চায়না ও ভারত: জনসংখ্যায় সুপারপাওয়ার, বিশ্ব ফুটবলে দর্শক মাত্র

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বাস করে শুধু চায়না ও ভারতে। সংখ্যার বিবেচনায় দুই মহাশক্তি। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা কিংবা বাজারের দিক থেকে এই দুই দেশের প্রভাব পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু ফুটবলের মাঠের গল্পটা অন্যরকম।

বিশ্বকাপ শুরু হলেই কলকাতা থেকে কেরালা, গোয়া থেকে বেইজিং পর্যন্ত শহরজুড়ে ফুটবলের উন্মাদনা দেখা যায়। রাস্তা ভরে যায় আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সের পতাকায়।

মানুষ রাত জেগে খেলা দেখে। আলোচনা করে। বিতর্ক করে। প্রতি চার বছরে ফিরে আসে এই উচ্ছ্বাস। কিন্তু এতো মানুষের দেশ হয়েও কেন বিশ্বকাপে নেই ভারত আর চায়না?

ভারতে ফুটবলের প্রতি আবেগ আছে, দর্শক আছে, ইতিহাসও আছে। পশ্চিমবঙ্গের মোহনবাগান আর ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে সমর্থকরা রীতিমতো তর্কযুদ্ধে জড়ান।

কেরালা আর গোয়ার মতো অঞ্চলেও ফুটবল শুধু খেলা নয়, সংস্কৃতির অংশ। তবু জাতীয় দল কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি।

ভারতের ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়ার মতে, সমস্যাটা প্রতিভার অভাব নয়। ভারতের মতো বড় দেশে প্রতিভার ঘাটতি থাকার কথা না।

যেটার অভাব আছে সেটা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আর শক্তিশালী কাঠামো। অর্থাৎ ছোট বয়স থেকে নিয়মিত খেলোয়াড় তৈরি করার ব্যবস্থা।

ভারতের সাবেক ফুটবলার শ্যাম থাপা মনে করেন, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন সন্তানদের ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটের দিকে বেশি ঠেলে দিচ্ছে। কারণ সেখানে দ্রুত সাফল্য, বেশি অর্থ আর বড় মঞ্চ দেখা যায়।

অনেক পরিবার স্বপ্ন দেখে ছেলে একদিন আইপিএলে খেলবে। তাই ফুটবল প্রতিভা তৈরির যে ভিত্তি দরকার, সেটা তৈরি হওয়ার আগেই অনেক শিশু অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।

এশিয়া থেকে নিয়মিত বিশ্বকাপে খেলছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া। জায়গা করে নিয়েছে উজবেকিস্তান আর জর্ডানের মতো দেশও। অথচ জনসংখ্যায় অনেক বড় ভারত পিছিয়ে আছে অনেক দূরে।

চায়নার কী হলো

এক সময় দেশটির স্বপ্ন ছিল ফুটবলের পরাশক্তি হওয়ার। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং নিজেই বলেছিলেন তার তিনটি স্বপ্ন আছে। চায়না বিশ্বকাপে খেলবে, বিশ্বকাপ আয়োজন করবে এবং একদিন বিশ্বকাপ জিতবে।

তারপর শুরু হয় বড় বড় পরিকল্পনা। ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়। একাডেমি তৈরি হয়। সরকারি উদ্যোগ বাড়ে। কিন্তু মাঠের ফলাফল বদলায়নি।

বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চায়নার ফুটবল বারবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বড় ব্যবধানে হার, দুর্নীতি, ম্যাচ ফিক্সিং আর প্রশাসনিক সংকট দেশটির ফুটবলকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চায়নার বড় সমস্যা হলো ফুটবলকে খুব বেশি উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। ফুটবল আসলে নিচ থেকে বড় হয়।

পাড়ার মাঠ, স্কুল, স্থানীয় ক্লাব, ছোট লিগ থেকে ধীরে ধীরে খেলোয়াড় উঠে আসে। কিন্তু সেখানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বেশি হলে স্বাভাবিক বিকাশ থেমে যায়।

আরেকটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এতো জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও চায়নায় নিবন্ধিত ফুটবলারের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো কম। অর্থাৎ মানুষ বেশি হলেই খেলোয়াড় তৈরি হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ফুটবল তাই শুধু অর্থ বা জনসংখ্যার খেলা নয়। এটা সময়ের খেলা, সংস্কৃতির খেলা, কাঠামোর খেলা।

একটা শিশু কতো সহজে বল পায়, কতোবার মাঠে নামে, কতো বছর ধরে প্রশিক্ষণ পায়, কতোদূর যাওয়ার সুযোগ পায়, তার ওটর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ।

ভারত আর চায়নার জন্য প্রশ্নটা আর শুধু বিশ্বকাপে খেলা নয়। তারা কি এমন একটা ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে কোটি মানুষের ভিড় থেকে সত্যিকারের ফুটবলার উঠে আসবে।

যেদিন সেটা হবে, সেদিন হয়তো বিশ্ব ফুটবলের চেহারাও পালটে যাবে।