দেড় যুগ পর আবারও আলোচনায় এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের ‘জটিল’ এক সময়ে জেনারেল মাসুদ ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। সেনাবাহিনী থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এরপর ভোটে জিতে সংসদে গিয়েছিলেন।
এবার তাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আটক করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তার গ্রেপ্তারের কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।
তবে তাকে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আলোচনায় ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারির সেই অস্থির সময়ের ঘটনা, যে সময়টাকে অনেকেই বর্ণনা করেন ‘এক-এগারো’ বা ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে।
২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি ছিলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সেনাবাহিনীর সমর্থনে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
ক্ষমতার পালাবদলের পর দুঃসহ অবস্থায় পড়ে সরকার থেকে সদ্য বিদায়ী বিএনপি। শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তৃণমূল- সর্বত্র গ্রেপ্তার, ধরপাকড় ও নির্যাতন ছিল নিত্য ঘটনা। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রের ঘটেছিল একই ঘটনা।
অস্থির সেই সময়ে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন মাসুদ উদ্দিন। তখন ক্ষমতাকেন্দ্রের অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো তাকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিয়ে গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি করলে সেখানে সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মাসুদ।
‘কথিত’ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানই সেই কমিটির প্রধান কাজ ছিলো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। আর গুরুতর অপরাধ দমন কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন জেনারেল মাসুদ।
ওয়ান ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার হন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা, বহু রাজনীতিক, বড় বড় ব্যবসায়ী, এমনকি আমলারাও।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করা হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠে।
‘দুর্নীতি দমন’ অভিযান নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই একে দেখেছিলেন শুদ্ধি অভিযান হিসেবে।
তবে সমালোচকেরা বরাবরই বলে আসছেন যে, সেই অভিযান ছিল দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।
আর এই বিতর্কের একেবারে কেন্দ্রে ছিলেন জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী; যিনি কিছুদিন আগেও ছিলেন অপরিচিত একজন সেনা কর্মকর্তা। কিন্তু হঠাৎ করেই উঠে আসেন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে।
এক-এগারোর সেই অধ্যায় শেষ হওয়ার পর পথ বদলে ফেলেন আলোচিত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
২০০৮ সালে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কূটনৈতিক দায়িত্বে দীর্ঘ সময় কাটান তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকার তার মেয়াদ তিন দফায় বাড়ায়। প্রায় সাত বছর ফরেন মিশনে থেকে দেশে ফেরেন।
এরপর তার পরিচয় বদলে যায় আরেকবার। মাসুদ উদ্দিন যুক্ত হন ব্যবসা ও রাজনীতিতে। ঢাকায় পাঁচ তারকা রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেন। হলিডে ইন নামে আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনের সাথে যুক্ত হন এবং ঢাকায় এই নামে চালু করা হোটেলের অংশিদার হন। একই সঙ্গে রাজনীতির মাঠেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন।
যোগ দিয়েই দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন মাসুদ উদ্দিন। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান।
ফেনী-৩ নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে জয়ী হয়ে সংসদে যান।
ক্যারিয়ারজুড়ে আলোচনায় থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তেমন আলোচনায় ছিলেন না মাসুদ উদ্দিন।
তবে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় মাসেরও কম সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে ফের আলোচনায় এলেন তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে ডিএমপি সেন্টারে মাসদু উদ্দিনের গ্রেপ্তার নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করা হয়। সেখানে বলা হয়, তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে। যেটা সত্য ঘটনা সবাই জানতে পারবেন।
কী অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কত আর্থিক কেলেঙ্কারি, বা দুর্নীতি হয়েছে তা চার্জশিট দেওয়া হলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে ফেনী জেলায় ৬টি মামলা আছে। আর ঢাকা মহানগর এলাকায় মামলা আছে ৫টি। মোট মামলা ১১টি। প্রাথমিকভাবে তাকে পল্টন থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মানব পাচারের অভিযোগে এ মামলা করা হয়।