ডারউইনের কাছে জমা তেইশটা বছর

২০০৩ সালের ডারউইন টেস্টের খুব বেশি কিছু এখন আর মনে নেই। থাকার কথাও না। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৯৭, দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭৮। অস্ট্রেলিয়া তিনদিনের মধ্যেই ম্যাচ শেষ করে দিয়েছিলো, ইনিংস ও ১৩২ রানে। ওই এটুকুই।

তখন এমন হেরে যাওয়াই স্বাভাবিক ছিলো। বরং বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলছে, এই ব্যাপারটাই ছিল বড় ঘটনা। এক পাশে স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্টরা, অন্য পাশে আমাদের ছেলেরা।

সবাই সাদা পোশাকে। একই লাল বল নিয়ে একই মাঠে খেলছে ঠিকই, কিন্তু দুই দলের মাঝখানের দূরত্বটা ক্রিকেটীয় ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের। শুধু রান দিয়ে তা মাপা যেতো না।

আমরাও তখন অল্প কিছুতে খুশি হতাম। আমাদের আনন্দ হাবিবুল বাশার-হান্নান সরকারের একটা ফিফটি, নতুন বলটা সামলে প্রথম ঘণ্টা পার করা গেলো কি-না, স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলকে মারা মাশরাফির একটা বিরাট ছক্কায় সীমাবদ্ধ ছিল।

অস্ট্রেলিয়ার কোনো বড় ব্যাটসম্যানকে আউট করা গেলেও সেটা আলাদা ঘটনা। জয়ের কথা ভাবার আগে একটা দলকেতো জয়ের গল্পের মধ্যে কল্পনা করতে শিখতে হয়। বাংলাদেশ কী তখনও তা করতে শিখেছিলো?

কিন্তু ওই একই বছর আমরা আরেকটা জিনিস শিখে ফেলেছিলাম, খুব কাছে গিয়ে হারতে কেমন লাগে।

ডারউইনের দুই মাসেরও কম সময় পর মুলতান। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়টা সেদিন প্রায় ছুঁয়ে দেখা যায়, এতো কাছে চলে এসেছিলো। পাকিস্তানের নয় উইকেট পড়ে গেছে। এক পাশে দাঁড়িয়ে ইনজামাম-উল-হক। শেষ পর্যন্ত তিনিই দাঁড়িয়ে রইলেন। পাকিস্তান জিতলো এক উইকেটে।

তেইশ বছর পর ডারউইনে অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার পরও মনে হয়নি ইতিহাস হয়ে গেছে।

সেই ম্যাচেরও সবকিছু আমার মনে নেই। এখন মনে পড়ে একটা ছবি।

খালেদ মাহমুদ মাঠ থেকে ফিরছেন। মাথায় সাদা হ্যাট। মুখের ওপর তোয়ালে চেপে ধরা। কান্নাটা লুকোনো যাচ্ছে না।

আসলে স্কোরতো সব সময় ভুলে যাই, ছবিটা অন্তরে থেকে যায়।

২০০৩ সালের ওই দুই ম্যাচকে পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের একটা আশ্চর্য ছবি দেখা যায়। জুলাইয়ে ডারউইনে আমরা এতোটাই দূরে ছিলাম যে খুব বেশি হৃদয়ও ভাঙেনি।

সেপ্টেম্বরে মুলতানে এসে এতোটাই কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম যে একজন মানুষকে মুখ ঢেকে কাঁদতে হয়েছিল।

সম্ভবত তখন থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম, এই খেলায় আমাদেরও কিছু হারানোর আছে।

তারপর তেইশ বছর।

কত দল এলো, কত অধিনায়ক গেলেন, কত নতুন শুরুর ঘোষণা হলো। কার্ডিফ এসেছে, মিরপুর এসেছে। বড় দলকে হারানো বাংলাদেশের জন্য এখন আর বিশেষ কিছু না।

আবার এমন সব ম্যাচও এসেছে, যেগুলো শেষ হওয়ার পর অনেকক্ষণ বোঝা যায়নি এতো কাছে গিয়ে আবার কীভাবে হারলাম।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকার একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। খুব ভালো কিছু ঘটলেও আগে থেকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না।

ব্যাটসম্যান আশিতে গেলে মনে হয়, এখনই হয়তো একটা অপ্রয়োজনীয় শট সব শেষ করে দেবে। প্রতিপক্ষের নয় উইকেট পড়ে গেলেও শেষ উইকেট জুটিতে না আবার বিশ্ব রেকর্ড হয়ে যায়, তা নিয়ে ভয় শুরু হয়। জিততে ১০-১৫ রান বাকি থাকলেও খুব নিশ্চিন্ত হয়ে বসা যায় না।

এসব কোনো ক্রিকেটের বই শেখায়নি। বাংলাদেশকে দেখতে দেখতে আমরা শিখেছি।

তাই তেইশ বছর পর ডারউইনে অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার পরও মনে হয়নি ইতিহাস হয়ে গেছে। হাসান মাহমুদ ছয় উইকেট নিয়েছেন, দারুণ। কিন্তু ম্যাচ তো তখনও অনেক বাকি।

হাসানের দিকে তাকিয়ে একটা ব্যাপার ভালো লেগেছিলো। তার মুখে খুব বেশি বিস্ময় ছিল না।

অস্ট্রেলিয়ার ছয়টা উইকেট নেওয়ার পর একজন তরুণ পেসারের মুখে যে ধরনের ‘আমি কী করে ফেললাম’ ভাব আমরা একসময় খুঁজতাম, সেটা দেখা গেলো না। মনে হচ্ছিলো, কাজটা কঠিন ছিলো বটে, তবে তিনি ভালোভাবে করেছেন, এখন পরের কাজ।

পরিবর্তন এভাবেই আসে। স্কোরকার্ডে নয়, মানুষের চোখে, শরীরী ভাষায়।

আমাদের প্রজন্ম অস্ট্রেলিয়ার নাম শুনে একটু সোজা হয়ে বসতো। হাসান মাহমুদকে দেখে মনে হচ্ছিলো, তার কাছে স্টিভ স্মিথ একজন ব্যাটসম্যান। খুব ভালো ব্যাটসম্যান, অবশ্যই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাটসম্যানই। ভালো জায়গায় বল ফেলতে হবে। ব্যাটের কানায় লাগাতে হবে। না হলে আবার দৌড়ে এসে বল করতে হবে।

তারপর তানজিদ হাসান।

মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট। সামনে প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড, নাথান লায়ন। আমরা যারা অস্ট্রেলিয়ার পুরোনো দল দেখে বড় হয়েছি, যারা ওয়ার্ন, ম্যাকগ্রা, ব্রেট লিকে দেখে বড়ো হয়েছি, অস্ট্রেলিয়ার নয়া জমানার এই কিংবদন্তিদের দেখে এখনও একটু বাড়তি হৃৎস্পন্দন অনুভব করি।

তানজিদের ব্যাটিংয়ে সেই দুরুদুরু ভাব নেই। দেখা গেলো না। তিনি ১০১ রান করলেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।

এরপর মিরাজ। ব্যাট হাতে ৬৫, বল হাতে ৫ উইকেট। ম্যাচটার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মিরাজ রইলেন বদলে যাওয়া বাংলাদেশের স্লোগান হয়ে।

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে করলো ৪২৬। তেইশ বছর আগে একই ডারউইনে দুই ইনিংস মিলিয়ে করেছিল ২৭৫। এই একটা তুলনার পর খুব বেশি বলার দরকার পড়ে না। মাঝখানের সময়টা যেমন স্পষ্ট দেখা যায়, চোখে পড়ে বিবর্তনটাও।

খালেদ মাহমুদ মাঠ থেকে ফিরছেন। কান্নাটা লুকোনো যাচ্ছে না।

ডারউইন শহরটা অবশ্য পুরোনো আর নতুন ছবিকে পাশাপাশি দেখতে অভ্যস্ত।

শহরটির গল্প চার্লস ডারউনের নাম দিয়ে শুরু হয়নি। এই অঞ্চল তার বহু আগে থেকেই লারাকিয়া মানুষের ভূমি। পরে জাহাজ এসেছে, ইউরোপীয় বসতি এসেছে, নাম বদলেছে।

১৯৪২ সালে ডারউনের আকাশে যুদ্ধ এসেছে। ১৯৭৪ সালের বড়দিনে ঘূর্ণিঝড় ট্রেসি শহরের বড় অংশ প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো। পরে ডারউনকে অনেকটাই নতুন করে গড়তে হয়েছে।

এসবের সঙ্গে একটা ক্রিকেট ম্যাচের জয়-পরাজয়ের তুলনা হয় না। করাটাও উচিত নয়।

আমার শুধু জায়গাটার ব্যাপারটা ভালো লাগে।

একই জায়গায় অনেক বছর পর ফিরে গেলে সময়কে কখনো কখনো চোখে দেখা যায়। রাস্তা চিনতে পারেন, পাশের বাড়িটা নেই। পুরোনো দোকানের জায়গায় অন্য কিছু। যে গাছটা ছোট ছিল, সেটার ছায়া এখন রাস্তার অর্ধেক ঢেকে রাখে।

জায়গাটা একই থাকে। আসলেই কি একই থাকে? বোধহয় না।

বাংলাদেশও এবার ডারউইনে অনেকটা সেভাবেই ফিরেছিল।

২০০৩ সালে যে দেশ থেকে খালেদ মাহমুদরা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশও আর পুরোপুরি নেই। মাঝখানে একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে।

যে পৃথিবী একসময় টেলিভিশনের ওপারের দূরের কোনো জগত ছিলো, সেটাই এখন প্রায় সবসময় হাতে ধরা একটা স্ক্রিনের মধ্যে।

দেশের পথ অবশ্য সোজা ছিল না। উন্নয়ন হয়েছে, বৈষম্য থেকেছে। আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, ভয়ও থেকেছে। রাজনীতি আমাদের ক্লান্ত করেছে। আবার রাস্তায় মানুষকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতেও দেখেছি। চব্বিশের অভ্যুত্থান, দীর্ঘদিনের সরকারের পতন, অনিশ্চয়তা, আবার নির্বাচন, খুব অল্প সময়ে দেশ অনেক কিছু দেখে ফেলেছে।

বাংলাদেশ নিখুঁত হয়নি। বরং আরও জটিল হয়েছে। কিন্তু একটা পরিবর্তন বোধহয় হয়েছে।

পৃথিবীর দিকে তাকানোর সময় আমাদের ঘাড়টা আগের মতো অতটা ওপরে তুলতে হয় না।

ক্রিকেটেও হয়তো সেই পরিবর্তনের কিছুটা এসে পড়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন যখন দাঁড়িয়ে গেলেন, তখন অবশ্য পুরোনো ভয়টা ফিরে এসেছিলো। তিনি সেঞ্চুরি করলেন। রান বাড়ছে। যারা বাংলাদেশকে বহুদিন ধরে দেখে, তাদের মাথায় তখন সম্ভাব্য খারাপ শেষগুলো খুব দ্রুত তৈরি হয়।

লিড কত থাকবে?

একশর বেশি?

দেড়শ?

শেষ দিনে শুরুতেই যদি দুটো উইকেট পড়ে?

এই ‘যদি’গুলো আমাদের খুব পরিচিত।

খালেদ মাহমুদরাই তো প্রথম খুব কাছে গিয়েছিলেন। মুলতানে তারা বুঝেছিলেন, পাকিস্তানের শেষ উইকেটটাও নেওয়া সম্ভব।

মিরাজ বল হাতে এলেন। উইকেট নিতে শুরু করলেন। অস্ট্রেলিয়া থামলো ২৮৪-তে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ৫৭। মাত্র সাতান্ন।

অন্য কোনো দেশের দর্শক হলে হয়তো এই সময় চা বানানোর বিরতি নেওয়াই যেত। কিন্তু আমরা তো সেই প্রজন্মের মানুষ, যেখানে বিপুল সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের ‍বুকে হাতুড়ি পেটার তাল ওঠে।

তানজিদ শূন্য রানে ফিরে গেলেন।

দেশের কত ঘরে তখন একই সঙ্গে ছোট্ট একটা অস্বস্তি নড়েচড়ে বসেছিলো, জানি না। দীর্ঘদিনের বাংলাদেশি দর্শকের মাথায় যে কথাটা আসে, সেটা অনুমান করা কঠিন নয়।

এই তো, শুরু হলো?

তারপর আর কিছু হলো না।

‘আর কিছু হলো না’ ব্যাপারটাই আমার কাছে জয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।

কোনো নাটক হলো না। একটা সহজ লক্ষ্যকে কঠিন করে ফেলার পুরোনো বদভ্যাস দেখা গেলো না। ইতিহাস সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেখে কারও হাত কাঁপলো না।

সাদমান ইসলাম আর মুমিনুল হক রানগুলো করে ফেললেন। মুমিনুল একটা চার মারলেন।

শেষ।

বাংলাদেশ নয় উইকেটে জিতলো।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়।

খেলা শেষ হওয়ার পর ক্রিকেটারদের মুখগুলো দেখছিলাম। উল্লাস ছিল, হাসি ছিল। এমন জয়ের পর থাকবেই। কিন্তু চোখে অবিশ্বাস ছিল না।

একসময় বড় কোনো দলকে হারানোর পর আমাদের প্রথম অনুভূতি ছিল, এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

এবার উল্টো করে ভাবা যায়।

বাংলাদেশ চার দিন ধরে ভালো ক্রিকেট খেলেছে। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ভালো। তাহলে জিতবে না কেন?

এই প্রশ্নটা এতো সহজভাবে করতে পারাটাই হয়তো অনেক বছরের অর্জন।

আর এখানেই আবার খালেদ মাহমুদের সেই ছবিটা মনে পড়ে।

সাদা হ্যাট। মুখে তোয়ালে। চোখের জল।

ছবিটাকে এখন আর শুধু একটা পরাজয়ের ছবি মনে হয় না।

কারণ আজকের বাংলাদেশকে বড় দেখাতে ২০০৩ সালের বাংলাদেশকে ছোট করার কোনো প্রয়োজন নেই।

খালেদ মাহমুদরাই তো প্রথম খুব কাছে গিয়েছিলেন। মুলতানে তারা বুঝেছিলেন, পাকিস্তানের শেষ উইকেটটাও নেওয়া সম্ভব। বড় দলের সঙ্গে শুধু খেলতে নামা নয়, তাদের হারাতে না পারলে কষ্ট পাওয়ার অধিকারও বাংলাদেশের আছে।

ওই কান্নাটা তাই দুর্বলতার ছিলো বলে মনে হয় না।

কোনো জিনিসকে নিজের বলে ভাবতে শুরু না করলে সেটা হারিয়ে মানুষ এভাবে কাঁদে না।

এরপরের প্রজন্ম সেই বিশ্বাসকে আরও একটু এগিয়েছে। কখনো জিতেছে, কখনো আবার হাতের ম্যাচ ছেড়েছে। আর এই ডারউনের দলটা সম্ভবত আরেকটা কাজ করেছে, জেতাটাকে একটু সাধারণ করে দিয়েছে।

একজন পেসার ভালো বল করবে। একজন তরুণ ওপেনার সেঞ্চুরি করবে। একজন অলরাউন্ডার ব্যাট হাতে রান করে পরে বল হাতে পাঁচ উইকেট নেবে। চার দিন ধরে একটা দল অন্য দলের চেয়ে ভালো ক্রিকেট খেলবে।

তারপর সেই দলটা জিতবে। এতটুকুই তো হওয়ার কথা।

হয়তো ২০০৩ সালে ডারউনের হার আর মুলতানের কান্না দেখা কোনো কিশোর আজ রবিবার সকালে এই ম্যাচটাও দেখেছে। তখন যার বয়স দশ-এগারো, এখন সে পয়ত্রিশের কাছাকাছি।

হয়তো তার পাশে নিজের সন্তান বসেছিলো। বাংলাদেশের জিততে ৫৭ রান দরকার দেখে সে খুব স্বাভাবিকভাবে বলে উঠেছে, ‘হয়ে গেছে।’

দৃশ্যটা আমি কল্পনা করছি। কিন্তু দেশের কোনো না কোনো ঘরে কথাটা যে উচ্চারিত হয়েছে, সেটা ভাবতে ভালো লাগে।

বাবা হয়তো সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেননি। ‘হয়ে গেছে’ কথাটা তার প্রজন্ম একটু সাবধানে বলে। তার সন্তানের সেই সাবধানতার দরকার নেই। এই ছোট্ট পার্থক্যের মধ্যে তেইশ বছরের অনেকটা পথ লুকিয়ে আছে।

এক প্রজন্মের কাছে অস্ট্রেলিয়া ছিলো দূরের এক ক্রিকেট প্রবল পরাক্রমশালী শক্তি, যাদের সঙ্গে একই মাঠে দাঁড়ানোই কোনো একসময় বড় ব্যাপার ছিল। পরের প্রজন্মের কাছে অস্ট্রেলিয়া খুব ভালো একটা ক্রিকেট দল। হারানো কঠিন।

কিন্তু প্রতিপক্ষই।

খেলা শেষ হওয়ার পর তাই আবার ২০০৩ সালের ডারউনের স্কোরকার্ডটা দেখা যেতে পারে।

৯৭। ১৭৮।

তারপর মুলতানের সেই ছবি, খালেদ মাহমুদ মুখে তোয়ালে দিয়ে হাঁটছেন।

তার পাশে ২০২৬-এর কয়েকটা ছবি রেখে দেওয়া যায়।

হাসান মাহমুদের হাতে বল।

তানজিদের ব্যাট ওপরে।

মিরাজ আবার বোলিং মার্কে ফিরছেন।

শেষে মুমিনুলের চার।

দুই ডারউনের মাঝখানে একটা মুলতান পড়ে আছে।

আর পড়ে আছে তেইশ বছর।

এই তেইশ বছরে বাংলাদেশ অনেকবার এগিয়েছে, অনেকবার পিছিয়েছেও। ক্রিকেট দলটার পথও সোজা ছিল না। এখনও নয়। সামনেও এমন দিন আসবে, যেদিন এই দলটাকে দেখে আবার মনে হবে কিছুই বদলায়নি।

তবু পুরোনো আর নতুন ছবিটা পাশাপাশি রাখলে একটা পরিবর্তন চোখ এড়ায় না।

২০০৩ সালের ডারউনে আমরা জানতাম, যেতে এখনও অনেক পথ।

মুলতানে গিয়ে প্রথম খুব গভীরভাবে টের পেয়েছিলাম, হয়তো একদিন পৌঁছানো যাবে।

তেইশ বছর পর বাংলাদেশ আবার ডারউইনে ফিরল। এবার জিতে ফিরল।

কথাটা লিখে আরেকবার পড়লাম।

বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে অস্ট্রেলিয়ায় হারিয়েছে।

একসময় এই বাক্যটার আগে-পরে অনেক বিস্ময়বোধক চিহ্ন দরকার হতো বলে মনে হয়।

এখন আর লাগে না।

কথাটা অদ্ভুতভাবে স্বাভাবিক শোনায়।

সম্ভবত এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়াটাই পুরো গল্প।