স্পেনীয় উপনিবেশের গল্প শোনালেন লাভ দিয়াজ

আগের দিন কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের বাহার দেখে, সকালে সেই আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা পরখ করে ক্যাজুয়াল ব্লেজার গায়ে চাপিয়ে বের হয়েছি। সকাল যতই দুপুরের দিকে গড়াচ্ছে দেখি গরম ততই বাড়ছে। তার ওপর আমি পিয়াৎজেল রোমা থেকে হেঁটে হেঁটে ঘুরেছি ভেনিসের সবচেয়ে রেনেসাঁ যুগের চিত্রকর্ম সমৃদ্ধ এলাকায়। প্রথমে গেলাম ক্যাম্পো সার রোক্কো এলাকার সান পোলোতে। সেখানে গিয়ে দেখি পাশাপাশি দুটি স্থাপনা। একটি চার্চ অব সান রোক্কো, আরেকটি স্কুলা গ্রান্দে দ্য সান রোক্কো। দুটোতেই রাখা আছে রেনেসাঁ যুগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেনেশীয় চিত্রশিল্পী তিনতরেত্তোর চিত্রকর্ম। আমি মূলত তার কাজ দেখার জন্যই এসেছি। তো দেখলাম চার্চ অব সান রোক্কোতে একটি অনুষ্ঠান হবে তাই বাইরের লোকেদের ঢোকা বারণ।

তারপরও উঁকি দিয়ে, কিছুটা ঢুকে তিনতরেত্তোর কাজ দেখলাম। বিশাল বিশাল দুটো ফ্রেস্কো। অত ভালো করে দেখা যায় না। তবে তিনতরেত্তোর সবচেয়ে বেশি চিত্রকর্ম রাখা আছে চার্চের পাশেই স্কুলা গ্রান্দের ভেতর। স্কুলার অর্থ বিদ্যালয় হলেও এটি আসলে সাধু সান রোক্কো ভ্রাতৃসংঘের প্রার্থণাস্থান ও গরিব-দুস্থ-অসুস্থ মানুষদের সেবাদানের জায়গা ছিলো। তারচেয়েও বড় বিষয় এই স্কুলা গ্রান্দের ভেতরেই রাখা আছে সাধু রোক্কোর দেহাবশেষ। সেই অর্থে এটি একটি মাজারও বটে। তো পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে নির্মিত এই অপূর্ব সুন্দর স্থাপনার ভেতর তিনতরেত্তোর ছয়টি চিত্রকর্মের দেখা পাওয়া যায়। তার মধ্যে চারটি খুব বিখ্যাত সিরিজ ওয়ার্ক। প্লেগ আক্রান্ত মানুষদের সেবা দিচ্ছেন সাধু রোক্কো, প্রাণীদের আশীর্বাদরত সাধু রোক্কো, সেনাদের দ্বারা আটককৃত সাধু রোক্কো এবং কারাগারে বন্দী অবস্থায় সাধু রোক্কোর সাথে দেবদূতের সাক্ষাৎ। স্থাপনাটির ভেতরে ঢুকতেই একধরনের প্রশান্তিভাব চলে আসে। সিলিংয়ে বিশাল করে আঁকা রয়েছে ‘চ্যারিটি অব সেন্ট রোক্কো’, আর এঁকেছেন আরেক দিকপাল, সপ্তদশ শতকের চিত্রশিল্পী জিওভান্নি ফুমিয়ানি। শুধু দেখতেই মন চায়। হা করে অনেকক্ষণ উপরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আঁকার শৈলী বোঝার চেষ্টা করলাম। সাড়ে তিন ইউরো প্রবেশমূল্য তুচ্ছ হয়ে যায় এই অবলোকনের কাছে।

অনেকটা সময় কাটিয়ে, পাশের স্যুভনির শপ থেকে আমার পুত্র মনের জন্য ভিঞ্চির কাজ সম্বলিত একটি ছোট খেড়ো খাতা কিনে পা বাড়ালাম ‘শান্তা মারিয়া গ্লোরিওসা দেই ফ্রেইরি’র দিকে। এটি একটি ব্যাসিলিকা। ব্যাসিলিকা হলো সেই চার্চ, যা ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে স্থাপত্যকলা, চিত্রকলা ও ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে মানবসভ্যতার অমূল্য সম্পদ। আর ব্যাসিলিকা ঘোষণা করেন পোপ। শান্তা মারিয়া ব্যাসিলিকার প্রবেশমূল্য ৮ ইউরো। ভেতরে যা রয়েছে তার তুলনায় এই প্রবেশমূল্য অতি নগণ্য। ভেতরে রয়েছে রেনেসাঁ যুগের পুরোধা চিত্রশিল্পী তিতিয়ান বা তিজিয়ানো ভেচেললিওর আঁকা বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম এবং স্বয়ং তার কবর। ‘ম্যাডোনা কা পেসারো’ আর ‘দি এসাম্পশন’ নাম্নী অপরূপ শিল্পকর্ম দুটির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকলাম। আর তার কবরের ওপর করা ভাস্কর্যের কথা কী বলবো! বিস্ময়কর! যাক, এসব মহান শিল্পকর্ম নিয়ে আলাদা করে হয় তো লিখব সামনে। আপাতত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি কোনদিক দিয়ে যে দুই ঘন্টা চলে গেছে টেরই পাইনি।

দৌঁড়াতে হবে উৎসবের দিকে। আজ দশম দিন। এই সময়ের অপেক্ষাকৃত তরুণ কিন্তু অতর চলচ্চিত্রকার হিসেবে এরই ভেতর সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেছেন, ফিলিপাইনের লাভ দিয়াজের ছবি ‘লেট আস থ্রু, ডিয়ার অ্যানসেস্টর্স’। ছবির প্রেক্ষাপট ১৬১৭ সাল।  স্প্যানিশ ধর্মযাজক পাদ্রে এনসিসো, ফিলিপাইনের ‘লাস ইজলাস ফিলিপিনাস’ নামের একটি দ্বীপের ঔপনিবেশিক শাসক, যাকে বলে এনকোমেন্ডেরো। গভীর ঘন বনের ভেতর সে ধর্মের নামে উপনিবেশ বিস্তারে নিয়োজিত। আদিবাসীদের কেউ কেউ ধর্মান্তরিত হয়েছে বটে, তবে কেউ কেউ ধরে রেখেছে সনাতন বিশ্বাস ও রীতিনীতি। ‘অবিশ্বাসী’দের পথে আনতে পাদ্রে নির্মম ও কঠোর। সে বনের ভেতর একটি চার্চ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। খ্রিস্টের নামে সে দীক্ষা দিতে চায় বনবাসী সহজ-সরল মানুষদের। ধর্মের আড়ালে এখানে আছে ক্ষমতা আর অতৃপ্ত যৌনলালসা। আধ্যাত্মিক তালিমের আড়ালে রয়েছে কর্তৃত্বকে একচ্ছত্র করার অভীপ্সা। কারণ দুই একজন বাসিন্দা বিপ্লবী মনোভাব ধারণ করে।

লাভ দিয়াজের লেট আস থ্রু, ডিয়ার অ্যানসেস্টর্স দৃশ্য

গ্রামকে পুরুষ শূন্য করতে পারলে পাদ্রের লাভ দুদিক দিয়ে। একদিকে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো মানুষ কমে যায়। আর দ্বিতীয়ত পুরুষদের স্ত্রীদের সে সম্ভোগ করতে পারবে। তো চার্চ বানানোর নামে ছলেবলে কৌশলে পাদ্রে মার্বেল পাথর নিয়ে আসার দুরুহ কাজ দেয় দুঙ্গুয়েনকে। এই দুঙ্গুয়েন আবার পাদ্রেরই অবৈধ সন্তান। এই সত্য সকলেরই জানা। দুঙ্গুয়েন তাই পাদ্রেকে ঘৃণা করে। তারপরও নিরুপায় হয়ে সে চার্চের মার্বেল পাথর সংগ্রহ করে বন ও পাহাড়ের দুর্গম পথ পাড়ি নিয়ে গ্রামে নিয়ে আসতে রাজি হয়। ওদিকে পাদ্রে অন্য এক জাতির লোকজনদের ঠিক করে তারা যেন ফেরার পথে দুঙ্গুয়েনদের দলের লোকদের চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে মেরে ফেলে। শুধু দুঙ্গুয়েন ছাড়া। মার্বেল পাথর তো পৌঁছাতে হবে গ্রামে। তাছাড়া দুঙ্গুয়েনের শরীরে তো তারই রক্ত বহমান। কাজেই তাকে মারা যাবে না।

পাদ্রে যাদের উপর নিষ্ঠুরতা চালাচ্ছে, সেই আদিবাসী মালয় জনগোষ্ঠী অত্যন্ত নিরীহ ও অতিথিপরায়ন। তারা পূর্বপুরুষের আশীর্বাদে বিশ্বাস করে। অথচ তাদেরকে ‘বর্বর’ আখ্যা দিয়ে যীশুর নামে বন্দী দশার ভেতর ফেলতে চায় এই ধূর্ত পাদ্রে। দেখা যায় আদিবাসীদের ভেতর থাকা এক নারী কবিরাজকেও ধর্ষণ ও খুন করে সে। এতে করে মালয় নারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। যেখানে ক্ষণস্থায়ী চার্চ বানানো হয়েছিল সেটি ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলে নারীরা। তাদের অনেক দিন থেকেই পাদ্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। এখান থেকেই সূচিত হতে থাকে বিদ্রোহের সুর।

লাভ দিয়াজের এই ছবিটির মূল ফিলিপিনো শিরোনাম ‘মাকিকিরান পো’। এটি একটি প্রবাদ, যা আদিবাসী মালয় জনগোষ্ঠী এখনো ব্যবহার করে, যার অর্থ পূর্বপুরুষের আত্মাকে ধরে আছে এই ভূমি। লাভ দিয়াজ নিজেই চিত্রনাট্য লিখেছেন, ক্যামেরায় কাজ করেছেন এবং সম্পাদনাও তার। অতর এই নির্মাতার কাজ যারা আগে দেখেছেন তারা জানেন স্থির ক্যামেরায় দীর্ঘ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে মূল প্রতিযোগিতার বাইরে থাকা আড়াই ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের ছবিটির মাধ্যমে লাভ দিয়াজ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র।

ছবিটি সম্পর্কে পরিচালক বলছেন, “প্রচুর যৌন নিপীড়নের (যাকে আমরা এখন ধর্ষণ বলি), লোভাতুর ভোজনের (যাকে আমরা এখন লুণ্ঠন বলি) এবং পরিত্রাণের প্রতিশ্রুতির (যাকে আমরা এখন মহাবিপর্যয় বলি) মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী ও ক্যাথলিক স্পেন ফিলিপাইনকে জোরপূর্বক পুনর্গঠন করেছিল। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ এবং সপ্তদশ শতাব্দী ছিল অবিরামভাবে গির্জা, বন্দর, দুর্গ, প্রাসাদ, বসতি, সড়ক, সেতু, বাগান-খামার, কারখানা এবং খনি উত্তোলনের সময়কাল। জোরপূর্বক শ্রমের কারণে হাজার হাজার আদিবাসী, বিশেষ করে পুরুষ, মৃত্যুবরণ করেছিল। দেবত্বারোপিত জাঁকজমক, ভারী পাথর, পুরু দেয়াল এবং মহিমান্বিত উঁচু ছাদ দিয়ে নির্মিত গির্জাগুলো উপনিবেশবাদের ভয়াবহতার প্রমাণ হয়ে আছে।”

এই সত্য যেসব দেশ উপনিবেশ ছিলো তারা ভালো করেই জানে। সাদাকালো ফ্রেমে এই নির্মম সত্যই লাভ দিয়াজ তুলে ধরেছেন তার এই নতুন ছবিতে। ছবি দেখা শেষ করে বের হলাম। ভেনিস উৎসবে দেখা লাভ দিয়াজের ছবিটিই সর্বশেষ ছবি। আর কোনো ছবির স্ক্রিনিং বুক করিনি। হিসাব করে দেখলাম মোট ২৩টি ছবি দেখা হলো এই কয়েকদিনে। বলাবাহুল্য সব ছবি সমান ভালো লাগেনি। আবার এটাও ঠিক কোনো ছবি একেবারে খুব খারাপও লাগেনি। সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রের সঙ্গে চমৎকার সময় কাটলো। ১২ সেপ্টেম্বর জানা যাবে চূড়ান্ত ফলাফল। সেদিন জানা যাবে কার হাতে উঠবে ডানাওলা সিংহ। চূড়ান্ত ফলের আগেই অবশ্য বাংলাদেশের জন্য একটা সুখবর পাওয়া গেলো। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ছবিটি উৎসবে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডস প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো অর্জন করেছে। এটি একটি প্যারালাল অ্যাওয়ার্ড। শুক্রবার রাত বাংলাদেশ সময় ১১টার দিকে পরিচালক রুবাইয়াতের হাতে ইনডিপেনডেন্ট ক্রিটিকস বিভাগের প্রধান এ পুরস্কারটি তুলে দেন। প্রতিক্রিয়ায় তিনি আনন্দ ও সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তবে আমি আরো আশাবাদী। কারণ ওরিৎজন্তি বিভাগ থেকে গত বছর সেরা পরিচালকের পুরস্কার পাওয়া অনুপর্ণা রায়ের এবারের ছবিটির চেয়ে রুবাইয়াতের ছবিটি অনেক বেশি চিন্তাশীল ও শৈল্পিক ছবি মনে হয়েছে। কাজেই মূল আয়োজনে যদি রুবাইয়াতের ছবি পুরস্কার পেয়ে যায় তাহলে তাতে অবাক হবো না।

যাহোক রাতে ফিরে এসে সেই জাপানি দোকান ‘হট রামেনে’ ঢুকলাম। পর্ক ডাম্পলিংয়ের সাথে নিলাম ‘রেড গিয়ুকৎসু রামেন’, মানে গরুর মাংস দিয়ে রান্না করা নুডুলস আরকি। খাওয়া দাওয়া সেরে বাসায় ঢুকে গেলাম। পরের দিন ছবি দেখা নেই, তবে ভেনিস বিয়েনালের আমন্ত্রণে ওদের চিত্র প্রদর্শনী দেখার কথা রয়েছে।