বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে কেন ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলছে আরএসএফ

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ২০২৬ সালে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)। সংস্থাটির সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক স্কোর ৩৩.০৫। আরএসএফ-এর তথ্যমতে ৪০-এর নিচে স্কোর হলে তারা পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” হিসেবে চিহ্নিত করে।

আরএসএফ-এর সাউথ এশিয়া ডেস্ক আলাপ-কে জানায়, “২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৩৩.৭১। এক বছরে ০.৬৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩.০৫। বড় ধরনের পতন না হলেও এই পরিবর্তনকে “নেতিবাচক স্থবিরতা” হিসেবে ধরে নেয়া হয়।“

প্রতিবছর ১৮০টি দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি পাঁচটি সূচকে মূল্যায়ন করে আসছে আরএসএফ। এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বের অর্ধেকের বেশি দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা “কঠিন” বা “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” পর্যায়ে নেমেছে। সংস্থাটি আরও বলছে, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতাকে ক্রমশ “অপরাধ” হিসেবে দেখার প্রবণতাও বাড়ছে। 

সূচকে মিশ্র চিত্র, তবে সামগ্রিকভাবে পতন

পাঁচটি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশ দুটি ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি করলেও তিনটিতে অবনতি হয়েছে। যার ফলে সামগ্রিক স্কোর কমেছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্কোর ২৯.০৩ থেকে বেড়ে ৩১.০৯ হয়েছে (+২.০৬)। নিরাপত্তা সূচকেও সামান্য উন্নতি দেখা গেছে—২৯.১৭ থেকে বেড়ে ৩০.৫১ (+১.৩৪)।

তবে অর্থনৈতিক, আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে। অর্থনৈতিক সূচক ৩৩.৭৯ থেকে কমে ৩১.৬৭ (-২.১২), আইনি সূচক ৩৬.৭১ থেকে কমে ৩৪.৩৮ (-২.৩৩), এবং সামাজিক সূচক ৩৯.৮৭ থেকে কমে ৩৭.৬০ (-২.২৭) হয়েছে। এই তিন খাতের অবনতিই সামগ্রিক চিত্রকে আরও দুর্বল করেছে।

২০২৫ সালে দমনমূলক পরিবেশ

২০২৫ সালে বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতিকে “উদ্বেগজনক ও দমনমূলক” হিসেবে আলাপ-কে জানিয়েছে আরএসএফ। বছরজুড়ে সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন, আইনি হয়রানি এবং ভীতিকর পরিবেশের একাধিক ঘটনার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছে।

আরএসএফ আলাপ-কে জানায়, এই সময়ে দুইজন সাংবাদিক—আসাদুজ্জামান তুহিন ও খন্দকার শাহ আলম—নিহত হন। এছাড়া অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক এখনো বিচারাধীন অবস্থায় আটক আছেন। ১৪০ জনেরও বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মামলার অভিযোগ রয়েছে। যার মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের হত্যা বা “মানবতাবিরোধী অপরাধ”-এর মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

তারা আরও উল্লেখ করে, “সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর-এর ওপর হামলার ঘটনাও গণমাধ্যমের নিরাপত্তাহীনতাকে সামনে নিয়ে আসে।“

আইনি জট ও সুরক্ষার ঘাটতি

আরএসএফ আলাপ-কে জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দায়ের করা অনেক মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিশেষ করে আইসিটি অ্যাক্ট, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে করা মামলাগুলোর সমাধান হয়নি। এসব আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।“

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, “সাংবাদিকরা পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন না। প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষা, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং হুমকি বা হামলার তদন্ত—এসব ক্ষেত্রেই ঘাটতি এখনও রয়েছে। ফলে মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ বাংলাদেশে এখনো বৈরী।“

এর আগে মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের পতন হয়েছে বলে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে উঠে আসে। র‌্যাংকিং তিন ধাপ অধঃপতন হয়ে র‌্যাংকিং হয়েছে ১৫২।