বাংলা ছবির ‘শীর্ষ নায়ক’ খ্যাত শাকিব খানের এবারের ঈদের ছবি ‘রকস্টার’। মারপিট অ্যাকশন বাদ দিলে ‘বরবাদ’ ছবির মতো ‘নেশাসক্ত’ শাকিব খানের আরেক ছবি ‘রকস্টার’। আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, জেমসের দেশে ‘নিচু লয়ে’র গান সম্বলিত এক সিনেমা, যাকে রকগান বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছবির নামকরণ করা হয়েছে ‘রকস্টার’!
দুঃখ, বিষাদ কিংবা রাগের অনুভূতিতে বরাবরের মতো ম্লান এক ‘শাকিবীয়’ ছবি ‘রকস্টার’। বাবা-মায়ের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রচলিত এক ফর্মুলা ছবিও ‘রকস্টার’। বাংলা ছবির বাঁকবদল তথা ‘কূড়া পক্ষীর শূন্যে উড়া’, ‘আদিম’, ‘হাওয়া’, ’উৎসব’, ‘বনলতা সেন’, ‘প্রেশার কুকার’, ‘রইদ’ কিংবা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এর কালে বেমানান শাকিব খানের আরেক ছবি ‘রকস্টার’। পরিচালক আজমান রুশোর প্রথম ছবি ‘রকস্টার’।
ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল গানের শিল্পী কাম ওস্তাদ জুনায়েদ খানের ছেলে আগুন। ছবিতে জুনায়েদ খানের গানের রেওয়াজ বা অনুষ্ঠানের কোনো দৃশ্য নেই। আছে অভিনয় ক্যারিয়ার ধ্বংস করে গানের ওস্তাদকে বিয়ে করা স্ত্রীর একাধিক মদ্যপানের দৃশ্য। ছোটকাল থেকে বাবা-মায়ের অবহেলায় প্রথমে দাদির ভালোবাসায় ও পরে একা-একা মানুষ হওয়া ওস্তাদপুত্র আগুনকে দেখে অমিতাভ বচ্চনের ‘শারাবি’ ছবির কথা মনে পড়তে পারে। আছে এমন ঘটনার অনেক বাংলা ছবিও।
গান না শিখে ছোটকাল থেকে নেশা করতে শেখা, গানের মঞ্চে উঠলে শরীর কাঁপা ও মঞ্চ থেকে পালানো ছেলেটাকেই একদিন মিথ্যা বলে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় মঞ্চে। শুরু হয় তার রকস্টার হিসেবে যাত্রা। গানের চর্চা সামান্যই আছে ছবিতে, ছবি জুড়ে আছে শাকিব খানের ‘বরবাদীয়’ ঢংয়ের নেশা করা, কখনো জেলে যাওয়ার ঘটনা। আছে গানের অনুষ্ঠানে দেখা হওয়া মীরার সাথে প্রেমের কাহিনী। নতুনত্ব এটা হতে পারে যে এই ছবিতে শাকিব খানের ‘ঢিসুম ঢিসুম’ মারামারির কোনো দৃশ্য নেই।
‘রকস্টার’ যদি বাংলাদেশি ছবি হয় তবে গায়কের চুলের গেটআপ ‘র্যাপার’ এর মতো যদিও তা কেটে ফেলার দৃশ্যও আছে। শাকিব খানের অভিনয় নিয়ে আর কিছু না বলি। প্রেমিকা মীরার চরিত্রে সাবিলা নূর, মডেল এলিনা গোমেজের চরিত্রে তানজিয়া জামান মিথিলা ও সুনিধি নায়েক এই তিন চরিত্রের মধ্যে সাবিলা নূর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন তার চরিত্রে সপ্রতিভ থাকতে। ওস্তাদ জুনায়েদ খানের চরিত্রে তারিক আনাম খান ও তার স্ত্রীর চরিত্রে রোজী সেলিম তাদের স্বভাবজাত ভালো অভিনয় করেছেন। তবে অনেকটা প্রথম অভিনয়ে চমকে দিয়েছেন ক্রীড়া সাংবাদিক খ্যাত কাজী সাবির। তিনি সহসা অভিনয় করেন না এটা মনেই হয়নি। জানি না অভিনয়ের সময়ে শ্বশুর হুমায়ূন ফরিদীকে কতটা মনে পড়েছে তার।
এই ছবির কাহিনীকার পরিচালক আজমান রুশো নিজেই। রকস্টার ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন নুসরাত মাটি। ছবির সংলাপ লিখেছেন সামিউল ভূঁইয়া ও আয়মান আসিব স্বাধীন। চিত্রগ্রাহক আব্দুল মামুন। ছবির ফটোগ্রাফি মানানসই। সান মোশন পিকচার্স লিমিটেডের প্রযোজনায় ছবির প্রযোজক অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু। প্রথম ছবি হিসেবে আজমান রুশো ভালো করেছেন।
রকস্টার সিনেমা গাননির্ভর হবে এটা নাম শুনেই অনুধাবন করা যায়। যদিও ওয়ারফেইজ, জেমস ও নগর বাউল ধাঁচের গান তেমন ছিলো না। ছবিতে আট-নয়টি গান ব্যবহৃত হয়েছে। ছবির সুরকার আহমেদ হাসান সানি ও সঙ্গীতে জাহিদ নীরব। গানের সহযোগী হিসেবে এসডিএফ এন্টারটেইনমেন্ট ও আলফা আই স্টুডিওস এর কথা জানা গেছে।
শাকিব খানের জেলে যাওয়ার ঘটনায় লোকজ ধাঁচের সুরে “পিরিতি’ গানটির গীতিকার হাসান রোবায়াত, সুর করেছেন আহমেদ হাসান সানি এবং গেয়েছেন ও গানের দৃশ্যে অভিনয় করেছেন পান্থ কানাই। ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’ শিরোনামের গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক আহমেদ হাসান সানি।
‘আমি যাবো হারিয়ে’ শিরোনামের গানের গীতিকার ও গায়ক অংকন কুমার রায় এবং সুর ও সংগীতে ছিলেন জাহিদ নীরব। ‘বেশ কিছুদিন’ শিরোনামের গানটির গীতিকার, সুরকার ও গায়ক আহমেদ হাসান সানি। এছাড়াও কয়েকটি গানের অংশবিশেষ ব্যবহৃত হয়েছে ছবিতে।
রকস্টার কিংবা গায়কদের জীবন পুরোপুরি নেশা নির্ভর কিনা এই ছবি দেখে সেই প্রশ্ন উঠতেই পারে। শেষদৃশ্যে আগুন ধরিয়ে পুড়ে মরার আকাঙ্ক্ষা আরোপিত মনে হয়েছে। তবুও ফটোগ্রাফি, আজমান রুশোর প্রথম পরিচালনা, কাজী সাবির এর আগমন কিংবা মারপিটবিহীন গাননির্ভর ছবি বানানোর যে চেষ্টা সেটাকে সাধুবাদ জানানো যেতে পারে।
জয় হোক বাংলা ছবির।