লটারি বাতিল, ফিরছে ভর্তি পরীক্ষা: ছোটদের ওপর বাড়তি চাপ নিয়ে প্রশ্ন

স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে আবার পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই ব্যবস্থা হবে “সহজ ও শিশু-বান্ধব”। তবে বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। তাদের মতে, শিশুদের পরীক্ষার মুখোমুখি করা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে এবং শিক্ষায় অসমতাও বাড়াতে পারে। তারা বলছেন, লটারি বা পরীক্ষা, কোনোটিই এককভাবে পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়; বরং আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের কথা ভাবা উচিত। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুলে ভর্তি নির্ধারণ করা হবে পরীক্ষার মাধ্যমে। আগে চালু থাকা লটারি পদ্ধতিতে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী বাছাই করা হতো। তবে নতুন সিদ্ধান্তে আবার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ফিরতে হচ্ছে অভিভাবক ও শিশুদের।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে নতুন করে আলোচনায় এসেছে, মাত্র ৫ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের ওপর পরীক্ষার চাপ দেওয়া কতটা যৌক্তিক?

১৭ই মার্চ সচিবালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে প্রথম এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

সে সময় তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা লটারি পদ্ধতি ধাপে ধাপে বাতিল করা হবে এবং ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

“আমরা লটারি সিস্টেম উইথড্র করলাম। আমরা গত একমাস ধরে এটা নিয়ে আলোচনা করে, সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে লটারি কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া না,”- বলেন তিনি। 

 সবশেষ ১৮ই জুন আবার একই প্রসঙ্গে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রাথমিকের ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে বলছি, এটি নামেমাত্র ভর্তি পরীক্ষা। প্রস্তুতির জন্য কোচিং সেন্টারে যাওয়ার মতো কোনো প্রশ্ন থাকবে না। একই সময়ে আমরা ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ওপরে কাজ করছি,  ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্লাস ভর্তি পরীক্ষা মিলিয়ে আসন অনুযায়ী সেভাবে ব্যবস্থা করা হবে।”

ভর্তি পরীক্ষার আগেও ছিল উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “এখন আমরা সেটা পর্যালোচনা করছি এবং ক্যাচমেন্ট এরিয়া ও পরীক্ষা দুটোকে সমন্বয় করে এমন পরীক্ষা দেব, যা শিশুদের জন্য চাপমুক্ত হবে।” 

তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নানা মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের একটি অংশ বলছেন, এত কম বয়সে শিশুদের পরীক্ষার মধ্যে ফেলা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। 

শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

উদ্বিগ্ন অভিভাবক 

ঢাকার একটি বেসরকারি আইটি কোম্পানিতে চাকরি করেন জামিল উদ্দিন। ভালো স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করানোর পরিকল্পনা তার।  আলাপকে তিনি বলেন, “এত ছোট বাচ্চা কী ভর্তি পরীক্ষা দেবে?” 

বাচ্চার পরীক্ষা নিয়ে তিনি নিজেই চাপ অনুভব করছেন।

অনেকটা একই মত জোবায়ের শিহাবেরও। ঢাকার এই বাসিন্দা পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার মেয়ে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। 

তিনি মনে করেন ক্লাস টু এর নিচে কারও ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত না। এই চাপ শিশুদের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে।  

তিনি বলেন, “ক্লাস থ্রি এর বাচ্চা অনেকটা ম্যাচিউরড। তারা হয়তো পরীক্ষা দিতে পারবে। কিন্তু এর চেয়ে ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে তা চাপ সৃষ্টি করবে।” 

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই পরীক্ষা বাচ্চাদের কোনো চাপ তৈরি করবে না। 

শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, পরীক্ষা কোনো চাপ তৈরি করবে না। ক্লাস ওয়ানে মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা এমন কোনো মেধার পরীক্ষা নিতে যাবো না। ইনিশিয়াল স্টেজ। আমরা তাদের পরীক্ষা নিবো। তারপরে দেখা যাক পরবর্তী ধাপে কি হবে।”

“ওদের আমরা ক্লাস ওয়ানে নিউরো সারজন পড়াবো না।”

সে সময় শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, “ খুবই সিম্পল ওয়েতে আমরা এক্সাম দিব এমন কোন প্রতিযোগিতা আনবো না যেটা ক্লাস ওয়ানের জন্য প্রযোজ্য  নয়। আমরা এগুলি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছি, পরবর্তীতে আপনারা দেখতে পাবেন।”

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই পরীক্ষা অত্যন্ত সহজ ও শিশু-বান্ধব হবে এবং এতে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হবে না। 

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা মনে করেন প্রশ্ন সহজ-কঠিন নির্ণয় কার সম্ভব হবে না। 

প্রশ্নের সহজ-কঠিন নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না মনে করেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরি । তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন, এই পদ্ধতিতে নিম্নবিত্ত পরিবারের বাচ্চা পিছিয়ে পড়বে।

“শিক্ষামন্ত্রী বারবার বলেছেন, প্রশ্ন সহজ হবে। তবে এই প্রশ্ন দেখবে কে। এটাতো কমন প্রশ্ন হবে না। পাবলিক পরীক্ষা না।”

রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, লটারি বাতিলের এই সিদ্ধান্তের বড় প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ওপর। এরকম তড়িঘড়ি না করে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। 

“তারা বলেছেন, আলাপ আলোচনা করেছেন, কিন্তু কাদের সাথে করেছেন জানা নেই!”

 তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “এটার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবেন অভিভাবক, তাদের সাথে কতদূর কী কথা হয়েছে জানি না। কিন্তু এটা করা উচিত ছিলো।”

কোচিং বাণিজ্য বৃদ্ধির শঙ্কা 

এই সিদ্ধান্তের ফলে কোচিং বাণিজ্য ও শিক্ষা বাণিজ্যও আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাশেদা কে চৌধুরী।  নতুন এই সিদ্ধান্তে কোচিং বাণিজ্যও বেড়ে যেতে পারে মত দিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, “খুব বেশিদিন লাগবে না, আপনারা ওয়ালে পোস্টার দেখতে পাবেন অমুক স্যার কোচিং করাচ্ছে, অমুক স্কুলে ভর্তি কোচিং।”

তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী এর আগে প্রশ্নফাঁস ঠেকানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তিনি। এবার কোচিং বাণিজ্য ঠেকানো চ্যালেঞ্জ নিয়ে বন্ধ করতে পারেন তিনি। 

তবে শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছেন, এটি বাণিজ্যের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। 

শিশু মনোস্তত্ত্বে প্রভাব

ভর্তি পরীক্ষার এই সিদ্ধান্ত আরেকটি সংকটকে সামনে এনেছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে এত কম বয়সে পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়া শিশুদের মনোস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলবে।   

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদ মনে করেন ভর্তি পরীক্ষা বা লটারি দুটিরই ভালো ও খারাপ দিক রয়েছে। তিনি বলেন, লটারিতে শিশু নিজেকে অনেক সময় নিজেকে একজন ভাগ্য বঞ্চিত মনে করতে পারে। এতে তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়।  ভর্তি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে  সুযোগ পেলে আত্মমবিশ্বাস পায়।

অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। 

ডা. হেলাল বলেন, “যারা সুযোগ পায় না, তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং অনেক সময় অভিভাবকরাও মানসিক চাপে পড়ে যান। এতে শিশু খুব অল্প বয়স থেকেই নিজেকে ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ শিক্ষার্থী হিসেবে ভাবতে শুরু করতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।”

“শৈশব থেকেই যদি শিশুকে পরীক্ষার চাপের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়, তাহলে তা তার মধ্যে স্ট্রেস তৈরি করতে পারে,”- বলেন এই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। 

‘লটারি আদর্শ না’

এলাকাভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তির একটা অনুপাত থাকতে পারে বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী।  তিনি বলেন, “কোন বাবা-মা না চায় সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াতে। কিন্তু আমরাই তো পড়াতে পারছি না। 

লটারি সিস্টেমে কারা উপকৃত হচ্ছে তা দেখা উচিত ছিলো মন্তব্য করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, “কারা হচ্ছে? লটারি তো আসলে আদর্শ না। আদর্শ হতো আমরা যদি প্রতিটি বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করা সুযোগ করে দিতে পারতাম।”

তিনি আরও বলেন, “যদি ধরেন, সত্তরটি আসনের জন্য তিন হাজার বাচ্চাকে পরীক্ষা দিতে হয়। এটা লটারির মাধ্যমে করা হতো। অনেকে খুশি হতো অনেকে খুশি হতো না। কিন্তু অন্তত একটা বিষয় ছিলো যে সবাইকে এক পাল্লায় বিবেচনা করা হতো।”

তিনি বলেন,  শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে তিন ধারায় বিভক্ত করা হয়েছে। ধর্মীয়, ইংরেজি মাধ্যম এবং মূল ধারা যেটাকে বলা হয়। 

“বারবার একটি কথা উঠে আসছে, আমাদের মূল ধারা থেকে শিক্ষার্থীরা ঝরে যাচ্ছে। এটার কারণ তো দেখা উচিত ছিলো,” বলেন তিনি। 

“লটারিকে আমি আবারও বলবো যে আদর্শ ছিলো না। এখন এটার দুইটা উপায় আছে। একটা হলো যে আপাতত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা যে এই লটারি সিস্টেমের ভালো-মন্দ দিকগুলো বিবেচনা করা উচিত।  

মনোবিজ্ঞানী হেলাল উদ্দীন আহমেদও মনে করেন শুধু লটারি বা শুধু পরীক্ষা, কোনোটাই সম্পূর্ণ সমাধান নয়। 

 “পৃথিবীর অনেক জায়গায় ক্যাচমেন্ট এরিয়াভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়, যেখানে নির্দিষ্ট এলাকার শিশুদের নির্দিষ্ট স্কুলে পড়ার সুযোগ থাকে।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, উন্নত দেশগুলোতে নির্দিষ্ট এলাকার স্কুলে সেই এলাকার শিশুরাই ভর্তি হয়। এতে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমে এবং শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপও কম পড়ে।

তিনি আরও বলেন, “ঢাকার একটি শিশুকে যদি দূরের এলাকায় পড়তে হয় এবং যাতায়াতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, সেই চাপ অনেক সময় ভর্তি পরীক্ষার চাপের চেয়েও বেশি হয়ে যায়।”

তাই তিনি মনে করেন, ক্যাচমেন্ট এরিয়া ভিত্তিক একটি সুশৃঙ্খল ও মানসম্মত ভর্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যেখানে সব স্কুলের মান সমান করার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো একটি পদ্ধতিই পুরোপুরি নিখুঁত নয়। সঠিক নীতি ও সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই শিশুদের ওপর মানসিক চাপ কমানো সম্ভব।

একই কথা বলেন রাশেদ কে চৌধুরীও। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে এরকম এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে মত তার।