এশিয়ার কয়েকটি দেশে জ্বালানি সতর্কতা, বাংলাদেশের দাবি সংকট নেই
“পেট্রোল পাম্প আগে সারা দিনে যা বেচতো এখন দুই ঘণ্টায় তা বিক্রি হয়ে যায়। তারপর পেট্রোল পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়, আর বলা হয় পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে,” মন্তব্য জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের।
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ০১:১২ পিএমআপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে সংঘাতে জড়িয়েছে। আঠাশে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট বাজার পার করছে।
বাড়ছে জ্বালানির দাম। সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় শুরু হয়েছে জ্বালানির সংকট। সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে এশিয়ার দেশগুলোতে।
বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় দেশগুলো নিচ্ছে নানান পদক্ষেপ। যদিও বাংলাদেশ সরকার জানাচ্ছে খুব বেশি সংকট নেই বাংলাদেশে। জ্বালানির দাম বাড়ানোরও পরিকল্পনা নেই সেকথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
পাম্পে দীর্ঘ লাইন, সরকার বলছে 'স্বাভাবিক'
দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এর আগে ৬ই মার্চ রাজধানীর একটি পেট্রোল পাম্প ঘুরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, জ্বালানি তেলের মজুত যেন সংকটে না পড়ে, সেজন্য আগেভাগেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এক নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেল দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।
তবে নির্দেশনা দেওয়ার নয় দিন পর ঈদের আগেই রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহার করে সরকার। দেশের সব পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিক্রি আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসার কথা জানানো হয়।
পনেরই মার্চ সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় যে সাময়িক বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল, তা আপাতত থাকছে না। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে তেল কেনা যাবে।
সর্বশেষ ২৭এ মার্চ সিরাজগঞ্জে একটি ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “আমি বারবারই বলেছি, তেলের আমাদের সমস্যা নাই, তবে সমস্যা হচ্ছে যে, পেট্রোল পাম্পে আগে দিনে এক লরি তেল লাগতো। এখন হঠাৎ যুদ্ধের কারণে মানুষ সব তেল সংগ্রহ শুরু করেছে। যার কারণে ওই পেট্রোল পাম্প আগে সারা দিনে যা বেচতো এখন দুই ঘণ্টায় তা বিক্রি হয়ে যায়। তারপর পেট্রোল পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়, আর বলা হয় পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে।”
সেসময় মন্ত্রী বলেছিলেন, তেলের সরবরাহ সবসময়ই আছে এবং সারাদেশের ডিসি-এসপিদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে পরিস্থিতি মনিটরিং করার জন্য। "তবে এই যে হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে এবং সেটা কালোবাজারি হচ্ছে, যা ইতিমধ্যেই সিরাজগঞ্জসহ সারা দেশে ধরা পড়ছে।"
একইদিন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, “এখন পর্যন্ত সারা পৃথিবী ৮০টি দেশ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করলেও আমাদের গণতান্ত্রিক সরকার এখনো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা করছে না। বরং সরকার প্রতিদিন প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানির পেছনে ভর্তুকি দিচ্ছে।”
ফিলিপাইনে জ্বালানি জরুরি অবস্থা
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ফিলিপাইন জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ২৪এ মার্চ মঙ্গলবার দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র জানান, এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
মার্কোস জুনিয়র বলেন, “জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে সরকার বিদ্যমান আইনের আওতায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারবে। একইসঙ্গে এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সংকট এবং দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ মোকাবিলা করতে পারবে।”
তিনি আরও জানান, জরুরি অবস্থার অংশ হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন, জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সুশৃঙ্খল থাকে। এসব পণ্যের পরিবহন, সরবরাহ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের ঘোষিত জরুরি অবস্থা এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে বলেও ঘোষণায় বলা হয়। এর মাধ্যমে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে বলে আশা করছে দেশটির সরকার। তারা আশা করছেন এ উদ্যোগের ফলে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
এছাড়া, পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা আদায় এবং সরবরাহে কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ফিলিপাইনের জ্বালানি সচিব শ্যারন গ্যারিন জানান, বর্তমান ব্যবহারের হারে দেশে প্রায় ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত আছে।
সরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভেতর ও বাইরের দেশগুলো থেকে ১০ লাখ ব্যারেল তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে বাফার মজুত তৈরির চেষ্টা চলছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মঙ্গলবার ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় দেশব্যাপী জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গাড়ির ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
জ্বালানি মন্ত্রী কিম সুং-হোয়ান মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানান, বেসরকারি খাতে গাড়ি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আপাতত ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে। তবে জ্বালানি সতর্কতার মাত্রা বাড়লে এই নীতি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
সরকার মানুষকে ১২টি জ্বালানি সাশ্রয়ী অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। যেমন, কম সময় গোসল করা, দিনের বেলায় মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রিক গাড়ি চার্জ করা এবং ছুটির দিনে ওয়াশিং মেশিন ও ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করা।
জ্বালানি মন্ত্রী কিম জানিয়েছেন, সরকার দেশের শীর্ষ ৫০টি জ্বালানি-নির্ভর প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার কমাতে অনুরোধ করবে এবং স্ট্যাগারড কমিউটিং ঘণ্টা ও অন্যান্য সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করবে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, মে মাসের মধ্যে পাঁচটি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু করা হবে। কয়লা প্ল্যান্টের ওপর থাকা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াবে।
এছাড়া চলতি বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় তিনটি কয়লা প্ল্যান্টের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কথা। সেসব প্লান্টের মেয়াদও বাড়াতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার দৈনিক গড় ৬৯ হাজার টনের এলএনজি খরচের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার টন বা ২০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হবে বলে জ্বালানি মন্ত্রী কিম উল্লেখ করেছেন।
জাপানের যৌথ তেলের মজুত ব্যবহার
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ঘোষণা করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেল সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় টোকিও অতিরিক্ত জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে মার্চের শেষে দেশটিতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে রাখা তেলের মজুত ব্যবহার শুরু করবে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জানান, ১৬ই মার্চ থেকে বেসরকারি স্তরের তেল মজুত ছাড়া শুরু করেছে। ২৬এ মার্চ থেকে জাতীয় ক্ষমতায় থাকা মজুতও ছাড়া শুরু করবে।
একই সাথে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের সঙ্গে যৌথভাবে রাখা প্রায় ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল থেকেও সরবরাহ করা হবে।
এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ’র সমন্বিত তেল মজুত ছাড়ের অংশ। যেখানে জাপানের অবদান প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল।
ভিয়েতনামে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সীমিত
ভিয়েতনামের জাতীয় এয়ারলাইনস এপ্রিল থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই ডজন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট স্থগিত করবে, বলে জানিয়েছে দেশটির বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
“মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিমান জ্বালানি সরবরাহ সীমিত হয়ে আসছে। এই সংকট মোকাবিলায় ঘরোয়া এয়ারলাইনগুলো ঝুঁকিতে আছে। এ কারণেই ঘরোয়া বিমান কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত,” দেশটির সিভিল এভিয়েশন অথরিটি ২৩এ মার্চ এক বিবৃতিতে বলেছে,
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দেশের প্রধান সব অভ্যন্তরীণ রুট এবং আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালু থাকবে।
ভিয়েতনামের এয়ারলাইন্গুলো আন্তর্জাতিক রুটে ফুয়েল সারচার্জ যোগ করার কাজ করছে। যা সম্ভবত এপ্রিল থেকে প্রযোজ্য হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে উদ্যোগী শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কাও জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ হিসেবে ২৪এ মার্চ থেকে স্ট্রিট লাইট, নিয়ন সাইন এবং বিলবোর্ডের আলো বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। দেশের জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় এ পদক্ষেপের মাধ্যমে খরচ ২৫ শতাংশ কমানো লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটির সরকার।
সরকারের মুখপাত্র নালিন্দা জযতিসা সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার কমানো নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এসব উদ্যোগের ফলে দেশের জ্বালানি খরচ কমবে।
শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যেই তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানে বন্ধ স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ২৪এ মার্চ ঘোষণা করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে স্কুলগুলো দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস চালাবে যেন যানবাহনের উপর চাপ কমে আসে।
এছাড়া সরকারি অফিসের কর্মীদের বেশি সময় বাড়ি থেকে কাজ করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গণপরিবহন বাদে সরকারি গাড়ির ৬০ শতাংশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি জ্বালানি ব্যবহার কমানো ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও জানিয়েছেন। এর মধ্যে আছে গাড়ি, এয়ার কন্ডিশনার এবং আসবাবপত্রের ক্রয় বন্ধ করা, মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারি খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমানো হবে। কিছু সেবাকে অনলাইনে নিয়ে যাওয়া হবে। পাকিস্তানে তেলের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে কারণ তাদের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, “অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে আমরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার নাগরিকদের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে, যদিও বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত।”
এশিয়ার কয়েকটি দেশে জ্বালানি সতর্কতা, বাংলাদেশের দাবি সংকট নেই
“পেট্রোল পাম্প আগে সারা দিনে যা বেচতো এখন দুই ঘণ্টায় তা বিক্রি হয়ে যায়। তারপর পেট্রোল পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়, আর বলা হয় পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে,” মন্তব্য জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে সংঘাতে জড়িয়েছে। আঠাশে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট বাজার পার করছে।
বাড়ছে জ্বালানির দাম। সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হওয়ায় শুরু হয়েছে জ্বালানির সংকট। সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে এশিয়ার দেশগুলোতে।
বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় দেশগুলো নিচ্ছে নানান পদক্ষেপ। যদিও বাংলাদেশ সরকার জানাচ্ছে খুব বেশি সংকট নেই বাংলাদেশে। জ্বালানির দাম বাড়ানোরও পরিকল্পনা নেই সেকথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
পাম্পে দীর্ঘ লাইন, সরকার বলছে 'স্বাভাবিক'
দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এর আগে ৬ই মার্চ রাজধানীর একটি পেট্রোল পাম্প ঘুরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, জ্বালানি তেলের মজুত যেন সংকটে না পড়ে, সেজন্য আগেভাগেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এক নির্দেশনায় বলা হয়, একটি মোটরসাইকেল দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।
তবে নির্দেশনা দেওয়ার নয় দিন পর ঈদের আগেই রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহার করে সরকার। দেশের সব পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিক্রি আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসার কথা জানানো হয়।
পনেরই মার্চ সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কায় যে সাময়িক বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল, তা আপাতত থাকছে না। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে তেল কেনা যাবে।
সর্বশেষ ২৭এ মার্চ সিরাজগঞ্জে একটি ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “আমি বারবারই বলেছি, তেলের আমাদের সমস্যা নাই, তবে সমস্যা হচ্ছে যে, পেট্রোল পাম্পে আগে দিনে এক লরি তেল লাগতো। এখন হঠাৎ যুদ্ধের কারণে মানুষ সব তেল সংগ্রহ শুরু করেছে। যার কারণে ওই পেট্রোল পাম্প আগে সারা দিনে যা বেচতো এখন দুই ঘণ্টায় তা বিক্রি হয়ে যায়। তারপর পেট্রোল পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়, আর বলা হয় পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে।”
সেসময় মন্ত্রী বলেছিলেন, তেলের সরবরাহ সবসময়ই আছে এবং সারাদেশের ডিসি-এসপিদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে পরিস্থিতি মনিটরিং করার জন্য। "তবে এই যে হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে দুর্নীতি আছে এবং সেটা কালোবাজারি হচ্ছে, যা ইতিমধ্যেই সিরাজগঞ্জসহ সারা দেশে ধরা পড়ছে।"
একইদিন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত যশোরে এক অনুষ্ঠানে বলেন, “এখন পর্যন্ত সারা পৃথিবী ৮০টি দেশ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করলেও আমাদের গণতান্ত্রিক সরকার এখনো জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা করছে না। বরং সরকার প্রতিদিন প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানির পেছনে ভর্তুকি দিচ্ছে।”
ফিলিপাইনে জ্বালানি জরুরি অবস্থা
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ফিলিপাইন জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ২৪এ মার্চ মঙ্গলবার দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র জানান, এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
মার্কোস জুনিয়র বলেন, “জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে সরকার বিদ্যমান আইনের আওতায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে পারবে। একইসঙ্গে এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সংকট এবং দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ মোকাবিলা করতে পারবে।”
তিনি আরও জানান, জরুরি অবস্থার অংশ হিসেবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন, জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সুশৃঙ্খল থাকে। এসব পণ্যের পরিবহন, সরবরাহ ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের ঘোষিত জরুরি অবস্থা এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে বলেও ঘোষণায় বলা হয়। এর মাধ্যমে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে বলে আশা করছে দেশটির সরকার। তারা আশা করছেন এ উদ্যোগের ফলে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
এছাড়া, পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা আদায় এবং সরবরাহে কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ফিলিপাইনের জ্বালানি সচিব শ্যারন গ্যারিন জানান, বর্তমান ব্যবহারের হারে দেশে প্রায় ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত আছে।
সরকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভেতর ও বাইরের দেশগুলো থেকে ১০ লাখ ব্যারেল তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে বাফার মজুত তৈরির চেষ্টা চলছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং মঙ্গলবার ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় দেশব্যাপী জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গাড়ির ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
জ্বালানি মন্ত্রী কিম সুং-হোয়ান মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানান, বেসরকারি খাতে গাড়ি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আপাতত ঐচ্ছিক রাখা হয়েছে। তবে জ্বালানি সতর্কতার মাত্রা বাড়লে এই নীতি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
সরকার মানুষকে ১২টি জ্বালানি সাশ্রয়ী অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। যেমন, কম সময় গোসল করা, দিনের বেলায় মোবাইল ফোন ও ইলেকট্রিক গাড়ি চার্জ করা এবং ছুটির দিনে ওয়াশিং মেশিন ও ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করা।
জ্বালানি মন্ত্রী কিম জানিয়েছেন, সরকার দেশের শীর্ষ ৫০টি জ্বালানি-নির্ভর প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার কমাতে অনুরোধ করবে এবং স্ট্যাগারড কমিউটিং ঘণ্টা ও অন্যান্য সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করবে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, মে মাসের মধ্যে পাঁচটি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু করা হবে। কয়লা প্ল্যান্টের ওপর থাকা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াবে।
এছাড়া চলতি বছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় তিনটি কয়লা প্ল্যান্টের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কথা। সেসব প্লান্টের মেয়াদও বাড়াতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার দৈনিক গড় ৬৯ হাজার টনের এলএনজি খরচের মধ্যে প্রায় ১৪ হাজার টন বা ২০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হবে বলে জ্বালানি মন্ত্রী কিম উল্লেখ করেছেন।
জাপানের যৌথ তেলের মজুত ব্যবহার
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ঘোষণা করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেল সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় টোকিও অতিরিক্ত জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে মার্চের শেষে দেশটিতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে রাখা তেলের মজুত ব্যবহার শুরু করবে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জানান, ১৬ই মার্চ থেকে বেসরকারি স্তরের তেল মজুত ছাড়া শুরু করেছে। ২৬এ মার্চ থেকে জাতীয় ক্ষমতায় থাকা মজুতও ছাড়া শুরু করবে।
একই সাথে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের সঙ্গে যৌথভাবে রাখা প্রায় ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল থেকেও সরবরাহ করা হবে।
এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ’র সমন্বিত তেল মজুত ছাড়ের অংশ। যেখানে জাপানের অবদান প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল তেল।
ভিয়েতনামে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট সীমিত
ভিয়েতনামের জাতীয় এয়ারলাইনস এপ্রিল থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই ডজন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট স্থগিত করবে, বলে জানিয়েছে দেশটির বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
“মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিমান জ্বালানি সরবরাহ সীমিত হয়ে আসছে। এই সংকট মোকাবিলায় ঘরোয়া এয়ারলাইনগুলো ঝুঁকিতে আছে। এ কারণেই ঘরোয়া বিমান কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত,” দেশটির সিভিল এভিয়েশন অথরিটি ২৩এ মার্চ এক বিবৃতিতে বলেছে,
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দেশের প্রধান সব অভ্যন্তরীণ রুট এবং আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালু থাকবে।
ভিয়েতনামের এয়ারলাইন্গুলো আন্তর্জাতিক রুটে ফুয়েল সারচার্জ যোগ করার কাজ করছে। যা সম্ভবত এপ্রিল থেকে প্রযোজ্য হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে উদ্যোগী শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কাও জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ হিসেবে ২৪এ মার্চ থেকে স্ট্রিট লাইট, নিয়ন সাইন এবং বিলবোর্ডের আলো বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। দেশের জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় এ পদক্ষেপের মাধ্যমে খরচ ২৫ শতাংশ কমানো লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটির সরকার।
সরকারের মুখপাত্র নালিন্দা জযতিসা সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার কমানো নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, এসব উদ্যোগের ফলে দেশের জ্বালানি খরচ কমবে।
শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যেই তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানে বন্ধ স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ২৪এ মার্চ ঘোষণা করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে স্কুলগুলো দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস চালাবে যেন যানবাহনের উপর চাপ কমে আসে।
এছাড়া সরকারি অফিসের কর্মীদের বেশি সময় বাড়ি থেকে কাজ করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গণপরিবহন বাদে সরকারি গাড়ির ৬০ শতাংশ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিনি জ্বালানি ব্যবহার কমানো ও সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও জানিয়েছেন। এর মধ্যে আছে গাড়ি, এয়ার কন্ডিশনার এবং আসবাবপত্রের ক্রয় বন্ধ করা, মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারি খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমানো হবে। কিছু সেবাকে অনলাইনে নিয়ে যাওয়া হবে। পাকিস্তানে তেলের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে কারণ তাদের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, “অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে আমরা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার নাগরিকদের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে, যদিও বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত।”
(রয়টার্স, এবিসি নিউজ, আল-জাজিরা অবলম্বনে)