বিশ্বকাপে টাকার খেলায় হারলো কারা, জিতলো কারা

বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের লড়াই নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক আয়োজনগুলোরও একটি। মাঠে খেলোয়াড়রা গোল করেন, ট্রফি জেতেন। মাঠের বাইরে ঘুরে বেড়ায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আগের যেকোনো আসরের চেয়ে বড়। এবার খেলেছে ৪৮টি দল। ম্যাচও হয়েছে অনেক বেশি। ফলে দর্শক বেড়েছে, বেড়েছে ব্যবসার সুযোগও। তবে এই অর্থের খেলায় সবাই লাভবান হয়নি। কেউ পেয়েছে বিপুল মুনাফা, আবার কেউ প্রত্যাশা অনুযায়ী আয় করতে পারেনি।

সবচেয়ে বড় লাভ ফিফা'র

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাই এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আর্থিক বিজয়ী।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফা রেকর্ড ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে সেই আয় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডয়েচে ব্যাংক রিসার্চের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ম্যারিয়ন লাবুরের মতে, চার বছরের একটি বিশ্বকাপ চক্রে ফিফার মোট আয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

সম্প্রচার স্বত্ব, স্পন্সরশিপ, লাইসেন্স, আতিথেয়তা সেবা এবং টিকিট বিক্রি থেকেই আসে এই অর্থ। এবার প্রথমবারের মতো ফিফা নিজেদের অফিসিয়াল টিকিট পুনর্বিক্রয় বাজারও চালু করেছে। সেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই ১৫ শতাংশ করে ফি নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে ফিফা। সেটি হলে নতুন বাজার যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি আয়ও আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি সমর্থকদের

বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন সমর্থকেরা।

টিকিটের উচ্চমূল্য এবং চাহিদা বাড়লে দামও বেড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও রসিকতা করে বলেছিলেন, নিজের দেশের প্রথম ম্যাচের টিকিট যদি এক হাজার ডলার হয়, তাহলে তিনিও সেটি কিনবেন না।

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালের টিকিটের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার। পুনর্বিক্রয় বাজারে কিছু টিকিটের দাম দুই মিলিয়ন ডলারেরও বেশি পর্যন্ত উঠেছিল।

এর বাইরে বিমান ভাড়া, হোটেল, খাবার এবং স্থানীয় যাতায়াতের খরচও অনেক বেড়েছিল।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় নিউ জার্সি ট্রানজিটের ট্রেন ভাড়া নিয়ে। সাধারণ সময়ে যে যাত্রার ভাড়া ছিল ১২ দশমিক ৯০ ডলার, বিশ্বকাপ উপলক্ষে সেটি বাড়িয়ে ১৫০ ডলার করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে ভাড়া কিছুটা কমানো হলেও আগের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

সম্প্রচারকারী ও স্পন্সরদের নতুন আয়ের সুযোগ

বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তবে বিজ্ঞাপন বিক্রি থেকে সেই অর্থের বড় অংশ ফিরে পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপে চালু হওয়া পানি বিরতি সম্প্রচারকারীদের জন্য নতুন একটি বাণিজ্যিক সুযোগ এনে দিয়েছে। ফক্স স্পোর্টস এই বিরতিকে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের নামে প্রচার করেছে।

বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ফক্সে বিশ্বকাপের ৩০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপনের দাম ছিল গড়ে দুই লাখ থেকে তিন লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ এবং টুর্নামেন্টের শেষ দিকে সেই মূল্য সাত লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়।

বিশ্লেষকদের ধারণা, শুধু পানি বিরতির বিজ্ঞাপন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৫ কোটি ডলার আয় হতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের দর্শকেরা বিবিসি এবং আইটিভিতে এসব বিজ্ঞাপন দেখেননি। কারণ বিবিসিতে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় না। আর আইটিভির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ নেই।

বিশ্বকাপের অফিসিয়াল স্পন্সর অ্যাডিডাস, কোকাকোলা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এই আসরকে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রচারের বড় সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে।

মাঠের বাইরের বড় বিজয়ী ডেভিড বেকহ্যাম

খেলা ছাড়ার এক দশকেরও বেশি সময় পরও ডেভিড বেকহ্যাম বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত বাণিজ্যিক মুখগুলোর একজন।

বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে নিয়মিত দেখা গেছে তাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা তার সংস্করণও ছিল অ্যাডিডাসের প্রচারণায়।

তিনি সহমালিক হওয়া ইন্টার মায়ামির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। মাঠে বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও বাণিজ্যিক দুনিয়ায় তিনি এখনো অন্যতম সফল নাম।

আয়োজক শহরের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি

বিশ্বকাপকে ঘিরে আয়োজক শহরগুলোতে পর্যটকের ভিড় ছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফিফার হিসাবে বিশ্বকাপ বিশ্ব অর্থনীতিতে ৪১ বিলিয়ন ডলার যোগ করবে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই যোগ হবে ১৭ বিলিয়ন ডলার। তৈরি হবে প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান।

তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলেকজান্ডার বাডজিয়ারের মতে, বাস্তবে এমন বড় ক্রীড়া আসরের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব খুবই সীমিত।

তার ভাষায়, অনেক সাধারণ পর্যটক এই সময় ভিড় এড়াতে অন্য গন্তব্য বেছে নেন। ফলে নতুন যে আয় হয়, তার একটি অংশ অন্য খাতের ক্ষতিতে মিলিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, যে কর্মসংস্থান তৈরি হয় তার বেশির ভাগই কম মজুরির আতিথেয়তা খাতের। এতে চাকরি তৈরি হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টি হয় না।

প্রত্যাশার চেয়ে কম ব্যবসা হোটেল খাতে

বিশ্বকাপ ঘিরে হোটেল ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ বুকিংয়ের আশা করেছিলেন, বাস্তবে তা হয়নি।

কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া হোটেল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ভ্যাঙ্কুভারে সাতটি ম্যাচ হলেও জুন এবং জুলাই মাসে বুকিং আগের বছরের তুলনায় কম ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল মালিকদের সংগঠনও অভিযোগ করেছে, ফিফা নিজেদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কক্ষ আগে থেকেই সংরক্ষণ করায় কৃত্রিম চাহিদার ধারণা তৈরি হয়েছিল। যদিও ফিফা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ডয়েচে ব্যাংক রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেল ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তাদের বুকিং প্রত্যাশার চেয়ে কম ছিল। নিউ ইয়র্ক এবং সিয়াটলের অনেক হোটেল মালিকও একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।

বাজির বাজারে নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনা

বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া বাজির আসরে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ম্যাককোয়ারির হিসাবে, পুরো টুর্নামেন্টে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজি ধরা হতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি ম্যাচে গড়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বাজি।

এবার ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে ১০০ এর বেশি হওয়ায় বাজির পরিমাণও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বাজির বড় অংশই হয় খেলা চলাকালে। ম্যাচের পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজির ধরনও বদলে যাচ্ছে।

২০১৮ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে নেভাডা ছাড়া অন্য কোথাও ক্রীড়া বাজি বৈধ ছিল না। পরে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের পর অনেক অঙ্গরাজ্যে এটি বৈধ হয়। তবে ক্যালিফোর্নিয়া ও টেক্সাসের মতো কিছু অঙ্গরাজ্যে এখনো ক্রীড়া বাজি নিষিদ্ধ। সেখানে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে প্রেডিকশন মার্কেট, যা আইনের দৃষ্টিতে জুয়া হিসেবে বিবেচিত হয় না।