হামজনিত মৃত্যু ৩০০ ছাড়িয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা হাজারে হাজার, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে ৫৮ জেলায়। তবু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থামছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটকে শুরু থেকেই জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে নিয়ে দ্রুত সমন্বিত কর্মসূচি, আইসিইউ-অক্সিজেন প্রস্তুতি, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আগাম হাসপাতালে আনা এবং জনসম্পৃক্ত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে যা দেখা গেছে, তা অনেকটাই দেরিতে শুরু হওয়া, খণ্ডিত এবং পরিস্থিতির তুলনায় অপ্রতুল
দেশে হাম পরিস্থিতি এখন স্পষ্টতই জাতীয় জরুরি অবস্থা। তবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, তাতে প্রশ্ন উঠেছে যে সরকার কি শুরু থেকেই বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সোমবার নিশ্চিত হামে দুজন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এক দিনে মোট ১৭ জনের মৃত্যুর এই তথ্য চলতি প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এ নিয়ে চলতি বছরে হামে ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৫৪ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ২৬৩ জন।
টিকাদান সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (নাইট্যাগ) সভায় বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, প্রাদুর্ভাবের সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে যে কোনো মৃত্যুকেই হামের মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সে হিসাবে ৩১৭ জনের মৃত্যুই এই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রশ্ন হলো, এত মৃত্যুর আগেই কি আরও শক্ত, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যেত না?
প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও আলোচনা দেরিতে
এই বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। তবে সেই সময় এটি নিয়ে বড় ধরনের জনসতর্কতা, জরুরি প্রতিরোধ পরিকল্পনা বা উচ্চ পর্যায়ের দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়নি।
এর মধ্যে সংক্রমণ ধীরে ধীরে ছড়াতে থাকে। মার্চের মাঝামাঝি রাজশাহী হয়ে আরও কয়েকটি জেলায় প্রাদুর্ভাবের খবর প্রকাশ্যে আসে।
পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও জানায়, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু।
অর্থাৎ, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সারা দেশে, এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। কিন্তু এমন অবস্থায়ও সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল ধাপে ধাপে, ধীর এবং অনেকের মতে পরিস্থিতির তুলনায় দেরিতে।
টিকাদান ও আইসিইউ সেবা
সরকার ৫ই এপ্রিল ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকা কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ ও বরিশালে টিকাদান শুরু হয় ১২ই এপ্রিল। পরে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়।
তবে জানুয়ারিতে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর এপ্রিলের শেষভাগে এসে দেশজুড়ে টিকাদান শুরু করা কেন তাই নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
যখন সারা দেশে কর্মসূচি শুরু হয়, ততদিনে হাম ৫৮ জেলায় ছড়িয়ে গেছে, মৃত্যুও দ্রুত বাড়ছে।
শিশুমৃত্যু বাড়তে থাকলে সরকার আইসিইউ সেবা বাড়ানোর কথা জানায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ভেন্টিলেটর নিয়ে হাসপাতালে দিয়েছেন, এমন খবরও গণমাধ্যমে এসেছে।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিদিনের তালিকাতেই দেখা যাচ্ছে, মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
তাই আইসিইউ বাড়ানোর ঘোষণা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। কারণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের তথ্যই বলছে, রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
এ বছর এখন পর্যন্ত ৪১ হাজার ৭৯৩ জন রোগী হামের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছে। ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৮৪২ জন। অথচ নিশ্চিত শনাক্ত হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪৬৭ জন।
এই ব্যবধানই নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
বাস্তব আক্রান্ত আরও বেশি?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
কারণ, কিটের সংকটে উপসর্গ থাকা সবার নমুনা পরীক্ষা করা যাচ্ছে না।
আবার অনেক চিকিৎসক তাদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও হামের চিকিৎসা দিচ্ছেন, যেসব রোগীর তথ্য সরকারি পরিসংখ্যানে যোগ হচ্ছে না।
অর্থাৎ, হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা ও নিশ্চিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যার মধ্যে যে বড় পার্থক্য, তা শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি সরকারের নজরদারি ও তথ্যসংগ্রহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরছে।
যদি প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হয়, তাহলে মৃত্যুর প্রকৃত ঝুঁকিও সরকারি হিসাবের তুলনায় বড় হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জানুয়ারিতে প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার পরও কেন দ্রুত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিরোধ পরিকল্পনা নেওয়া হলো না? সেটাই বড় প্রশ্ন।
আর শিশুদের মধ্যেই যখন সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি, তখন কেন আগেভাগে নিবিড় চিকিৎসা, আইসিইউ প্রস্তুতি, অক্সিজেন ও জরুরি রেফারেলব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলো না সেই প্রশ্নও ঘুরে ফিরে আসছে।
সরকারের পদক্ষেপ অপ্রতুল
বিশেষজ্ঞরা বলছেন সরকার যা করছে, তা পরিস্থিতির তুলনায় যথেষ্ট নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সাবেক প্রধান মুজাহেরুল হক ডা. মুজাহেরুল হক সরাসরি বলেছেন, বর্তমান ব্যবস্থা “অপ্রতুল” এবং হামে মৃত্যু ঠেকাতে শুরু থেকেই একটি জরুরি “ক্র্যাশ প্রোগ্রাম” দরকার ছিল।
একই মত দিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনও।
“এখনো যেভাবে আইসিইউ, অক্সিজেন ও হাসপাতালে ভর্তি, এই তিন স্তরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা হয়নি।”
শুধু টিকাদান পর্যাপ্ত নয়
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে দেশের ১ কোটি ৬১ লাখ শিশু হামের টিকা পেয়েছে।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, টিকাদানের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৮৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম মোকাবিলাকে শুধু টিকাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না।
হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকাদান যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে ডা. মুশতাক বলছেন, হাসপাতালে ভর্তির বহুমাত্রিক কৌশল নিতে হবে।
আলাপ-কে তিনি বলেছেন, “ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি। তাই জ্বর বা হাম-সদৃশ উপসর্গ দেখা দিলেই তাদের দ্রুত সেকেন্ডারি হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে।
“অনেক হাসপাতাল অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু জনগণের ধারণা এমন যে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা বড় সুবিধা না থাকলে সেগুলোকে হাসপাতালই মনে করা হয় না। এই ধারণা বদলানোও জরুরি।”
আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা শিশুদের দ্রুত শয্যা দিতে হবে, যাদের অবস্থা তার এক ধাপ নিচে তাদের হাই-ফ্লো অক্সিজেন দিতে হবে, আর দরিদ্র ও অপুষ্ট শিশুরা যাতে গুরুতর পর্যায়ে যাওয়ার আগেই হাসপাতালে আসে, সে ব্যবস্থা করতে হবে, বলে মত দেন ডা. মুশতাক।
ডা. মুজাহেরুল হকও একই সুরে বলছেন, প্রতিদিন মৃত্যুর খবর শোনার বদলে মানুষ জানতে চায় সরকার আসলে কী চিকিৎসা ও প্রতিরোধব্যবস্থা নিচ্ছে।
তিনি বলেন, “সরকার কী কী নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছে, তা মানুষ স্পষ্টভাবে জানতে হবে।”
তার মতে, হাম একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা, তাই এর সমাধানও হতে হবে জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে।
সমন্বয়ের অভাব
ডা. মুজাহেরুল হক মনে করেন, সরকারের উচিত ছিল জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন, বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ মানুষদেরও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা।
“সরকার একা একা কী করছে, তা জনগণ যেমন জানে না, তেমনি বাইরে থাকা জনস্বাস্থ্য সংগঠনগুলোকেও কার্যকরভাবে যুক্ত করা হচ্ছে না। এর ফলে সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না।”
ডা. মুশতাকও বলছেন, মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকেরা অনেক কিছু করতে চান, কিন্তু প্রশাসনিক অনুমতি, বাজেট ও জবাবদিহির ভয় তাদের আটকে রাখে। তাই তার মতে, মন্ত্রণালয় বা আন্তমন্ত্রণালয় পর্যায় থেকে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এলে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই দ্রুত অনেক কিছু করা সম্ভব।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “যদি শুরুতেই জরুরি জনস্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া যেত, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল।”
এখনো যদি সরকার সমন্বিতভাবে জরুরি ভর্তি, আইসিইউ, অক্সিজেন ও টিকাদান- এই চার স্তরে কাজ করে, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ কমার দিকে যেতে পারে,বলে মনে করছেন ডা. মুশতাক।
সরকারের বর্তমান পদক্ষেপ নিয়ে তার মূল্যায়ন, “চেষ্টা আছে, কিন্তু সাফল্য আংশিক।”
তার মতে, ৩০ শতাংশ সাফল্য দিয়ে এই ধরনের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করা যায় না, এখানে ৮০ শতাংশের বেশি কার্যকারিতা দরকার।
হামের প্রাদুর্ভাব কমাতে সরকারের এখন “আউট অব দ্য বক্স” চিন্তা দরকার বলেও মত দেন এই বিশেষজ্ঞ।