হাডসন ইয়ার্ডে কেপ ভার্দের জন্য কেঁদেছে বৃষ্টিও

নিউইয়র্কের হাডসন ইয়ার্ডে ফিফা ফ্যান জোনে আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও ভিড় কমছিলো না। বরং মনে হচ্ছিলো, খেলা শেষ হলেও রাতটি যেন তার শেষ উচ্চারণ এখনো বাকি রেখেছে। আমার চোখে ফ্যান জোনটা তখন একেবারে জীবন্ত এক সিনেমার সেট—কেউ ভেজা জার্সি চেপে ধরে দাঁড়িয়ে, কেউ ফোনে লাইভ করছে, কেউ আবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে, যেন ছেড়ে দিলেই প্রিয় আর্জেন্টিনা, প্রিয় মেসিরা বাদ পরে যাবে বিশ্বকাপ থেকে! শহরের কংক্রিট, আলো আর মানুষের কোলাহলের মধ্যে ফুটবল আরও বেশি প্রাণের সঞ্চার করছিলো। 

শুরুতেই ম্যাচ শেষের আবহে চলে এসেছি। এবার শুরুর আবহে ফেরা যাক। তখনও বিকেল হয়নি। নিউইয়র্কে কেউ চারটার সময় বিকেল বললে গালি খেতে হয়। এখানে সূর্য ডোবে ৮টার অনেক পরে। মেসিরা মাঠে নামবে সন্ধ্যা ৬টায়। হাতে দুই ঘন্টা সময় নিয়ে এসেছি। হাডসনের ফিফা জোনে এই প্রথম আমার কদম পরলো। একটু সময় না নিয়ে এলে কি হয়!

খোলা আকাশের নিচে বড় স্ক্রিন, চারপাশে খাবারের সুবাস, আর বসার জায়গা দখল করে নেওয়ার তাড়া—সব মিলিয়ে একেবারে পূর্ণাঙ্গ ম্যাচ ডে পরিবেশ। আর্জেন্টিনার সমর্থক সংখ্যায় বেশি, তবে কেপ ভার্দের ছোট্ট সমর্থকগোষ্ঠীও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পিছিয়ে নেই। তাদের কণ্ঠ ছিল দৃঢ়, বিশ্বাস ছিল অটল, আর সেই বিশ্বাস ভিড়ের মাঝেই তৈরি করেছিলো এক আলাদা সুর। 

খেলার আগে এক আর্জেন্টাইন ফ্যানের সাথে খোশ গল্প হলো। হার্নান্দেজ নামের ২৫ বছরের এক যুবক, নিউইয়র্কেই স্থায়ী। বাবা আর্জেন্টাইন, মা মেক্সিকান। কিছুটা নিচু গলায় সে বলল, “কেপ ভার্দে যেভাবে খেলছে বিশ্বকাপে, ওদের হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।” তার পাশেই দাঁড়ানো আরেক মেসি ভক্ত বলে উঠলেন, “আজ লিও’র হ্যাটট্রিক ডে!”

কেপ ভার্দের এক সমর্থক পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বললেন, “আমরা হয়তো কম, কিন্তু আমাদের শব্দ কম নয়। আজ আমরা শুধু খেলবো না, লড়াইও করবো।” 

খেলার ভেতরেও কেপ ভার্দে সহজে হার মানেনি। আর্জেন্টিনাকে বারবার চাপে রেখে বিশ্বকাপে কী দারুণ এক ম্যাচ উপহার দিলো। ২-২ সমতায় কেউ কি জানতো, ম্যাচের পরের গল্পে কি লেখা আছে?

ফুটবল ঈশ্বর নিশ্চয়ই জানতেন! জানতেন বলেই আবারও মেসি ম্যাজিক। গোল আগেই করেছেন। অ্যাসিস্ট বাকি ছিলো। সেই অ্যাসিস্টও হলো। রাজকীয় সমাপ্তিতে আবারও মেসির নাম! উদযাপন শেষে মুখ ঢেকে যে প্রার্থনা করলেন মেসায়াহ, সেটা কি আপনার চোখ এড়িয়েছে? তবে সহজ বাংলায় যদি বলি, মেসি হয়তো তখন বলছেন, বড়ো বাঁচা বাঁচলাম আজ!

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা ভার্দে ভক্তদের মুখে রাজ্যের হতাশা। শক্তির শেষটুকু দিয়ে লড়াই করেও পারেনি তাদের যোদ্ধারা। ১২০ মিনিটে এই ম্যাচের হারের স্মৃতি শুধু স্মৃতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও অনেক কিছু—অভিমান, প্রত্যাশা, চার বছর পর আরও কিছু করে দেখানোর প্রত্যয়। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মুখে হাসি থাকলেও বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল কেপ ভার্দের সেই জেদের জন্য। কারণ, প্রতিপক্ষ যতই ছোট হোক, এমন লড়াই দেখলে সমর্থকেরাও বুঝে যায়—ফুটবল শুধু জেতার নাম নয়, টিকে থাকারও নাম।

আমার গল্পে আমাকে আবার পেছনে ফিরতে হবে। ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে ১-১ এ সমতা। তখনই আকাশ কালো হয়ে এলো, ঝুম করে নামলো বৃষ্টি, সঙ্গে ঝড়ের ঝাপটা। বৃষ্টিতে আমিও ভিজে গেলাম। অনেকে ছাউনির নিচে সরে গেলো, কিন্তু কারও দৃষ্টি সরলো না স্ক্রিন থেকে। ভেজা মাটির ওপর দাঁড়িয়েও উৎকণ্ঠা, কী ঘটতে যাচ্ছে! ফুটবলের টানই তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ানো এক মেক্সিকান ফ্যানের সঙ্গে জম্পেশ আড্ডা হলো। বড়ো পর্দার দিকে তাকিয়ে বললো, “এই ম্যাচ দেখছি ঠিকই, মন পরে আছে মেক্সিকো–ইংল্যান্ড ম্যাচে। ওরা যদি চাপ দেয়, আমাদের জন্য রাতটা কঠিন হবে।” একটু থেমে সে আরও যোগ করল, “আর সামনে যদি ব্রাজিলের মতো দল আসে, তখন তো কথাই নেই—ওদের বিপক্ষে খেলা মানে আলাদা এক যুদ্ধ।” তার গলায় ছিলো উদ্বেগ, কিন্তু সেই উদ্বেগের ভেতরেও ছিলো এক ধরনের প্রস্তুতি—যেন সে আগেই বুঝে গেছে, বিশ্বকাপে প্রতিটি রাতই নতুন পরীক্ষা।

গোল হলে একরাশ উল্লাস, আর সমতা এলে মুহূর্তের নীরবতা—এই ওঠানামার মধ্যেই রাতটি এগিয়ে চললো, কখনও উত্তেজনায়, কখনও নিঃশব্দ প্রতীক্ষা। ভেজা জার্সি, কাঁধে কাঁধ ঠেকে দাঁড়ানো অচেনা মানুষ, আর বৃষ্টির ফোঁটার মধ্যে স্ক্রিনের আলো—সব মিলিয়ে ফ্যান জোনের অভিজ্ঞতাটা ছিলো নতুন। আপনার কাছে নিরীহ দর্শনের বাইরে এই লেখা হয় তো কিছুই নয়। কিন্তু ভেজা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কাছে এ যেন অনুভূতির এক দীর্ঘ সারি—কেউ জিতলো, কেউ হারলো, কেউ আবার শুধু দেখলো কীভাবে ফুটবল একসঙ্গে অনেক দেশের, অনেক ভাষার, অনেক ভয়ের আর অনেক স্বপ্নের গল্প বলে যায়।

হাডসন ইয়ার্ডের সেই সন্ধ্যা শেষে মনে হলো, বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু স্কোরলাইনে সীমাবদ্ধ নয়। ৩-২ গোলের জয়ে মেসিরা না হয় গেল শেষ আটে, কিন্তু ম্যাচ তো জিতেছে আসলে কেপ ভার্দেই। আর আমার সম্বল? একদম অচেনা অজানা এক পরিবেশে, অচেনা হাজারো মুখের পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির মধ্যেও খেলা না ছাড়ায় এক ধরনের জেদ আছে। আমার জন্য যা হার-জিতের বাইরেও এক ভিন্ন অনুভূতি, কিংবা মানবিক উষ্ণতা। এমন রাতগুলোই পরে ডায়েরিতে থেকে যায়; কখনও স্মৃতি হয়ে, কখনও গল্প হয়ে, আর কখনও ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দীর্ঘশ্বাস হয়ে।