শ্রম আইনের মামলায় গ্রেফতার হওয়া নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্রসহ চার আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
গণমাধ্যমে প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের সাবেক এক কর্মীর পাওনা ২৩ লাখ টাকা। এ ঘটনার মামলায় শ্রম আদালতের রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় জারি হয়েছিল গ্রেফতারি পরোয়ানা। প্রায় দেড় মাস পর ২৩এ জুন রাতভর পুলিশি অভিযান শেষে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাজেদুল ইসলাম শুভ্র। যদিও গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পরই পেয়েছেন জামিন।
নাভানা গ্রুপের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মো. সাজেদুল ইসলাম শুভ্র নাভানা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শফিউল ইসলাম কামালের ছেলে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের থেকে পড়াশোনা শেষ করে ২০০৩ সালে দেশে ফিরে পরিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। বর্তমানে তিনি নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “শ্রম আদালতের নির্দিষ্ট ওয়ারেন্টের ভিত্তিতেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সকাল সাড়ে সাতটায় গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে সাজেদুল ইসলাম শুভ্রকে আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে তার জামিন মঞ্জুর করেন আদালত।”
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, একই মামলার আরও তিন আসামি জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে তাদেরও জামিন মঞ্জুর করেন আদালত।
কেন গ্রেপ্তার হলেন
বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের সাবেক একজন কর্মীর বকেয়া মজুরি ও পাওনা আদায়ের দাবিতে ঢাকার প্রথম শ্রম আদালতে প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষ ও শীর্ষ কর্মকরতাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ৮ই মে শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান (জেলা ও দায়রা জজ) মোহাম্মদ গোলাম আযম বাদীর পক্ষে রায় দেন।
রায়ে বাদীর সব পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে আদালত নির্দেশনা দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হলে বাদী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
কিন্তু আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ না করায় ২০২৬ সালের ৩ মে নাভানা গ্রুপ ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্রসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। একইসঙ্গে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাকে পরোয়ানা কার্যকরের নির্দেশও দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে নাভানা গ্রুপের প্রতিক্রিয়া জানতে প্রতিষ্ঠানটির অফিসিয়াল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
রাতভর পুলিশি অভিযান
২৪এ জুন ভোরের দিকে বনানীর একটি আবাসিক ভবন থেকে সাজেদুল ইসলাম শুভ্রকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে ২৩এ জুন দিবাগত রাত থেকেই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল ভবনটি ঘিরে রাখে এবং বনানী থানা পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান আলাপ-কে জানান, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে ২৩এ জুন রাত ১১টার দিকে বনানীর ১৫ নম্বর রোডের ৫৪ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে আত্মগোপনে ছিলেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র।
তিনি আরও বলেন, অভিযানের সময় সাজেদুল ইসলামের গাড়িচালক ও দেহরক্ষীরা উগ্র ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন। নিরাপত্তাকর্মীরা ভবনের মূল গেটে তালা লাগিয়ে রাখে এবং গেট খুলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ভবনে প্রবেশ করতে পারেনি।
পরে রাতভর ভবনের বাইরে অবস্থান করার পর ২৪এ জুন সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দেড় মাস আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এমন প্রশ্নের উত্তরে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান আলাপ-কে জানান, “গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর থেকেই আসামিদের ধরার চেষ্টা অব্যাহত ছিলো।”
“২৩এ জুন পুলিশের কাছে খবর আসে বনানীর একটি ভবনে অবস্থান করছেন ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্র। পরে আমরা সেখানে গিয়ে আটক করার চেষ্টা করি”, জানান তিনি।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জামিন নিয়ে প্রশ্ন
ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাজেদুল ইসলাম শুভ্রকে গ্রেপ্তার করে আদালতে নিলে জামিনের আবেদন করেন। আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন।
জামিনের বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান আলাপ-কে বলেন, “সাধারণভাবে শ্রম আইন-সংক্রান্ত অধিকাংশ অপরাধ জামিনযোগ্য অথবা এমন প্রকৃতির হয় যেখানে আদালতের জামিন দেওয়ার এখতিয়ার থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “আদালত সাধারণত অভিযোগের প্রকৃতি, সর্বোচ্চ শাস্তির পরিমাণ, আসামির পলাতক হওয়ার সম্ভাবনা, তদন্তের অবস্থা, প্রমাণ নষ্ট বা সাক্ষীদের প্রভাবিত করার আশঙ্কা এবং মামলার সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে জামিনের সিদ্ধান্ত দেন।”
ইশরাত মনে করেন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট থাকা বা তাকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জামিন অযোগ্য হওয়ার কারণ নয়। আদালত যদি মনে করেন আইনগত শর্ত পূরণ হয়েছে এবং তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা নেই, তাহলে তিনি জামিন দিতে পারেন।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জামিন প্রসঙ্গে ইশরাত জানান, “শ্রম আদালতের মামলাগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় যে আদালত হাজিরা নিশ্চিত করা, বন্ড প্রদান বা নির্দিষ্ট শর্ত আরোপের মাধ্যমে জামিন মঞ্জুর করেন। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জামিন পাওয়া অস্বাভাবিক নয়, যদি আইনের দৃষ্টিতে জামিনের প্রতিবন্ধকতা না থাকে।”
যদিও তিনি মনে করেন জামিন মানে আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন, এমন নয়। জামিন কেবল বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক স্বাধীনতার সুযোগ। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি যুক্তির ভিত্তিতে।