অস্ট্রেলিয়াকে তাদের ঘরের মাঠে টেস্টে হারিয়ে ইতিহাস গড়লো বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেই বাংলাদেশ দেখিয়ে দিলো, এই সফর শুধু অংশ নেওয়ার জন্য নয়।

ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ৯ উইকেটের জয় এসেছে দলীয় পারফরম্যান্সের অসাধারণ এক সমন্বয়ে।

ব্যাট হাতে তানজিদ হাসান তামিমের শতক, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪, মমিনুল হকের ৪৯ ও মেহেদী হাসান মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রান যেমন বাংলাদেশকে বড় লিড এনে দিয়েছে, তেমনি বল হাতে হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট, শুরুতেই ধসিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং।

এই জয়ের গল্পের শুরুটা অবশ্য বল হাতে। টসে জিতে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বাংলাদেশকে বোলিংয়ে পাঠান। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে অলআউট করে বাংলাদেশ।

মাত্র দুই সেশনের কিছু বেশি সময়েই অস্ট্রেলিয়ার পুরো ইনিংস শেষ করে দেয় বাংলাদেশের পেস আক্রমণ।

বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটি দ্বিতীয়বার, যখন দলের ফাস্ট বোলাররা প্রতিপক্ষের ১০টি উইকেটই তুলে নিয়েছেন।

এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এমন ঘটনা ঘটেছিলো। সেই ম্যাচেও হাসান মাহমুদ নিয়েছিলেন পাঁচ উইকেট। এবার ডারউইনে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকেই।

হাসান মাহমুদের ছয় উইকেট বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম ভিত্তি। ৫৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে একের পর এক আঘাত করেন।

বিশেষ করে ইনিংসের শুরুতেই তার দুটি উইকেট বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। ওপেনার জেক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেডকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শুরুটাই কঠিন করে দেন হাসান।

প্রথম পাঁচ ওভার বল করার পরও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত তাকে আরও দুই ওভার দেন। আর সেই দুই ওভারেই আসে দুই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। হাসানের এই স্পেল অস্ট্রেলিয়াকে শুধু চাপে ফেলেনি, বাংলাদেশের বোলারদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে দেয়।

হাসান মাহমুদের এই পারফরম্যান্স একদিনের গল্প নয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের যে পরিবর্তন, তার অন্যতম প্রতীক তিনি। ঢাকা থেকে ক্যান্টারবেরি, মাঝখানে কলম্বো ও দাম্বুলা হয়ে ডারউইন, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে একের পর এক কন্ডিশনে খেলে নিজেকে আরও শাণিত করেছেন। ডারউইনে এসে সেই পরিশ্রমের বড় পুরস্কার পেলেন ছয় উইকেট নিয়ে।

অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শুরুটাও ছিলো আত্মবিশ্বাসী। আর সেখানেই সামনে চলে আসে তানজিদ হাসান তামিমের গল্প।

মাত্র পাঁচ মাস আগেও তানজিদ পরিচিত ছিলেন মূলত সাদা বলের ক্রিকেটার হিসেবে। কিন্তু ২৩এ মার্চ বাংলাদেশের নির্বাচক কমিটির নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর তাকে টেস্ট ক্রিকেটের ওপেনার হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

লক্ষ্য ছিলো এমন একজন ওপেনার তৈরি করা, যিনি আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে লম্বা সময় উইকেটে টিকে থাকতে পারেন। সেই পরীক্ষা ডারউইনে গিয়ে যেন সোনায় পরিণত হলো।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে, তাদের শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে, নিজের দ্বিতীয় টেস্টেই তানজিদ হাসান তুলে নিলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতক।

মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়নের মতো বোলারদের সামনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যাট করে ১৯৭ বলে করেন ১০১ রান।

তানজিদের এই শতকের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তার ধৈর্য। সাদা বলের ক্রিকেটে যাকে দ্রুত রান করার জন্য চেনা যায়, সেই তানজিদকে ডারউইনে দেখা গেলো সম্পূর্ণ অন্য রূপে। নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক মানসিকতা ধরে রেখেও পরিস্থিতি বুঝে ব্যাট করেছেন তিনি।

তার শতকে ছিলো আটটি চার। বেশিরভাগই এসেছে ড্রাইভ ও পয়েন্ট এবং কভারের পাশ দিয়ে কাট করে। মাঝেমধ্যে অন ড্রাইভ খেলেছেন, আবার বিউ ওয়েবস্টারকে লং অফের ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে দেখিয়েছেন, সুযোগ পেলে আক্রমণ করতেও তিনি প্রস্তুত।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে একজন টেস্ট ওপেনারের কাছ থেকে যে ধৈর্য এবং টেকনিক্যাল দৃঢ়তা বহুদিন ধরে প্রত্যাশা করা হচ্ছিলো, তানজিদের এই ইনিংস সেই জায়গায় নতুন আশার জন্ম দিয়েছে।

তবে শুধু তানজিদের শতকেই থেমে থাকেনি বাংলাদেশের ব্যাটিং। প্রথম ইনিংসে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও খেলেছেন গুরুত্বপূর্ণ ৮৪ রানের ইনিংস। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে তার ইনিংস ছিল দলের জন্য স্থিতিশীলতার প্রতীক।

শান্তর ৮৪ এবং তানজিদের শতকের ওপর ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে বড় লিডের ভিত্তি তৈরি করে। এরপর মমিনুল হকের ৪৯ রানও হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি যখন ব্যাট করেছেন, তখন দলের লক্ষ্য ছিলো অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের লিডকে যতটা সম্ভব বড় করা। মমিনুলের ইনিংস সেই কাজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এরপর আসে মেহেদী হাসান মিরাজের পালা।

প্রথম ইনিংসের শেষ দিকে বাংলাদেশ কিছুটা চাপে পড়ে যায়। ৩০৮ রানে ছয় উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া যখন আশা করছিল বাংলাদেশের লিড খুব বেশি বড় হবে না, তখন মিরাজ একাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেন।

দ্বিতীয় নতুন বলের মাত্র কয়েক ওভার পর ব্যাট করতে নেমে তিনি দ্রুত মুশফিকুর রহিমকে হারান। এরপরও ভেঙে পড়েননি। বরং লেজের ব্যাটারদের নিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসকে টেনে নিয়ে যান।

১৫৪ বলে ৬৫ রানের ইনিংস খেলতে তার সময় লাগে প্রায় চার ঘণ্টা। হাসান মাহমুদের সঙ্গে ৪৬ রানের এবং তাসকিন আহমেদের সঙ্গে আরও ৪৬ রানের জুটি গড়ে মিরাজ বাংলাদেশের ইনিংসকে ৫৩ ওভার পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যান। এতে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে তুলে নেয় ২২৮ রানের বিশাল লিড।

এই ইনিংসটি মিরাজের ক্যারিয়ারেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ইনিংস। বিশেষ করে SENA কন্ডিশনে। এর আগে ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেছিলেন তিনি।

এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৬৫ রান করে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, কঠিন কন্ডিশনে শুধু বল হাতে নয়, ব্যাট হাতেও দলের ভরসা হতে পারেন।

এরপর বল হাতে আবার সামনে আসেন মিরাজ। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে তার পাঁচ উইকেট বাংলাদেশের জয়কে আরও নিশ্চিত করে দেয়।

অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ২৮৪ রানে অলআউট হলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র ৫৭ রান। চতুর্থ দিনের বিকেলেই সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। মমিনুল হকের ব্যাট থেকে আসে জয়সূচক রান।

স্কোরবোর্ডে ব্যবধান ছিল ৯ উইকেটের। কিন্তু এই জয়কে শুধু ব্যবধান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দেশের মাটিতে ২০১৭ সালে একটি টেস্ট জিতেছিলো বাংলাদেশ, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর আগে জয় ছিলো অধরাই। মাত্র তৃতীয়বার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই বাংলাদেশ সেই ইতিহাস তৈরি করলো।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০০৩ সালের পর এই প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেছিলো বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর ফিরে এসে তারা সরাসরি বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দলকে নয় উইকেটে হারিয়ে দিল।

এই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ব্যর্থতাও ছিলো চোখে পড়ার মতো। পুরো ম্যাচে তারা একাধিক ক্যাচ মিস করেছে। মেহেদী হাসান মিরাজকেই দুইবার জীবন দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। মোট পাঁচটি সুযোগ হাতছাড়া করেছে তারা। আর সেই সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন মিরাজ।

ম্যাচের একটি দৃশ্য যেন পুরো গল্পটাকেই প্রতীকী করে তোলে। অস্ট্রেলিয়ার অনুশীলনের সময় গলফ ক্লাব থেকে স্টিভেন স্মিথের একটি বল এসে পড়েছিলো বাংলাদেশের অনুশীলনের নেটে। তখন মিরাজ স্পিন বোলিং কোচ মুশতাক আহমেদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কয়েক দিন পর সেই স্মিথই মিরাজের বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান।

বাংলাদেশ তখন নিজেদের কাজেই মনোযোগী ছিরো। আর সেই মনোযোগের ফল মিলেছে ডারউইনে।

তানজিদের ১০১, শান্তর ৮৪, মমিনুলের ৪৯, মিরাজের ৬৫ ও পাঁচ উইকেট এবং হাসান মাহমুদের ৬ উইকেট, প্রতিটি পারফরম্যান্স আলাদা গল্প বললেও শেষ পর্যন্ত সব গল্প মিলেছে একটি জায়গায়।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টেস্ট জয়গুলোর একটিতে।

ডারউইনের এই জয় শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিবর্তনেরও গল্প।

নতুন ওপেনার তানজিদ দেখালেন, সাদা বলের ক্রিকেট থেকে লাল বলের ক্রিকেটে সফলভাবে যাওয়া সম্ভব। হাসান মাহমুদ দেখালেন, বাংলাদেশের পেস বোলিং এখন শুধু সম্ভাবনার কথা নয়, বড় দলের বিপক্ষেও ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা রাখে।

আর মিরাজ আবারও প্রমাণ করলেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি ব্যাটে-বলে দুদিক থেকেই ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারেন।

ডারউইনে তাই শুধু একটি টেস্ট জেতেনি বাংলাদেশ। তারা নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন একটি অধ্যায় লিখেছে।