বিশ্বকাপের আসল রং দেখালো কেপ ভার্দে ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ

বিশ্বকাপ মানে কি স্রেফ ট্রফি জেতার গল্প? শুধু কি লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপে আর্লিং হলান্ড কিংবা হ্যারি কেইনের মতো তারকাদের আলোয় ভরা মঞ্চ?

চার বছর পরপর ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরের সৌন্দর্য আসলে অন্য জায়গায়। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এমন সব গল্প, যেগুলো ফলাফলের চেয়েও অনেক বেশি দিন মানুষের মনে বেঁচে থাকে।

সেই কারণেই কেপ ভার্দে ও আর্জেন্টিনার লড়াইকে এই বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ বলা হচ্ছে। কারণ এখানে শুধু একটি দল জেতেনি কিংবা একটি দল হেরে যায়নি। এখানে ফুটবল জিতেছে। জিতেছে স্বপ্ন, সাহস, আত্মবিশ্বাস আর অসম্ভবকে সম্ভব করার অদম্য ইচ্ছা।

মাত্র কয়েক লাখ মানুষের ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপে এটিই ছিল তাদের প্রথম অংশগ্রহণ। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে তারা ছিল চৌষট্টিতম অবস্থানে। আর প্রতিপক্ষ ছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় দল আর্জেন্টিনা।

কাগজে কলমে দুই দলের ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল। কিন্তু ফুটবল যে কখনো কাগজের হিসাব মানে না, সেটাই আবারও প্রমাণ করল কেপ ভার্দে।

গ্রুপ পর্বেই সবাইকে চমকে দিয়েছিল। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের সাথে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকাপের প্রথম পয়েন্ট অর্জন। উরুগুয়ের বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ গোলের আনন্দ। এরপর নকআউটে এসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে প্রায় বিদায়ের মুখে ঠেলে দেওয়া। একটি অভিষেক দলের জন্য এর চেয়ে বড় গল্প আর কী হতে পারে।

মায়ামির মাঠে যখন লিওনেল মেসি প্রথমার্ধে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন ম্যাচটি হয়তো খুব সহজেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু কেপ ভার্দে অন্য কিছু লিখতে মাঠে নেমেছিলো।

দ্বিতীয়ার্ধে ডেরয় দুয়ার্তের গোল ম্যাচে সমতা ফেরালো। নব্বই মিনিট শেষে স্কোর ছিল এক দুই নয়, বরং এক এক। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অতিরিক্ত সময়ে খেলতে বাধ্য করেছিল বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দেশটি।

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই লিসান্দ্রো মার্তিনেস আবার আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। মনে হচ্ছিলো এবার বুঝি গল্পের শেষ লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু রূপকথার সবচেয়ে সুন্দর অংশটি তখনও বাকি ছিল।

সিডনি লোপেস কাবরাল বক্সের বাম দিক থেকে ভেতরে ঢুকে এমন এক বাঁকানো শট নিলেন, যা বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে অনেক দিন মনে রাখা হবে। বল উড়ে গিয়ে জড়িয়ে যায় জালের একেবারে ওপরের কোণে।

বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে আবারও সমতায় ফেরে কেপ ভার্দে। সেই মুহূর্তে পুরো স্টেডিয়াম যেন বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে।

কাবরাল এরপর আরেকটি দুর্দান্ত সুযোগও তৈরি করেছিলেন। এমিলিয়ানো মার্তিনেস অসাধারণ সেইভ না করলে হয়তো ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

শেষ পর্যন্ত ভাগ্য আর কপালের ছোট্ট এক নিষ্ঠুর মোড় সবকিছু বদলে দেয়। একশো এগারোতম মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড ডিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে দিক বদলে জালে ঢুকে যায়।

আত্মঘাতী সেই গোলেই শেষ হয়ে যায় কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য যাত্রা। স্কোরলাইন বলছে আর্জেন্টিনা তিন দুই ব্যবধানে জিতেছে। কিন্তু এই ফলাফল পুরো গল্প বলে না।

শেষ বাঁশি বাজতেই কেপ ভার্দের ফুটবলাররা মাঠে লুটিয়ে পড়েছিলেন। তাদের চোখে ছিলো কান্না। সেই কান্না পরাজয়ের জন্য যতটা না, তার চেয়েও বেশি ছিল অসমাপ্ত স্বপ্নের জন্য। তারা বাড়ি ফিরতে চাননি। তারা আরও কিছুদিন এই মঞ্চে থাকতে চেয়েছিলেন। কারণ এমন মুহূর্ত হয়তো জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না।

বিবিসির বিশ্লেষক ও সাবেক স্কটল্যান্ড ফুটবলার জেমস ম্যাকফ্যাডেন বলেছিলেন, কেপ ভার্দে ম্যাচটি হেরেছে ঠিকই, কিন্তু তারা জিতে নিয়েছে মানুষের হৃদয়।

তারা দেখিয়েছে সাহস, ঐক্য, পারস্পরিক বিশ্বাস আর নিজেদের সামর্থ্যের প্রতি অটুট আস্থা। এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্পের নাম কেপ ভার্দে।

সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিলও এই পারফরম্যান্সকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা আন্ডারডগ প্রদর্শনী বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, খেলোয়াড়দের চোখের জলই বলে দিচ্ছিল তারা বাড়ি ফিরতে চায় না। তারা এই স্বপ্নের ভেতরেই চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়।

এই ম্যাচে আর্জেন্টিনাও সহজে জেতেনি। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছে। কিন্তু কেপ ভার্দের দেওয়া ভয়, চাপ আর প্রতিরোধ তারা কোনো দিন ভুলতে পারবে না।

চল্লিশ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা যেন পুরো ম্যাচে একাই দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। মেসির একের বিপরীতে এক সুযোগ ঠেকিয়েছেন।

দুর্দান্ত ফ্রি কিক ফিরিয়েছেন আঙুলের ডগায়। পুরো ম্যাচে করেছেন আটটি সেইভ। স্পেনের বিপক্ষে তিনি নায়ক ছিলেন। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তীর মতো এক যোদ্ধা।

শেষে দেখা গেলো মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেসসহ আর্জেন্টিনার অনেক ফুটবলার পরাজিত প্রতিপক্ষকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কারণ তারা জানতেন, এই দলটি শুধু একটি ম্যাচ খেলেনি। তারা বিশ্বকাপের আত্মাকে জীবন্ত করে তুলেছে।

বিশ্বকাপের সৌন্দর্য আসলে এখানেই। এখানে শুধু শিরোপাজয়ীরা ইতিহাস লেখে না। অনেক সময় ইতিহাস লেখে সেই দলও, যারা ট্রফি ছুঁতে পারে না, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

কেপ ভার্দে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু এই বিশ্বকাপে তারা এমন এক গল্প লিখে গেছে, যা বহু বছর ধরে বলা হবে। কারণ ফুটবল শেষ পর্যন্ত কেবল জয়ের খেলা নয়। এটি স্বপ্ন দেখার খেলা। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল রং দেখা গেছে কেপ ভার্দে ও আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ে।