যে কারণে মরক্কো বিশ্বকাপ জিতে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না

মরক্কোর রূপকথা এবারও চলছে। তবে এবার তাদের গল্পে সৌন্দর্যের চেয়ে বাস্তবতা আর লড়াইয়ের ছাপ বেশি।

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে স্বাগতিক দেশ কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে উত্তর আফ্রিকার দলটি। কিন্তু স্কোরলাইন দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, মরক্কো হয়তো দাপট দেখিয়ে জিতেছে। বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন।

পুরো ম্যাচে মরক্কো গোলবারের দিকে মাত্র পাঁচটি শট নিয়েছিলো। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জেতা কোনো দলের জন্য যা সবচেয়ে কম। এমনকি প্রথমার্ধে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শটের চেয়ে হলুদ কার্ডের সংখ্যা ছিলো বেশি।

তবু জয় পেয়েছে মরক্কো। কারণ বড় দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ভালো না খেলেও জিততে জানা। আর সেই জায়গায় মরক্কো এখন নিঃসন্দেহে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই বিশ্বকাপে তারা এখনো অপরাজিত। শুধু তাই নয়, সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৪ ম্যাচ হারেনি দলটি।

যদিও এই পরিসংখ্যানে একটি বিতর্কিত বিষয় আছে। ২০২৬ আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সের ফাইনালে সেনেগালের বিপক্ষে পাওয়া জয়টি পরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মরক্কোর নামে যোগ করা হয় এবং সেটি এখনো আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

তবুও টানা এত ম্যাচ অপরাজিত থাকা যে অসাধারণ অর্জন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সবশেষে মরক্কো হেরেছিলো ২০২৫ সালের অগাস্টে আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপে কেনিয়ার কাছে।

কানাডার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুটা অবশ্য সহজ ছিলো না। প্রথম ১৫ মিনিটে কানাডা দুটি ভালো সুযোগ তৈরি করে। গোলরক্ষক বোনো দারুণ দুটি সেইভ করে দলকে বাঁচান। অন্যদিকে মরক্কো প্রথম ১৫ মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সে একবারও বল ছুঁতে পারেনি। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে এমন ঘটনা ঘটলো।

শুরুটা সামলে নেওয়ার পর অবশ্য ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় মরক্কো। কানাডার কোচ জেসি মার্শ পরে বলেছিলেন, “মরক্কো কিছুটা চাপে পড়েছিলো, কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েনি।”

সত্যিকারের শিরোপা দাবিদার

দুটি প্রতিভাবান প্রজন্মের দলের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত উজ্জ্বল ছিলো মরক্কোই। ইনজুরিতে থাকা কানাডার তারকা আলফোনসো ডেভিস বেঞ্চে বসে দেখেছেন, কীভাবে মরক্কো স্টিফেন ইউস্তাকিওর পাসিং পুরোপুরি আটকে দিয়েছে। একই সঙ্গে কানাডার প্রধান গোলদাতা জনাথন ডেভিডকেও কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রেখেছে।

অন্যদিকে মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি পুরো ম্যাচে ছিলেন দুর্দান্ত। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণেও ছিলেন ভয়ংকর। আর ব্রাহিম দিয়াজ করেছেন দুটি অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপে এখন তার মোট চারটি অ্যাসিস্ট, যা কোনো আফ্রিকান ফুটবলারের সর্বোচ্চ।

মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওআহবি ম্যাচ শেষে বলেন, প্রথমার্ধ ছিলো খুব কঠিন। বিরতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। চাপ ছিলো, কিন্তু দল নিজেদের ফুটবল দর্শন থেকে একটুও সরে যায়নি।

তার ভাষায়, “বিশ্বকাপে খেলতে এলে কঠিন সময় আসবেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো, যখন আমরা সেরা অবস্থায় থাকব না, তখনও যেন লড়াই চালিয়ে যেতে পারি। আমরা কার জন্য খেলছি এবং কেন খেলছি, সেটি কখনো ভুলে যাওয়া যাবে না।”

এই জয় মরক্কোকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে।  বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এখন পর্যন্ত মরক্কোর জয় চারটি।

২০২২ সালে দুটি এবং এবারও দুটি। আফ্রিকার বাকি সব দেশের নকআউট জয়ের সংখ্যাও মোট চারটি। অর্থাৎ একাই পুরো মহাদেশের সমান।

আর একটি ম্যাচ জিতলেই ২০২২ সালের সেই ঐতিহাসিক সেমিফাইনালের সাফল্যের সমান কীর্তি গড়বে তারা।

এখনো সেরাটা দেখা বাকি

অনেকের মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে, মরক্কো কি সত্যিই তাদের সেরা খেলাটা খেলেছে? গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করে দারুণ শুরু করেছিলো তারা।

এরপর স্কটল্যান্ডকে কঠিন লড়াইয়ে হারিয়েছে, আবার হাইতির বিপক্ষে জিতেছে ৪-২ ব্যবধানে।

নকআউটের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তারা ভালো খেললেও অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে গোল করে বিদায় এড়াতে হয়েছিলো।

কানাডার বিপক্ষে জয় এলেও পারফরম্যান্স খুব বেশি ঝকঝকে ছিলো না। বিবিসির বিশ্লেষক ক্রিস সাটনের মতে, মরক্কো প্রথমার্ধে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ধীর ছিলো।

যদি তারা ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একইভাবে শুরু করে, তাহলে বড় বিপদে পড়তে পারে। তবে ম্যাচ যত এগিয়েছে, মরক্কো ততই শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে পাল্টা আক্রমণে তারা ভয়ংকর।

পেছনে দীর্ঘ পরিকল্পনা

মরক্কোর এই উত্থান রাতারাতি হয়নি। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই আজকের এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

তার উদ্যোগে ২০০৯ সালে একটি আধুনিক ফুটবল একাডেমি এবং ২০১৯ সালে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।

এই অবকাঠামোই মরক্কোকে আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দলে পরিণত করেছে।

কোচ ওআহবি বলেন, “আজ মরক্কোর ফুটবলে যা কিছু ঘটছে, তার বড় কৃতিত্ব রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠের। বিশেষ করে এই একাডেমির জন্য।”

১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে চারটি বিশ্বকাপের তিনটিতে খেলেছিলো মরক্কো। এরপর দীর্ঘ ২০ বছর তারা বিশ্বকাপে জায়গাই পায়নি।

পরিকল্পিত বিনিয়োগের ফলে শুধু দেশের ভেতরের ফুটবল নয়, বিদেশে জন্ম নেওয়া মরক্কো বংশোদ্ভূত ফুটবলারদেরও জাতীয় দলে আনা সম্ভব হয়েছে। আশরাফ হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজ দুজনই স্পেনে জন্ম নেওয়া ফুটবলার।

এই পরিকল্পনাই মরক্কোকে শুধু শক্তিশালী দল বানায়নি, দিয়েছে আত্মবিশ্বাসও। এখন আফ্রিকা ও আরব বিশ্বের অনেক দেশই মরক্কোর পথ অনুসরণ করতে চাইছে।

ওআহবি বলেন, “এখন আর কেউ আমাদের চমক বলে না। মানুষ এখন মরক্কোকে সত্যিকারের শিরোপার দাবিদার এবং বড় ফুটবল শক্তি হিসেবেই দেখে। এটা আমাদের জন্য গর্বের।”

তিনি আরও বলেন, “এটাই শেষ নয়। আমরা চাই আগামী বছরগুলোতেও এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। আমরা থেমে যেতে চাই না।”

২০২২ সালের বিশ্বকাপে মরক্কোর সাফল্য ছিলো অনেকটা রূপকথার মতো। কিন্তু এবার সেই অনুভূতির জায়গা নিয়েছে আত্মবিশ্বাস আর লক্ষ্য।

তাই মরক্কো যদি এবার বিশ্বকাপ জিতে যায়, সেটিকে আর অঘটন বলা যাবে না। বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সঠিক বিনিয়োগ, প্রতিভাবান ফুটবলার এবং দুর্দান্ত মানসিক শক্তির স্বাভাবিক পরিণতি বলেই মনে হবে।