মেসি জাদুতেই চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের দ্বারপ্রান্তে আর্জেন্টিনা 

চার বছর আগে মনে হয়েছিল লিওনেল মেসির গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে। ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতে তিনি বলেছিলেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। অনেকের চোখে সেদিনই ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছিলেন তিনি।

তারও চার বছর আগে চিত্রটা ছিলো একেবারে ভিন্ন। ২০১৮ বিশ্বকাপের সময়, ৩১ বছর বয়সী মেসিকে ঘিরে অনেকেই মনে করেছিলেন, হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আর কখনও পূরণ হবে না। এমনকি তার ঘনিষ্ঠরাও বিশ্বাস করেছিলেন, সেটিই হয়তো ছিল তার শেষ বিশ্বকাপ।

কিন্তু ২০২৬ সালে এসে ৩৯ বছর বয়সী মেসি যেন নতুন গল্প লিখছেন।

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন তিনি। দুই গোলেই ছিলো তার অ্যাসিস্ট।

এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তার গোল আটটি, অ্যাসিস্ট চারটি। অর্থাৎ গোলের তালিকায় যৌথভাবে সবার ওপরে, আর অ্যাসিস্টের তালিকায়ও অন্যতম সেরা।

রবিবার নিউ জার্সিতে ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেন। যে দেশেই জীবনের সবচেয়ে বড় সময় কাটিয়েছেন বার্সেলোনার হয়ে।

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, “সে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তার আর কিছু করার নেই। স্পেনের বেশিরভাগ মানুষও তাকে ভালোবাসে।”

সাবেক ইংলিশ ফুটবলার মাইকা রিচার্ডস বলেন, “আর্জেন্টিনার দলে লিওনেল মেসি আছে। সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় আছে। বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেয় এমন মুহূর্তই সবকিছু বদলে দেয়। আমরা ভেবেছিলাম সেটা হয়তো জুড বেলিংহাম বা হ্যারি কেইন করবে। কিন্তু এ কারণেই মেসিই রাজা।”

যেভাবে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে দিলেন মেসি

ক্যারিয়ারে এর আগে কখনও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি মেসি।

প্রথমার্ধে মাঝমাঠে খেলতে নেমে কয়েকবার নিজের দক্ষতার ঝলক দেখিয়েছিলেন। তবে আসল মেসিকে দেখা যায় ম্যাচের শেষ দিকে।

৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। এরপরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।

ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল আরও রক্ষণাত্মক খেলোয়াড় নামান। দলও অনেকটা নিজেদের অর্ধে সরে যায়।

এই সুযোগে পরের ৩৭ মিনিটে বলের দখলের ৮৮ শতাংশই ছিল আর্জেন্টিনার। আর মেসি ডান প্রান্তে চলে গিয়ে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন।

গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বলেন, “মেসিকে ডান প্রান্তে নিয়ে যাওয়াটাই আমাদের সবচেয়ে বড় কৌশল ছিল।”

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সফলভাবে ৯টি ড্রিবল করেছেন মেসি, দুটি গোলেই ছিল অ্যাসিস্ট। 

১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে এক ম্যাচে এই দুই কীর্তি একসঙ্গে গড়া প্রথম ফুটবলার তিনি।

অন্যদিকে পুরো ইংল্যান্ড দল মিলে সফল ড্রিবল করেছে মাত্র সাতটি।

প্রতিপক্ষের বক্সে মেসির স্পর্শ ছিল সাতবার। ইংল্যান্ডের পুরো দল মিলিয়েও ছিল ঠিক সাতবার। একাই চারটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন। সেটিও ইংল্যান্ডের পুরো দলের সমান।

সবচেয়ে বেশি ৯টি ক্রসও করেছেন মেসি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শেষ দুটি পাস।

৮৫ মিনিটে কর্নার থেকে এনজো ফার্নান্দেজকে বল বাড়িয়ে সমতায় ফেরান আর্জেন্টিনাকে।

আর যোগ করা সময়ে তার নিখুঁত ক্রস থেকেই হেডে জয়সূচক গোল করেন লাউতারো মার্টিনেজ।

মাইকা রিচার্ডস বলেন, “সে অনেক সময় মাঠে হেঁটে বেড়ায়। কিন্তু বল পায়ে এলেই যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়। তখনই তার প্রতিভা ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দেয়।”

সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট বলেন, “ইংল্যান্ড আগের কয়েকটি ম্যাচের মতোই নিজেদের রক্ষণ বন্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু তাতেই মেসি আরও বেশি স্বাধীনতা পেয়ে যায়। শেষ ১৫ মিনিটে পুরো ম্যাচ সে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।”

ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইনও মেসির প্রশংসা করে বলেন, “ম্যাচের বেশিরভাগ সময় আমরা তাকে ভালোভাবেই সামলেছি। কিন্তু বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মতোই বল পেলে সে যেকোনো মুহূর্তে কিছু একটা করে ফেলতে পারে। এ কারণেই সে সর্বকালের অন্যতম সেরা।”এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মেসির গোল আটটি, অ্যাসিস্ট চারটি। অর্থাৎ গোলের তালিকায় যৌথভাবে সবার ওপরে, আর অ্যাসিস্টের তালিকায়ও অন্যতম সেরা।

গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে এগিয়ে মেসি

এই গ্রীষ্মেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে তার মোট ১২৫ গোলের মধ্যে বিশ্বকাপেই এসেছে ২১টি। এর মধ্যে ১৫টি গোল করেছেন ৩৫ বছর বয়স পার হওয়ার পর।

এবারের বিশ্বকাপেই করেছেন আটটি গোল। ২০২২ সালে করেছিলেন সাতটি।

গোলের দৌড়ে এখন তার সঙ্গে সমতায় আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে।

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্সের সামনে আরও একটি সুযোগ থাকলেও মেসি এগিয়ে আছেন আরেকটি জায়গায়।

গোল সমান হলে নির্ধারণ হবে অ্যাসিস্ট দিয়ে। সেখানে মেসির চারটি অ্যাসিস্ট, এমবাপের তিনটি।

অর্থাৎ ফাইনালে আরও একটি গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করতে পারলে গোল্ডেন বুট জেতার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যাবে।

একই সঙ্গে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টদাতাও হতে পারেন তিনি।

সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পল রবিনসন বলেন, “সে সত্যিই এক জাদুকর। পুরো টুর্নামেন্টেই সে এমন ফুটবল খেলছে। গোল করছে, আবার এমন সব বল দিচ্ছে যেখান থেকে গোল তৈরি হচ্ছে।”

ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষেও যদি কোনো গোলে অবদান রাখতে পারেন, তাহলে ২০১১ সালের নিজের টানা ১৪ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড স্পর্শ করবেন মেসি।

মেসি কি সত্যিই থামবেন?

২০১৬ সালে ২৯ বছর বয়সে জাতীয় দল থেকেই অবসর নিয়েছিলেন মেসি। তার আগে ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং টানা তিনটি কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারার যন্ত্রণা ছিল তার সঙ্গী।

পরে সিদ্ধান্ত বদলে জাতীয় দলে ফিরে আসেন। ফিরেই জেতেন টানা দুটি কোপা আমেরিকা।

২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর মনে হয়েছিলো, ক্যারিয়ারের অসমাপ্ত সব গল্প শেষ হয়ে গেছে। নিজেও বলেছিলেন, বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটি ফাইনালেই খেলতে পারছেন, সেটিই সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।

আরও বলেছিলেন, পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

এরপর ইউরোপ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ক্যারিয়ারের শেষ সময়টা এখন শুধু উপভোগ করবেন।

এমনকি গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপের সময়ও নিশ্চিত ছিল না, তিনি আদৌ ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলবেন কি না।

কিন্তু আবারও সবাইকে ভুল প্রমাণ করেছেন মেসি। এখন তার খেলার ধরন বদলে গেছে।

এই বিশ্বকাপে তিনি মোট দৌড়ানো দূরত্বের ৪৭ শতাংশই হেঁটেছেন। মাঠের সব আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সেটিই সবচেয়ে বেশি।

স্প্যানিশ সাংবাদিক ও মেসির জীবনীকার গিয়েম বালাগের মতে, নিজের ক্যারিয়ারে অন্তত পাঁচবার কৌশলগতভাবে নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন মেসি।

বর্তমানে ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার হয়ে টানা ১৩ ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।

ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষেও যদি কোনো গোলে অবদান রাখতে পারেন, তাহলে ২০১১ সালের নিজের টানা ১৪ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড স্পর্শ করবেন।

এ ছাড়া ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর পর মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে খেলবেন তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে।

তাহলে কি এটাই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ?

২০৩০ বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৪৩ বছর। তবে লিওনেল মেসিকে নিয়ে এখন আর নিশ্চিত করে কিছু বলার সাহস খুব কম মানুষেরই আছে। কারণ বারবার তিনি প্রমাণ করেছেন, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলাই যেন তার সবচেয়ে বড় অভ্যাস।