আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: লড়াইটা ইতিহাসের সঙ্গে কৌশলেরও

ইতিহাস দুই দলের মধ্যে বিভেদ টেনে দিয়েছে অনেক আগেই। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ আর ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ওই উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছিলো আরও। সময়ের সঙ্গে তা কমে এলেও, ২১ বছর পর ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা যখন মুখোমুখি হচ্ছে, বারবারই ঘুরেফিরে আসছে ওসব প্রসঙ্গ।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচটির টিকিটের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে, দুই দলের সমর্থকদের বিবাদ এড়াতে বাড়ানো হয়েছে আটলান্টার নিরাপত্তাও। তবে মূল লড়াইটা তো হবে ফুটবল মাঠেই। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত স্কিলের সঙ্গে যেখানে ব্যবধান গড়বে খেলার কৌশলও। তা কেমন হতে পারে?

দুই কোচের ট্যাকটিকাল দিকগুলো দেখলেই তা বোঝা যাবে কিছুটা। দুই দলেই যেমন বিশ্বমানের আক্রমণভাগ আছে, তেমনি তাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে আগের ম্যাচগুলোতে। সেমিফাইনালে তাহলে কেমন হতে পারে দুই দলের কৌশল?

বলের দখল রাখতে চাইবে আর্জেন্টিনা

নিখুঁতভাবে বল নিয়ন্ত্রণ রাখা লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনার কৌশলের মূল ভিত্তি। তবে এই ম্যাচে তাদের বল দখলে রাখাটা কেবল আক্রমণের জন্য নয়, রক্ষণাত্মক দিক থেকেও জরুরি।

লিওনেল মেসির বয়স এখন ৩৯ বছর। পুরো ৯০ মিনিট ধরে নিচে নেমে ডিফেন্স করা, লং বলের পেছনে দৌড়ানো বা প্রতিপক্ষকে প্রেস করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তিনি তা করবেনও না। মেসির সেরাটা পেতে হলে আর্জেন্টিনাকে অবশ্যই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে হবে।

ধীরস্থিরভাবে পাসিংয়ের মাধ্যমে তারা ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে, যা মাঠের মধ্যেই মেসিকে শারীরিকভাবে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেবে। তারা মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ধীরে ধীরে বল পাস করবে ও ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের মনোযোগ হারানো বা পজিশন ছেড়ে বেরিয়ে আসার অপেক্ষা করতে পারে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ এই মুহূর্তে অন্যতম সেরা ও কৌশলগতভাবে দক্ষ। এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো খেলোয়াড়রা দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। তাদের লক্ষ্য থাকবে ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডারদের টেনে ওপরে তুলে আনা।

নিজেদের অর্ধে ও মাঝমাঠে আর্জেন্টিনা যখন ধৈর্য ধরে পাস খেলতে থাকবে, তখন ইংল্যান্ড তাদের প্রেসিং করতে প্রলুব্ধ হবে। ইংল্যান্ডের মিডফিল্ড যখনই প্রেস করতে ওপরে উঠে আসবে, তখনই পাসিং লেন তৈরি হবে ও মেসি ফাঁকায় বল পেয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এমন পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন মেসি।

রক্ষণাত্মক ‘মিড-ব্লক’ কৌশল বেছে নিতে পারে ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডের জন্য আর্জেন্টিনার সঙ্গে মাঝমাঠে পাসিংয়ের পাল্লা দিতে যাওয়া হবে মারাত্মক ভুল। ইংল্যান্ড যদি আর্জেন্টিনার ওপর হাই-প্রেস করতে যায়, তাহলে তারা স্কালোনির পাতা ফাঁদেই পা দেবে।

আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডাররা সহজেই সেই হাই-প্রেস ভেঙে বেরিয়ে যাবে, মেসি ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের সামনে বিশাল ফাঁকা জায়গা পেয়ে যেতে পারেন তখন।

আরেকদিকে অতিরক্ষণাত্মক ‘লো-ব্লক’ কৌশলও সমান বিপজ্জনক হতে পারে। ইংল্যান্ড যদি খুব বেশি নিচে নেমে ডিফেন্স করে, তাহলে তারা আর্জেন্টিনাকে ক্রমাগত আক্রমণের সুযোগ করে দেবে। এতে মেসি ‘জোন ১৪’-এ (পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরের অত্যন্ত বিপজ্জনক এলাকা) কোনো বাধা ছাড়াই বল পেয়ে যাবেন।

সেখান থেকে মেসি সহজেই শট নিতে পারেন কিংবা ডিফেন্সের ওপর দিয়ে মাপা চিপ পাসে বল বাড়িয়ে দিতে পারেন। তাই ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে ‘মিড-ব্লক’ তৈরি করা।

মিড ব্লক তৈরির মাধ্যমে ইংল্যান্ড বলের দখল আর্জেন্টিনার হাতে ছেড়ে দেবে এবং তাদের নিজেদের অর্ধে (যেখানে ভয়ের কিছু নেই) বল নিয়ে খেলার সুযোগ দেবে।

ইংল্যান্ড মাঠের মাঝখানের জায়গা সংকুচিত করে ফেলবে, যার ফলে ডেকলান রাইস ও রক্ষণভাগের সামনে একটি শক্তিশালী দেয়াল তৈরি হবে। এটা মেসিকে লাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গা দেবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মিড ব্লক কৌশলের কারণে বুকায়ো সাকার মতো ইংল্যান্ডের গতিময় উইঙ্গাররা মাঠের কিছুটা ওপরের দিকে থাকতে পারবেন।

ইংল্যান্ড বল কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আর্জেন্টিনার আক্রমণে উঠে যাওয়া ফুলব্যাকদের রেখে যাওয়া বিশাল ফাঁকা জায়গায় দ্রুত গতিতে কাউন্টার অ্যাটাকে যেতে পারবে।

ডিফেন্সিভ ট্রানজিশনে ভাগ্য নির্ধারণ

ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে ‘ট্রানজিশন প্লে’-র মাধ্যমে। অর্থাৎ বল হারানোর ঠিক পরের সময়টাতে কে কেমন করছে। দুই দলেরই আক্রমণের ধরন এমন, বল হাতছাড়া হলেই তারা মারাত্মক রক্ষণাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে যায়।

আর্জেন্টিনা যখন আক্রমণ করে, তখন তাদের ফুল ব্যাকরা মাঠের অনেক ওপরে উঠে যায়। রক্ষণে মাত্র দুইজন সেন্ট্রাল ব্যাক ও বড়জোড় একজন মিডফিল্ডার থাকেন। ইংল্যান্ড যদি বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত ট্রানজিশন করতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

আরেকদিকে ইংল্যান্ড যখন আক্রমণে যায়, তখন হ্যারি কেইন কিছুটা নিচে নেমে আসেন ও জুড বেলিংহ্যাম দ্রুত ওপরে উঠে যান। এই অবস্থায় ইংল্যান্ড যদি বল হারায়, তাহলে তাদের মাঝমাঠের কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।

এতে ডেকলান রাইস ও নিচে নেমে আসা ডিফেন্ডারদের মধ্যে এক ধরনের ফাঁকা জায়গায় তৈরি হয়, যা পাল্টা আক্রমণের সময় মেসির সুবিধা নেওয়ার জন্য আদর্শ জায়গা।

যেহেতু নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোতে দুই দলই দেখিয়েছে যে বল পা বদল হওয়ার পর তারা রক্ষণ সামলাতে হিমশিম খায়, তাই কোনো দলেরই ধীরগতির ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলে এই ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা কম।