‘মাইলফলক’ অগ্রগতি রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে, বিদ্যুত আসবে কবে?

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র আরেকটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ধাপ অতিক্রম করেছে।

প্রথম ইউনিটের ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছে। এই ঘটনাকে ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র প্রকল্পে মঙ্গলবারের ‘ফুয়েল লোডিং’-এর উদ্বোধন করা হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুয়েল লোডিং শুরু হয় প্রথম ইউনিটে। 

এসময় উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, রাশিয়াার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটম-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। 

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং রাশিয়া ও বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। 

ফকির মাহবুব আনাম বলেন, “আজ ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতিহাসের অংশ হলো।” 

রূপপুরে স্বয়ংক্রিয় সুইচ টিপে ফুয়েল লোডিং উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের অতিথিরা।

মাণদণ্ডের কঠিন পরীক্ষা

কিন্তু ফুয়েল লোডিং মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরমাণু ব্যবহারের ক্ষেত্রে একেবারে ‘নবীন’ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য শুরু হলো ‘দীর্ঘ ও জটিল’ এক পথচলা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষামূলক ধাপগুলোর একটি। 

এই ঘটনার মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো ‘পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার’ শুরু হবে বাংলাদেশে।

এতদিন অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে থাকলেও এবার পরমাণু ব্যবহারের ‘নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা’র আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ‘কঠোর’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। 

সরকার বলছে, অগাস্টের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ‘কিছু’ বিদ্যুত যুক্ত হবে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে। 

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ভাষ্য দিচ্ছেন আরও ‘সতর্কভাবে’। কারণ, ফুয়েল লোডিংয়ের পর রয়েছে একাধিক জটিল ধাপ। 

রিঅ্যাক্টরের প্রাথমিক জটিল অবস্থা, ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা যাচাই করার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়।  

আর প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে শেষ করতে না পারলে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া নিয়ে ‘শঙ্কা’য় পড়তে হতে পারে বলেও মনে করছেন তারা। 

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের 

সাবেক প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবর আলাপ-কে বলেন, “প্রথম পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা একটি পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রকে নির্মাণাধীন অবস্থা থেকে পরিচালন পর্যায়ে নিয়ে যায়।” 

“উৎপাদনের জন্য বিদ্যুতকেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু করার এটিই প্রথম ভৌত প্রক্রিয়া। এর অর্থ হলো- কাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হওয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থার বৈধতার প্রমাণ সম্পন্ন হওয়া, পারমাণবিক চেইন বিক্রিয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া এবং প্রাথমিক বিদ্যুত উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া।”    

পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “ফুয়েল লোডিং উপলক্ষে বলবো যে, আমরা মাত্র নিউক্লিয়ার জার্নি শুরু করলাম। যেটা এতদিন নন নিউক্লিয়ার কর্মকাণ্ড ছিলো।” 

“এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও একটা মাইলফলক অর্জন। নির্মাণ কাজ শেষ। দ্বিতীয় ধাপের সফলতার ওপর নির্ভর করবে বাণিজ্যিক উৎপাদন, নিরবচ্ছিন্নতা এবং সক্ষমতা। আরও যেগুলো চ্যালেঞ্জ আছে, সেগুলো সমাধান করে এগিয়ে যাওয়া- সেটাই হচ্ছে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।” 

স্বাভাবিকভাবেই ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য উচ্চ ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে হাজির হয়েছে। 

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুত উৎপাদনকারী দেশগুলোর ক্লাবে যোগ দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ৩১টি দেশ বর্তমানে পরমাণু বিদ্যুত উৎপাদন করছে এবং বাংলাদেশ, তুরস্ক ও মিশরে নির্ধানাধীন রয়েছে।  

কিন্তু ফুয়েল লোডিংয়ের পর কতটা পথ বাকি এবং কবে নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুত উৎপাদন শুরু হবে?  

প্রশ্ন হচ্ছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘ফুয়েল লোডিং’ আসলে কী এবং এরপর বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য আর কোন কোন ধাপ পেরোতে হবে? 

রূপপুরের রিঅ্যাক্টর ভেসেল খনিজ পানি দিয়ে ফ্লাশ করা হচ্ছে। ইমেইম: রোসাটম

ফুয়েল লোডিং কী? 

বাংলাদেশে পরামানু বিদ্যুতের ভাবনা শুরু হয়েছিল ১৯৬১ সালে। কিন্তু পাবনার রূপপুরে পদ্মা নদীর তীরে পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনের সেই ভাবনা বাস্তবায়ন হতে লেগে যায় কয়েকদশক। 

রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তির পর ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের ভিত্তিস্থাপন করা হয়। 

আর প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৫ সালের ২৫এ ডিসেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি কমিশন।

চুক্তিতে নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রে দুটি ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে, যার প্রত্যেকটির ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট করে। 

রাশিয়ার তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি সুবিধা সম্বলিত ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে বাংলাদেশে, যেটাকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আধুনিক ও নিরাপদ বলে মনে করা হয়।

নির্মাণকাজ শেষের দিকে চলে আসায় ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রথম ইউনিটের ইউরেনিয়ামের চালান আসে বাংলাদেশে। রূপপুরে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। 

সেই ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিংয়ের কাজ শুরু হলো মঙ্গলবার। 

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নীতিমালা অনুযায়ী, একটি পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের নির্মাণ থেকে কমিশনিং বা উৎপাদনে যেতে কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। 

প্রথমে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের থেকে জানা যাচ্ছে, রিঅ্যাক্টর ও টারবাইন ভবন, কুলিং সিস্টেম, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন এবং বিভিন্ন সহায়ক স্থাপনাসহ রূপপুরে মোট ৩৮৯টি স্থাপনার নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ করা হয়েছে।

এই অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পরের পালা হলো ‘ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ’ বা কেন্দ্র চালুর প্রক্রিয়া শুরু করা। এই ধাপে থাকে চারটি কাজ। 

‘কমিশনিং প্রোগ্রাম’, এরপর ‘ফুয়েল লোডিং’, তারপর বিদ্যুত ‘উৎপাদন প্রক্রিয়া’ ‍শুরু করা এবং সবশেষ পরীক্ষামূলক উৎপাদন। 

রূপপুরে ধাপে ধাপে এই কাজগুলো শেষ হওয়ার পর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট প্রথম ইউনিটের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ এবং রিঅ্যাক্টরের মূল যন্ত্রপাতির ‘ইনসপেকশন’ শেষ করার পর দ্বিতীয় ধাপ, মানে ফুয়েল লোডিংয়ের প্রস্তুতি নেয়। 

তবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার আগে আরও দুটি ধাপ শেষ করতে হবে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গত ১৬ই এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রকে কমিশনিং লাইসেন্স ও উৎপাদন কাজ শুরুর অনুমোদন দেয়। 

এরপর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সাংবাদিকদের জানান, অগাস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ‍্যে রুপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত যুক্ত হবে। 

ফুয়েল লোডিংয়ের পর কীভাবে শুরু হবে বিদ্যুত উৎপাদনের কাজ? 

এখন জ্বালানি ভরার যে কাজ শুরু হলো তারপরই বিদ্যুত উৎপাদন হবে না বলে জানান পারমাণবিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শফিকুল ইসলাম। 

আলাপ-কে তিনি বলেন, “এটা প্রডাকশন না, পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন। বন্ধ হবে, আবার শুরু হবে। এটা বাণিজ্যিক উৎপাদনও না।”    

“কমার্শিয়াল উৎপাদন হবে তখন, যখন কমার্শিয়াল লাইসেন্স পাবে। এখন লাইসেন্স পেয়েছে সাময়িক। এটাকে বলা হয়, ফুয়েল লোডিং করা এবং পরীক্ষামূলক চালু করা,” বলেন তিনি।   

শফিকুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক এবং প্রায় তিন দশক ধরে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও কারিগরি বিষয়ে গবেষণা ও মতামত দিয়ে আসছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেট্‌স ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। 

“এখন নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে বলে লাইসেন্স দিয়েছে যে, তোমরা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করো, ফুয়েল লোড করো, এটাকে অ্যাকটিভ করো। আগে অ্যাকটিভ ছিলো না। নিউক্লিয়ার ফুয়েল দিলে অ্যাকটিভ হয়ে যাবে। তখন ওই পরিবেশটা ভিন্ন হবে,” যোগ করেন তিনি। 

আইএইএ-এর নীতিমালা মেনে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে ১০০ শতাংশ বিদ্যুত সরবরাহ করতে আরও প্রায় ১০ মাস সময় লাগবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন।

বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু কবে? 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। তার এক বছর পরে চালু হওয়ার কথা ছিলো দ্বিতীয় ইউনিটের। 

কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কারিগরি জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ দেরি হওয়ায় পিছিয়ে যায় উৎপাদনের সময়সীমা। 

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন ২০২৬ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিটসহ কেন্দ্রটি পুরো সক্ষমতায় চালুর লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ২০২৭ সাল। 

এখন ফুয়েল লোডিং পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের কোরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ পারমাণবিক জ্বালানি বা ফুয়েল স্থাপন করা হবে। 

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করতে হবে রিআ্যাক্টর কোরে। এজন্য লাগবে ৩০ দিন সময়। 

এই প্রক্রিয়া ‘অত্যন্ত সতর্কতা’র সাথে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে শেষ করতে এবং বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। 

ফুয়েল লোডিং-এর পর শুরু হবে ‘ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ’ বা বিদ্যুত উৎপাদন প্রক্রিয়া।

নকশা অনুযায়ী ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন রিঅ্যাকশন’ ঘটানো এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে লেগে যাবে আরও ৩৪ দিন। 

পরীক্ষা শেষে রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে পর্যায়ক্রমে ৩, ৫, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এজন্য লাগবে আরও ৪০ দিন। 

রিঅ্যাক্টরের পাওয়ার ৩০ শতাংশে উন্নীত হলেই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। 

তার মানে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১০৪ দিন পর ৩০ শতাংশ বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

পরমাণু ব্যবহার করে বিদ্যুত উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে প্রকল্পের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ ধাপ হিসেবে অভিহিত করেছেন সাবেক প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবর।

“জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র পরিচালন ক্লাবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। এটি বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। এটি জাতির জন্য একটি বড় অর্জন।”

তিনি আরও বলেন, “আমি আমার পুরো পেশাগত জীবনে এই প্রকল্পের সাথে জড়িত ছিলাম। এই প্রকল্পের সাফল্য দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত।”  

তবে আইএইএ-এর নীতিমালা মেনে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে ১০০ শতাংশ বিদ্যুত সরবরাহ করতে আরও প্রায় ১০ মাস সময় লাগবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন। 

পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “এখন এটা পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন করবে, মাঝে মাঝে বন্ধ হবে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। মাঝে মাঝে ৩০০ মেগাওয়াট পাবে। মাঝে মাঝে পাবে না। অনেক সময় বন্ধ থাকবে।” 

“আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে, আবার চালু করবে। এজন্যই এটাকে বলা হয় পরীক্ষামূলক বিদ্যুত উৎপাদন প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া খুবই স্পর্শকাতর এবং জটিল। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখানে প্রয়োজন আছে। এইটা এক বছর মতো সময় লাগবে,” বলেন তিনি। 

প্রাথমিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারলে, এরপর আন্তর্জাতিক মাণদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে বাংলাদেশকে। তারপরেই মিলবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের ছাড়পত্র।    

শফিকুল ইসলাম বলেন, “এটাকে বলা হয় ডিটিও বা কমার্শিয়াল ডেট অব অপারেশন। ওটার জন্য আলাদা লাইসেন্স নিতে হবে। আইএইএ-এর আলাদা মিশন আসবে পরিদর্শনে। ওগুলো করে আলাদা লাইসেন্স নিতে হবে।” 

“বাণিজ্যিক লাইসেন্স পেলে তখন ২৪ ঘণ্টা সাতদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলবে। ১৮ মাস ধরে চলবে এটা। তখন আর বন্ধ হবে না এটা। পুরো সক্ষমতায় চলবে। অন্য প্ল্যান্ট বন্ধ হলেও এটা বন্ধ করা উচিৎ না। বন্ধ করলে লস। অন্যান্য ক্ষতি আছে। এজন্য এটা চালু করতেও সময় লাগে। আবার বন্ধ করাটাও একটা সেনসেটিভ প্রক্রিয়া।” 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়েছে রাশিয়ার আধুনিক প্রযুক্তির দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর।

রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা, ব্যয় ও ঝুঁকি

রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। সেখানে থাকছে রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন সক্ষমতা। 

এইসব প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত বলে দাবি করে আসছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটম। 

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিটের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ৬০ বছর পর্যন্ত এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর বাড়ানো যাবে। 

এর আগে রাশিয়ার চেরনোবিল ও জাপানের ফুকুশিয়ায় দুইটি বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনা সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্ব। এরপর পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয় পুরো বিশ্ব। 

রূপপুরে রিস্ক ফ্যাক্টর কতটা- জানতে চাওয়া হলে পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ শফিকুল ইসলাম প্রশ্ন করেন, “রিস্ক ফ্যাক্টর কোন তুলনায়? চেরনোবিল, ফুকুশিমার তুলনায়?” 

এরপর তিনি জবাব দেন, “এটা (রূপপুর) লেটেস্ট মডেলের ডিজাইন। সত্তরের ডিজাইন না। এটা ২০১৫-১৬-এর ডিজাইন। জাপানেরটা সত্তরের ডিজাইন। ওগুলোর তুলনায় এটা অনেক ইমপ্রুভ করা হয়েছে।” 

তবে এরপরও ‘ঝুঁকি’ থেকে যায় বলেও মনে করেন তিনি। আর সেই ঝুঁকির দিকটা ‘দক্ষ জনবল’ নিয়ে বলেও জানান তিনি। 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্পের অধীনে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা। যাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা রাশিয়াতে। 

এদের মধ্যে ৫৯ জন বাংলাদেশি ‘বিশেষজ্ঞ’ আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অপারেটিং লাইসেন্স পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান।

প্রকল্পে ২৫ হাজারের মতো লোকবল কাজ করছে, যাদের এক পঞ্চমাংশ হলেন রাশিয়ার নাগরিক।

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্টটা হলো- সেফটি কালচার আমাদের অনুসরণ করা। যন্ত্র যতই উন্নত হোক, মানুষগুলো যদি সঠিক না হয়, সঠিকভাবে জ্ঞান না থাকে, তাদের মানসিক সুস্থতা না থাকে কর্মপরিবেশের অভাবের কারণে, তাহলে হবে না।”  

“চেরনোবিল দুর্ঘটনাও কিন্তু মানুষের ভুলের কারণে। আমেরিকাতেও অ্যাক্সিডেন্ট মানুষের ভুলের কারণে। সবচেয়ে বড় কনসার্ন হলো- এখানে যারা চালাবে, তারা প্রস্তুত কিনা?” 

প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “আর আমাদের জাতীয় সক্ষমতা অর্জন করা হয়েছে। আমরা পরে তাদের কাছ থেকে বুঝে নেবো। এটা একটা ইস্যু আছে এখানে।” 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্পের ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ব্যয়ের মাত্র ১০ শতাংশ বাংলাদেশের, বাকিটা রাশিয়া থেকে ঋণ করা। 

বিপুল এই অর্থ নিয়ে নানা ‘জল্পনা’ রয়েছে। এই প্রকল্প থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ‘আত্মসাৎ’ ও ‘পাচার’ হয়েছে বলেও অভিযোগ আঠে। কিন্তু আসলেই কি রূপপুরের ব্যয় বেশি?  

“আমি সবসময় বলি যে, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন বা প্রজেক্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ছিলো যে, ব্যয়টা কত হয় সেটা পরিষ্কার করা। তা না করে উনারা আরও বিভিন্ন ডেটা দিয়ে বিভ্রান্ত করেন মানুষকে। এক এক সময় একেকটা কথা বলে,” বলেন শফিকুল ইসলাম। 

তিনি বলেন, “আমাদের তিন বছর সাড়ে তিন বছর বিলম্ব হয়েছে। তারপরেও এটা যদি আমরা সঠিকভাবে চালাতে পারি, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এটা সাশ্রয়ী হবে। কিন্তু এটা যদি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে না পারি, তাহলে এটা অনেক বোঝা হয়ে যাবে।” 

ব্যয়ের ক্ষেত্রে তুলনা টানা হয় ভারতের তামিলনাড়ুর কুদানকুলা পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের সঙ্গে। রাশিয়ান প্রযুক্তিতে তৈরি ওই কেন্দ্রের ২০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুই ইউনিট তৈরিতে খরচ হয়ে ৫ বিলিয়নের মতো। 

তাহলে বাংলাদেশে এত খরচ কেন? সেই প্রশ্ন তোলেন অনেকে। 

শফিকুল ইসলাম বলেন, “কিন্তু ‍প্রাথমিক যে খরচ মানুষ বলছে, ইন্ডিয়ার তুলনায়, অন্যান্যর তুলনায় বেশি খরচ, এটা সঠিক না। বেলারুশ দেখেন, দুইটা রিঅ্যাকটর। কত বিলিয়ন ডলার নিয়েছে রাশিয়ার কাছ থেকে। তুরস্কের কথা চিন্তা করেন। মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কোরিয়াতে দেখেন। ওগুলোর প্রাইস মোটামুটি কাছাকাছি। খুব ভিন্নতা নাই।” 

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “ইন্ডিয়া সবকিছু আমদানি করে না রাশিয়ার থেকে। ইন্ডিয়া মেইন নিউক্লিয়ার কমপোনেন্টগুলো আনে। অন্যান্য কনস্ট্রাকশন ওরা নিজেরা করে সব।” 

“আমরাতো এ টু জেড সবই আনছি রাশিয়ার কাছ থেকে। আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা নাই। আমাদের কোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাপোর্ট নাই। আমাদের পাথরটাও ইন্ডিয়ার কাছ থেকে আনতে হয়েছে। এটা তুলনা করতে হয় যারা প্রথম প্রথম এটা করছে তাদের সঙ্গে। ইন্ডিয়ার সঙ্গে তুলনা করার দরকার কী? এটা হয় না। এটা ম্যাথমেটিক্যালি রং।” 

বাংলাদেশের কাছাকাছি উৎপাদন ক্ষমতা ও একই প্রযুক্তির পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণে বেলারুশের খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মতো। যদিও বেলারুশ কখনো প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করেনি, তবে রাশিয়ার কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে ১০ বিলিয়নের বেশি। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৫,৩৪৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র বানাতে ব্যয় হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার। 

তুরস্কে রাশিয়ান প্রযুক্তির ৪,৪৫৬ মেগাওয়াটের কেন্দ্র বানাতে ব্যয় হচ্ছে ২৫ বিলিয়ন ডলারের মতো।    

শফিকুল ইসলাম বলেন, “তার মানে আমরা প্রাইসের দিক থেকে খুবই অসম চুক্তি করেছি, এটা সঠিক না। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয়টা হলো- নেগোশিয়েট করলে কিছুটা কমানো যেত। কিন্তু ভারতের যেটার সঙ্গে তুলনা করে, সেটা না জেনে করে।” 

তবে পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র বানাতে এককালীন ব্যয় বেশি হলে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল বেশি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 

কারণ, বাংলাদেশে গত অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ১২ টাকা ৩৬ পয়সা। রূপপুরের প্রতি ইউনিটের দাম ৯ দশমিক ৩৬ সেন্ট ধরলে বর্তমান বাজার দরে সাড়ে ১১ টাকার মতো হয়।

শুধু বাংলাদেশে উত্তোলন করা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এটার তুলনায় কম। কয়লা, তেল ও আমদানি করা এলএনজির ক্ষেত্রে খরচে বেশি।    

রূপপুর থেকে ‘সাশ্রয়ী’ ও পরিবেশের জন্য ‘পরিচ্ছন্ন’ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞ শফিকুল ইসলাম। 

“গ্যাসের পরেই এটার অবস্থান। তেলের চেয়ে, কয়লার চেয়ে কম। এলএনজিতে আনলে দাম বেশি পড়ে যাবে। আর এটা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুত উৎপাদন প্রক্রিয়া।”
রূপপুর প্রকল্প এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, প্রবেশ করেছে পারমাণবিক পরিচালনার সূচনায়। বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে পারমাণবিক ক্লাবের অfভিজাত্যে।

তাই রূপপুর শুধু আলোর খুব কাছাকাছিই নয়, বরং আলোর পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কঠিন বাঁক অতিক্রম করছে।