মোস্তাফিজ, রাজনীতি ও জবাব দেওয়ার বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যেভাবে ‘না থেকেও আছে’

রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে আইসিসি পুরুষদের দশম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিপর্বজুড়েই ছিল অনিশ্চয়তা আর উত্তেজনা।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে দলে জায়গা পায় স্কটল্যান্ড। আর বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান।

সব অস্থিরতার পর শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়িয়েছে বিশ্বকাপ। উদ্বোধনী দিনে কলম্বোতে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে খেলেছে পাকিস্তান। কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয়েছে স্কটল্যান্ড। আর মুম্বাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ওয়ার্ল্ড কাপ মিশন শুরু করছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত। ঘরের মাঠে খেলতে নামা দলটির দিকে তাকিয়ে আছে কোটি কোটি সমর্থক।

এই জটিলতার শুরু হয়েছিল আরও আগে।

বিশ্বকাপের ঠিক এক মাস আগে বিসিসিআইয়ের নির্দেশে আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়া হয় বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে। নিলামে কেনার পরও পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে বাদ দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।

এরপরই ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে বাংলাদেশ সরকার। নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা জানায়, এই টুর্নামেন্টে অংশ নিতে আগ্রহী নয়।

এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারত সরকারও পাকিস্তানে গিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি না খেলার সিদ্ধান্ত জানায় আইসিসিকে।

আর এবার পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা ১৫ই ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ খেলবে না।

এই তিন ঘটনায় আইসিসির প্রতিক্রিয়া ছিল তিন রকম।

ভারতের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় ও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বাংলাদেশের অনুরোধ সরাসরি নাকচ করা হয়। আর পাকিস্তানের সিদ্ধান্তের পর দ্রুত সাড়া দিয়ে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।

ভারতের অনেকেই বলেন, তারা আগেভাগেই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল তাই পরিস্থিতি আলাদা। তবে সমালোচকদের মতে, পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ভারতেরই একটি সিদ্ধান্ত থেকে—মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে আইসিসির এই ভিন্ন আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

বাংলাদেশের অনুরোধের জবাব দিতে আইসিসির প্রায় তিন সপ্তাহ লেগে যায়। পরে একটি কঠোর ভাষার বিজ্ঞপ্তিতে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংস্থাটি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নরম ভাষায় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হলে আইসিসির প্রায় ২৫ কোটি ডলারের সম্ভাব্য আয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে মাঠে না থাকলেও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের উপস্থিতি একেবারে নেই, এমন নয়।

আইসিসি ঘোষিত ম্যাচ অফিশিয়ালদের তালিকায় আছেন দুই বাংলাদেশি আম্পায়ার শরফুদ্দৌল্লা ইবনে শহীদ ও গাজী সোহেল।

এলিট প্যানেলের সদস্য শরফুদ্দৌল্লা বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ আম্পায়ার। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি যিনি এই প্যানেলে আছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩২টি টেস্ট, ১২১টি ওয়ানডে ও ৭৫টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। আগের বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

অন্যদিকে, গাজী সোহেলের জন্য এটি পুরুষদের প্রথম বিশ্বকাপ। এর আগে তিনি মেয়েদের বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনি চারটি টেস্ট, ২১টি ওয়ানডে ও ৫৯টি টি-টোয়েন্টিতে আম্পায়ারিং করেছেন।

নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ দল ভারতে না গেলেও, চলতি মাসেই শরফুদ্দৌল্লা ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপরই তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে যাচ্ছেন।

শুধু আম্পায়ারিংয়েই নয়, ধারাভাষ্য কক্ষেও থাকছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব।

আইসিসির ঘোষিত ৪০ জন ধারাভাষ্যকারের তালিকায় রয়েছেন সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার আতহার আলী খান। দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার কণ্ঠ পরিচিত।

এর আগেও, গত ৩০শে জানুয়ারি প্রকাশিত ম্যাচ অফিশিয়ালদের তালিকায় ছিল এই দুই আম্পায়ারের নাম।

সব মিলিয়ে, মাঠে বাংলাদেশ দল না থাকলেও, আম্পায়ারিং ও ধারাভাষ্যের মাধ্যমে বিশ্বকাপে দেশের উপস্থিতি থাকছে।

খেলোয়াড় হিসেবে না থাকলেও, নানা ভূমিকায় বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বাংলাদেশের ছাপ রয়ে যাচ্ছে। এই বিশ্বকাপে তাই বাংলাদেশের গল্পটা হয়ে উঠেছে ‘না থেকেও থাকার’ গল্প।

ইংল্যান্ডের সাবেক ব্যাটসম্যান মার্ক বুচার বলেছেন, বাংলাদেশের এই অবস্থান ভবিষ্যতের বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোর জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। এতে ক্রিকেটের স্বচ্ছতা ও মর্যাদা রক্ষা পাবে। ‘উইজডেন ক্রিকেট উইকলি’ পডকাস্টে তিনি এসব কথা বলেন। ইংল্যান্ডের হয়ে ৭১টি টেস্ট খেলা এই ক্রিকেটারের মতে, ক্রিকেটে নীতির প্রশ্নে সবাইকে এক জায়গায় দাঁড়াতে হবে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ যত এগিয়ে এসেছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে , এই টুর্নামেন্ট এখন আর শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বোর্ডরুমের রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর বৈষম্যের বিষয়গুলো।

এই বাস্তবতাই সামনে এনেছেন সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইন।

স্কাই স্পোর্টসের একটি পডকাস্টে মাইকেল আথার্টনের সঙ্গে আলাপচারিতায় নাসের হুসেইন সরাসরি আইসিসি ও বিসিসিআইয়ের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, প্রভাবশালী বোর্ডগুলোর প্রতি আলাদা সুবিধা দেওয়ার কারণেই বিশ্ব ক্রিকেটে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

নাসেরের মতে, এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো। তাই এই দুই দেশের কঠোর অবস্থানকে তিনি ইতিবাচকভাবেই দেখছেন।

তিনি আরও বলেন, কাগজে-কলমে আইসিসি নিরপেক্ষ হলেও বাস্তবে তারা সব বোর্ডের সঙ্গে সমান আচরণ করে না। বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রে “আলাদা নমনীয়তা” দেখা যায়।

নাসের হুসেইনের মতে, এই ধরনের বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাই বিশ্ব ক্রিকেটকে ধীরে ধীরে “একতরফা ও অসম কাঠামোর” দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থান ও বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনেও আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।