন্যকে ‘ভুল’ থেকে শুধরে দিচ্ছেন, সমাজের শালীনতা রক্ষা করছেন কিংবা তার ভালোর জন্যই এমন করছেন। কিন্তু কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাস কি অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়? বিশেষ করে, প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারীর পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে তাকে অপমান বা বাধা দেওয়া কোনোভাবেই নৈতিকতার চর্চা হতে পারে না।

গত ৮ই অগাস্টের কথাই ধরুন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেপাল যাওয়ার জন্য গিয়েছিলেন তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। নেপালে একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা ছিলো তাদের। তাদের সঙ্গে ছিলো বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমানের টিকিট। তারপরও ইমিগ্রেশনে তাদের আটকে দেওয়া হয়।

সেই তিন নারী বলছেন, তাদের বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে পরিবারের সম্মতি আছে কি না এবং তারা বিবাহিত কি না এমন প্রশ্ন করা হয়েছিলো তাদের। এরপর তাদের আর বিমানে উঠতে দেওয়া হয়নি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশ যাওয়ার জন্য বৈধ কাগজপত্র কি যথেষ্ট নয়? তার সঙ্গে কি পরিবারের অনুমতিপত্রও থাকতে হবে? 

আইন কী বলে

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ বলছে, আইনে আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের অধীন প্রত্যেক নাগরিকের বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া এবং বাংলাদেশে ফিরে আসার অধিকার রয়েছে।

অর্থাৎ বিদেশ ভ্রমণ কোনো সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় হওয়ার কথা নয়। যদি কাউকে বিদেশ যেতে বাধা দেওয়া হয়, তার পেছনে আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে।

এই তিন নারীর তো বিদেশ ভ্রমণের যাবতীয় বৈধ ডকুমেন্টস ছিলো। তবুও কেন তারা যেতে পারলেন না? কোন আইনের ভিত্তিতে তাদেরকে যেতে দেওয়া হলো না? 

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। আর ২৮(২) অনুচ্ছেদে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে নারীর পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এ পাসপোর্ট দেওয়া, বাতিল বা জব্দ করার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির কথা বলা আছে।

বিষয়টি শুধু সংবিধানের ভাষায় আটকে নেই।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েও বলা হয়েছে, সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ নাগরিকের বিদেশ যাওয়ার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। এই অধিকার সীমিত করা যেতে পারে, তবে সেই সীমাবদ্ধতার জন্য আইনি ভিত্তি থাকতে হবে এবং তা আইন অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। 

অর্থাৎ রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতাও আইনের মধ্যে থেকেই প্রয়োগ করতে হয়।

কোনো নারী অবিবাহিত, এটি বিদেশযাত্রা বন্ধ করার আইনি কারণ কি না এখন হয়তো সেটিই খুঁজে বের করতে হবে।

পুলিশিং আর ‘মোরাল পুলিশিং’ 

রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব সমাজে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। 

এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন অনুযায়ী নজরদারি করে এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। অর্থাৎ, প্রচলিত আইন মেনে নাগরিকের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষাই পুলিশিংয়ের মূল উদ্দেশ্য। 

কিন্তু যখন কেউ আইন ভঙ্গের কারণে নয়, বরং অন্যের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নৈতিকতা কিংবা সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে তার জীবনযাপন না মেলার কারণে হেনস্তা বা নিয়ন্ত্রণের শিকার হন, তখন তা আর সাধারণ পুলিশিংয়ের মধ্যে পড়ে না। বরং ব্যক্তিগত নৈতিকতার ধারণা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া, পোশাক-আশাক ও চলাফেরা নিয়ে খবরদারি করা কিংবা সেই ধারণা না মানলে অপমান ও শাস্তি দেওয়ার প্রবণতাকে বলা হয় ‘মোরাল পুলিশিং’। 

নরসিংদী রেলস্টেশনে ২০২২ সালের ঘটনা। ভোরে নরসিংদী রেলস্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন এক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণী। পরনে ছিলো জিন্সের প্যান্ট ও টপস, সঙ্গে ছিলেন দুই তরুণ। এক নারী তার পোশাকে আপত্তি তোলেন, পরে আরও কয়েকজন সেই নারীর সঙ্গে যোগ দেয়। তরুণীর ওপর হামলার চেষ্টা হয় এবং তিনি দৌড়ে স্টেশন মাস্টারের কক্ষে আশ্রয় নেন।

২০২৫ সালে ঢাকার লালমাটিয়ায় দুই নারীকে প্রকাশ্যে ধূমপানের কারণে হেনস্তার ঘটনাও সামনে আসে। একদল পুরুষ শুধু তাদের গালিগালাজ করেই থেমে যাননি, রীতিমতো তাদের পোষাক নিয়েও টানাটানি শুরু করে দেন। 

এই ঘটনায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, প্রকাশ্যে ধূমপান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য নিষিদ্ধ এবং এটি অপরাধ। 

২০০৫ সালের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী ‘পাবলিক প্লেসে’ ধূমপান নিষিদ্ধ। আইনের বর্তমান সংজ্ঞায় সরকারি-বেসরকারি মালিকানা নির্বিশেষে জনসাধারণের সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য যেকোনো স্থান পাবলিক প্লেস। উদাহরণ হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, হাসপাতাল, আদালত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, শপিং ভবন, কমিউনিটি সেন্টার, পাবলিক টয়লেট, মেলা ইত্যাদি। এসব ভবনের বারান্দা, গেট, সামনে-পেছনের মাঠ ও বাগানও এর অন্তর্ভুক্ত। 

তবে রাস্তা বা ফুটপাত কি পাবলিক প্লেসের অংশ? আর যদি হয়েও থাকে তাহলে আইন অনুযায়ী বিচার হবে। রাস্তায় হেনস্তা কি বিচারের অন্তর্ভূক্ত? 

এখানেই শেষ নয়। ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী শাহবাগ থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির এক কর্মচারীর কাছে হেনস্তার শিকার হন। ওই ব্যক্তি ছাত্রীর পোশাক ও ওড়না নিয়ে মন্তব্য করেন এবং পোশাককে ‘অনুপযুক্ত’ বলেন। 

পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে যান। এর পর ‘নারায়ে তাকবির- আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিয়ে তার মাথায় পাগড়ি, গলায় একাধিক ফুলের মালা ও হাতে কোরআন দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। 

নারী হেনস্তার এসব ঘটনা এখন অনলাইনেও অহরহ। বিউটি রানী পালের ভিডিওই এর জলজ্যান্ত উদাহরণ। ২৩এ জুলাই তিনি নিজের ফেইসবুক পেজে একটি রিল ভিডিও দেন। ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেইসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশনে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন এক প্রবাসী তরুণ। কারণ, বিউটি রানী সেই তরুণের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করেননি।

এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে কেবল আমাদের সমাজের সার্বিক যাপনে গেঁড়ে বসা পুুরুষতান্ত্রিকতা কাজ করছে তাই নয়, নারীকে ক্ষমতার আওতায় নিয়ন্ত্রণে রাখার মনস্তত্বও রয়েছে।  

নারীর শরীর, পোশাক, চলাফেরা ও সিদ্ধান্তকে সমাজের, পরিবারের বা ‘পুরুষের’ নিয়ন্ত্রণযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়। নারী কী পরবে, কোথায় দাঁড়াবে, কী খাবে, কোন গানে হাঁটবে, সবকিছুর একটা সীমা এঁকে দেওয়া হয়। সেই সীমা পেরোলেই নারী হয়ে ওঠে ‘সমাজের জন্য হুমকি’, আর তাকে শাস্তি দেওয়া হয়ে দাঁড়ায় ‘নৈতিক দায়িত্ব’। দার্শনিক জুডিথ বাটলার যাকে বলেছেন ‘জেন্ডার পারফরমেন্স’, অর্থাৎ নারীকে নির্দিষ্ট ভূমিকায় অভিনয় করতে বাধ্য করা। 

তবে পিতৃতন্ত্র কেবল পুরুষের মনোভাব নয়, এটি এমন এক ভাবাদর্শ যা নারীর ভেতরেও ঢুকে পড়ে, ফলে নারীও অন্য নারীর ‘পাহারাদার’ হয়ে ওঠেন।

র‍্যাওয়ান কনেলের ‘হেজেমনিক মাসকুলিনিটি’র ধারণাও এখানে প্রাসঙ্গিক। যে পুরুষ নিজের জীবনের নানা ক্ষেত্রে ক্ষমতাহীন বোধ করে, সে নারীর ওপর কর্তৃত্ব খাটিয়ে নিজের পৌরুষ প্রমাণ করতে চায়। শাহবাগের ঘটনার পর অভিযুক্তকে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করে নেওয়া সেই মনোভাবকেই প্রকাশ্য সামাজিক স্বীকৃতি দেয়, যেখানে নারীকে হেনস্তা করা অপরাধ না হয়ে বীরত্ব হয়ে দাঁড়ায়। 

মোরাল পুলিশিংয়ের মূল সমস্যা নৈতিকতা নিয়ে নয়, ক্ষমতা নিয়ে। নৈতিকতার প্রশ্ন সত্যিই থাকলে তা সবার জন্য সমানভাবে খাটতো, ধূমপান বা পোশাক নিয়ে পুরুষকে একই কাঠগড়ায় তোলা হতো। কিন্তু প্রতিবারই নিশানা নারী, তাই এটি আসলে নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত রাখার একটি হাতিয়ার। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কারও ব্যক্তিগত নৈতিকতা প্রয়োগ করা নয়। তাই আইন ভাঙলে জরিমানা বা বিচারের পথই একমাত্র বৈধ পথ, আর সেই বিচারের অধিকার জনতার নয়, আইনের। যতদিন ‘কী পরলে বা কী করলে নারী নিরাপদ’ এই প্রশ্নের জায়গায় ‘কেন পুরুষ বা সমাজ নারীকে হেনস্তা করে’ প্রশ্নটি মূলধারায় না আসবে, ততদিন এই চক্র থামবে না। 

একজন নারী কি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়সে পৌঁছান না?

বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়সে একজন নারী ভোটার হন, জাতীয় পরিচয়পত্র পান, চাকরি করেন, কর দেন। আইনও তাকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত ধরে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নারীকে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। 

কিন্তু যেই প্রশ্ন আসে তিনি কী পরবেন, কোথায় যাবেন বা কার সঙ্গে যাবেন, সেখানেই বয়স আর গণ্য হয় না। তখন তার পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় কারও মেয়ে, কারও বোন, কারও স্ত্রী। যেন নারী কখনো পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ই না, সারাজীবন কোনো অভিভাবকের অনুমতির অপেক্ষায় থাকে। 

বিমানবন্দরের ঘটনায়ই আবার আসা যাক। তিন নারীর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি আমাকে ভাবায়, সেটি হলো বিদেশ ভ্রমনে তাদের বৈবাহিক অবস্থা কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?

একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ একা বিদেশে গেলে কি তাকে জিজ্ঞেস করা হয় আপনি বিবাহিত কি না? আপনার স্ত্রী বা পরিবারের অনুমতি আছে কি না? আপনার বাবা-মা জানেন কি না?

যদি এই প্রশ্নগুলো পুরুষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক না হয়, তাহলে নারীর ক্ষেত্রে কেন হবে?

একজন নারী অবিবাহিত, এই পরিচয় তাকে কম প্রাপ্তবয়স্ক করে না। একজন নারী একা ভ্রমণ করছেন, এটি তাকে আইনগতভাবে অপরাধি করে না।

‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার পরীক্ষা আর কত?

এ বছরেরই ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সয়লাব হয়ে যায় সোশ্যাল মিডিয়া। একটি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। বিদেশের কোনো একটি ক্লাবে একদল তরুণ-তরুণীকে নাচতে গাইতে দেখা যায়। বলা হয় সেই ছবি ও ভিডিওর একজন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান। 

এরপর জাইমা রহমান বিচারের কাঠগড়ায় আর ফেইসবুকে হাজার হাজার বিচারক। তাদের মধ্যে একজন তো বলেই উঠলেন, “ভেবেছিলাম জাইমা ‘ভালো মেয়ে’।” 

কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘ভালো মেয়ে’ আপনি বিচার করবেন কীসের ভিত্তিতে? আর আপনাকে বিচার করার দায়িত্ব কে দিলো? 

আমাদের সমাজে নারীর জন্য ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার একটি অলিখিত পরীক্ষা যেন সবসময় চলতেই থাকে।

কিন্তু ‘ভালো মেয়ে’ কে? 

‘ভালো মেয়ে’ কি সে, যে গান গাইতে পারবে না? নাচতে পারবে না? নিজের ইচ্ছেমতো পোষাক পড়তে পারবে না? একা ঘুরতে যেতে পারবে না? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দিবে না? 

একজন পুরুষের কাছ থেকে কি এমন ‘ভালো ছেলে’ হওয়ার পরীক্ষা নেওয়া হয়? তার পোশাক, চলাফেরা, বন্ধুত্ব বা ধূমপান নিয়ে কি একই কড়াকড়ি আছে? 

আমার দাদী বলতেন, “সোনার আংটি বাঁকাও ভালো।” মানে ছেলেদের ভালো হওয়ার জন্য শুধু ছেলে হয়ে জন্মানোই যথেষ্ট। 

তাছাড়া ‘ভালো ছেলে’ মানে সাধারণত পড়াশোনা বা চাকরিতে ভালো হওয়া, আর ‘ভালো মেয়ে’ মানে নিয়ন্ত্রণে থাকা। তারমানে এই ধারণা নৈতিকতার নয়, নিয়ন্ত্রণের। আপনি যে মেয়েকে নিয়ন্ত্রন করতে পারবেন না, সে মেয়ে ‘ভালো’ না। 

তাই আমার প্রশ্ন, এই পরীক্ষা আর কত? নাগরিক হিসেবে কারও অধিকার ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। সংবিধান কোথাও বলেনি, রাস্তায় হাঁটতে, বিদেশে যেতে বা নিজের পছন্দের পোশাক পরতে হলে আগে ‘ভালো মেয়ে’ সার্টিফিকেট লাগবে।

আইন থাকলে নৈতিকতার পাহারাদার কেন 

কেউ অপরাধ করলে রাষ্ট্রের আইন আছে। কেউ প্রতারণা করলে আইন আছে। কেউ মানবপাচারের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলে আইন আছে। কেউ আদালতের নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকলে তাকে বিদেশযাত্রা থেকে আটকানোর আইনি ব্যবস্থা আছে।

অর্থাৎ নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের হাতে আইনগত ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে কেন মোরাল পুলিশিং? আইন ও বিচারব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কিছু মানুষ কেন নিজেরাই অন্যের নৈতিকতার বিচারক হয়ে উঠতে চান? 

এর একটি কারণ, অনেকেই নিজেদের নৈতিক বিশ্বাসকে সবার জন্য প্রযোজ্য বলে মনে করেন। তাদের ধারণা, সমাজে কোনটি শালীন আর কোনটি অশালীন, তা নির্ধারণ করার এবং সেই নিয়ম না মানলে অন্যকে শাসন করার অধিকার তাদের রয়েছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সমাজে এটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া।

কিন্তু ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা সামাজিক রীতিনীতি নিজে থেকেই আইন হয়ে যায় না। কোনো আচরণ কারও কাছে অনৈতিক মনে হলেই তা অপরাধ হয়ে যায় না। 

আইন ও নৈতিকতার মধ্যে পার্থক্যটা এখানেই। আইন ভাঙলে তদন্ত ও বিচার হবে। কিন্তু মোরাল পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে মানুষ নিজেরাই অন্যের আচরণকে অপরাধের মতো বিবেচনা করেন এবং শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন।

কেউ প্রকাশ্যে ধূমপান করলে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সেই কারণে তাকে গালিগালাজ করা, পোশাক ধরে টানাটানি করা কিংবা শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অধিকার কারও নেই। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের, আর কাউকে শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের।

বাংলাদেশের সংবিধানেও নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। 

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ বা সুনামের ক্ষতি হয়– এমন ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। আর ৩৬ অনুচ্ছেদে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে নাগরিকের চলাফেরা ও দেশত্যাগের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। 

অর্থাৎ, রাষ্ট্রেরও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনি সীমা রয়েছে। সেখানে সাধারণ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ধারণা অন্যের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না।

তবে মোরাল পুলিশিং বন্ধ করার অর্থ সমাজে অন্যায় বা ক্ষতিকর আচরণ দেখেও চুপ থাকা নয়। বরং কোনো অনিয়ম বা অপরাধ চোখে পড়লে তা আইনসম্মত উপায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোই দায়িত্বশীল আচরণ। নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে, ভিন্ন মত ও জীবনযাপনের প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। 

নৈতিকতা কেবল অন্যের আচরণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতাকে সম্মান করাও নৈতিকতারই অংশ।

আমি কারও ধর্ম, বিশ্বাস বা পোশাকের বিরুদ্ধে নই। কেউ মাথায় কাপড় দিতে চান, দিন। কেউ দিতে চান না, তাতেও সমস্যা নেই। আমি শুধু চাই, এই সিদ্ধান্তটা যেন প্রতিটি নারী নিজেই নিতে পারেন, কারও ভয়ে নয়।

আমার ছোট বোন একদিন বড় হবে। আমি চাই না, সে এমন একটা বাংলাদেশে বড় হোক যেখানে ফুচকা খেতে দাঁড়ালেও তাকে ‘জাহান্নামি’ শুনতে হয়।