শনিবার পহেলা অগাস্ট বেলা সাড়ে বারোটা। সমুদ্রের ওপর তখন উড়ছেন শৌভিক রায়, খুলনার এক পর্যটক, রঙিন প্যারাসুটের নিচে ঝুলে থাকা হার্নেসে বাঁধা শরীর। হঠাৎ ছিঁড়ে যায় সেই হার্নেস। ওপর থেকে সমুদ্রে ছিটকে পড়েন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা যা দেখেছেন, তা এক মুহূর্তের ঘটনা, কিন্তু তার পরিণতি অপরিবর্তনীয়। গুরুতর আহত শৌভিককে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। পরিবারের কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার মডেল থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী আলাপ-কে বলেন, "ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। প্রাথমিকভাবে আমরা সন্দেহ করছি, প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের অবহেলায় পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পুরো ঘটনায় কারা কীভাবে দায়ী, তা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে পরিষ্কার হবে।"
শৌভিকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা রেকর্ডের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।
এর আগেও ঘটেছে দুর্ঘটনা
২০২১ সালের ১৬ই মে, দরিয়ানগর পয়েন্টে প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক গতিতে চলছিল প্যারাসেইলিং। দিনের শেষভাগে ছন্দপতন ঘটে। উড়ন্ত প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে মারাত্মক আহত হন এক নারী পর্যটক, দুই পা ও কোমরে গুরুতর আঘাত পান তিনি। অভিযোগ ছিল, প্যারাসেইলিংয়ের নির্ধারিত সময় বেলা তিনটা, অথচ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সন্ধ্যা ছয়টায় রাইড নিয়ন্ত্রণ করছিলেন এক অদক্ষ অপারেটর।
চার বছর পর, ২০২৫ সালের ২০শে মে, প্যারাসেইলিং করার সময় নিচে পড়ে মারাত্মক আহত হন এক পর্যটক দম্পতি। সে সময় দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টসের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে জেলা প্রশাসন।
মাত্র তিন মাসের মাথায়, একই বছরের ৩০এ অগাস্ট, অদক্ষ হাতে পরিচালিত আরেকটি রাইডে ঝাউ গাছে আছড়ে পড়েন এক পর্যটক। বেশ কিছু সময় গাছে ঝুলে থাকার পর তাকে উদ্ধার করা হয়। এবারের অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টসের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। তবে কিছুদিন পরই আবার শুরু হয় তাদের কার্যক্রম।
এই তিনটি ঘটনাতেই দুর্ঘটনার পর প্রশাসন কয়েক দিনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়, কখনো কখনো সরঞ্জাম জব্দ করে, তারপর কিছুদিন পর আবার শুরু হয় কার্যক্রম। একাধিক এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের অবহেলার কারণেই বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটছে, কারণ এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি শাস্তির আওতায় আসেনি।
যে গাইডলাইন কেউ মানছে না
দরিয়ানগরসহ সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই প্যারাসেইলিং ব্যবসা চালাচ্ছে। কখনো কখনো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতেও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কার্যক্রম চালু রাখা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এখানে কোনো আন্তর্জাতিক গাইডলাইনই অনুসরণ করা হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কক্সবাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, কোনো প্রতিষ্ঠানই আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখে না। প্রশিক্ষিত জলযান নেই, উদ্ধারকারী দল নেই, আর এই স্পর্শকাতর রাইড চালানো হয় অদক্ষ অপারেটর দিয়ে। তার ভাষায়, “এভাবেই ঘটে চলেছে একের পর এক মৃত্যু।“
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান আলাপ-কে বলেন, “পর্যটক মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যাশিত নয়। প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মের তোয়াক্কা করছে না, এই ধরনের রাইড পরিচালনায় অবশ্যই আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে চলতে হবে।“
জেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান আলাপ-কে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন ঠিক কী, তা তার জানা নেই। এ নিয়ে কাজ করে আলাদা একটি কমিটি। তবে কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।
ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) নাদিয়া ফারজানা আলাপ-কে জানান, প্যারাসেইলিংয়ে অনিয়মের বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিকে অবহিত করা হয়েছে। ট্যুরিজম নিরাপত্তার বিষয়টি তারা দেখেন এবং সাম্প্রতিক ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রম চালানোর বিপক্ষে নন পর্যটক বা স্থানীয়দের অনেকেই। তবে তাদের একটাই দাবি, রাইড শুরু করার আগে শতভাগ নিরাপত্তা, বিশেষত আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে চলা নিশ্চিত করা হোক।